কটকটে
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
গ্রীষ্মের পালা চললো পুরো এক মাস ধরে। বড়োরা বলাবলি করতে লাগলো তাপটাকে যেন দেখাও যায়।
তানিয়া ক্রমাগত সবাইকে প্রশ্ন করে চললো, ‘গরমকে আবার দেখবে কী করে?’
তানিয়ার বয়স তখন পাঁচ। সেই বয়স যখন প্রতিদিন শিশুরা নতুন নতুন জিনিস শেখে। গ্লেব খুড়ো ঠিকই বলেছিলেন যে তিনশো বছর ধরে বাঁচলেও সবকিছু জানা যায় না।
‘আমার সঙ্গে ওপরে আয়, গরমটা তোকে দেখাবো। সেখান থেকে ভালো দেখতে পাবি।’
তানিয়া খাড়াই সিঁড়িটা দিয়ে উঠলো। চিলেকোঠাটা আলোয় ভরা, কিন্তু রোদ পোড়া ছাদের তলায় বলে গরম। চিলেকোঠার জানালাগুলোর ভিতর দিয়ে বাইরের বুড়ো মেপ্ল গাছটা ডাল পালা ঢোকাতে এতো জোর চেষ্টা করছে যে সেগুলোকে বন্ধ করা কঠিন আর সম্ভবত সে কারণেই সমস্ত গ্রীষ্মকাল ধরে সেগুলো হাট করে খোলা থাকে।
চিলেকুটিটার একটা ছোট বারান্দা আছে, সেটার রেলিঙগুলোর উপর খোদাই করা কারু-কাজ। সেই বারান্দায় তানিয়াকে নিয়ে গেলেন গ্লেব আর তাকে বললেন নদীর ওপারের মাঠ আর দূরের বনগুলোর দিকে তাকাতে।
‘সামোভার থেকে বেরুনো ধোঁয়ার মতো ঐ হলদেটে ধোঁয়ার টুকরোগুলো দেখতে পাচ্ছিস? আর হাওয়াটা কী রকম কাঁপছে? ওটাই হলো গরম। হ্যাঁ, তুই ঠাণ্ডা কিম্বা গরম কিম্বা যা কিছু দেখতে চাস সবই দেখতে পাবি।’
তানিয়া প্রশ্ন করলো, ‘ঠাণ্ডাটা হলো তো যখন বরফ পড়ে?’
‘তখনই শুধু নয়। গ্রীষ্মকালেও ঠাণ্ডাটা দেখা যায়। তুই অপেক্ষা কর, দিনগুলো যখন ঠাণ্ডা হয়ে আসবে আমি তোকে দেখাবো ঠাণ্ডাটা কি রকম দেখতে।’
‘কিসের মতো দেখতে?’
‘সন্ধেবেলার আকাশটা ভিজে ঘাসের মতো সবুজ দেখায়। আকাশটা তখন ঠাণ্ডা।’
ইতিমধ্যে তাপটা দারুণ বেড়ে উঠলো আর গরমে যে সবচেয়ে কষ্ট পেতে লাগলো সেটা হলো ছোট্ট একটা ব্যাঙ। সেটা থাকে উঠোনের এক এল্ডার ঝোপের তলায়।
রোদে উঠোনটা এতো গরম হয়ে উঠলো যে সেখানকার যত পোকা মাকড় পড়লো লুকিয়ে। এমন কি তাদের বাসা থেকে পিঁপড়েগুলো পর্যন্ত মাটির ওপর বেরিয়ে এলো না। ধৈর্য ধরে তারা অপেক্ষা করে রইলো সন্ধের জন্যে। মনে হলো শুধু গঙ্গাফড়িংগুলোই গরমের তোয়াক্কা করছে না। দিনগুলো যত গরম হয়ে ওঠে তত উঁচু উঁচু লাফ মারে তারা আর চেঁচায় তত জোরে। সেগুলোকে ধরা অসম্ভব। ব্যাঙটা বুঝতে পারলো ক্ষিদে পাওয়া কাকে বলে।
একদিন সে মাটির তলার ভাঁড়ার ঘরের দরজার তলায় একটা ফুটো দেখতে পেলো। আর তারপর থেকে সব দিনগুলো সে কাটাতে লাগলো সেখানকার সিঁড়ির ঠাণ্ডা ইটের উপর ঝিমিয়ে।
বাড়ীর ঝি আরিশা দুধ আনতে যখন ভাঁড়ারে আসে ব্যাঙটা ওঠে জেগে তারপর লাফিয়ে গিয়ে লুকোয় একটা ফাটা ফুলের টবের পিছনে—এ ঘটনায় আরিশা প্রতিবারই ওঠে আর্তনাদ করে।
সন্ধের দিকে ব্যাঙটা গুটি গুটি উঠোনে বেরোয় তারপর সাবধানে ফুলবাগানের কোণের দিকে যায় যেখানে সন্ধেবেলায় ফোটে তামাক ফুল আর যেখানে ঘন হয়ে জন্মেছে এ্যাস্ট্রার ফুলগুলো। প্রতি সন্ধেয় ফুলগুলোতে জল দেওয়া হয়, তাই সেখানে আরাম করে নিশ্বেস নেওয়া যায়—ভিজে মাটিটা ভারি সুন্দর আর সেঁতসেঁতে, আর মাঝে মাঝে তামাক গাছের শাদা পাপড়ি থেকে মাথার উপর ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে।
ব্যাঙটা চোখ বড় বড় করে অন্ধকারে অপেক্ষা করে থাকে লোকজন কখন হাঁটাহাঁটি, কথা-বলা, গেলাস ঝন-ঝন করা আর মুখ-হাত ধোয়ার পাত্রের নীচেকার তাঁবার ডাণ্ডাটা ঠংঠং করা বন্ধ করবে; বাতির পল্তেটাকে নামিয়ে ফুঁ দিয়ে সেটাকে নিবিয়ে দেবে। তারপরেই সবকিছু অন্ধকার আর রহস্যময় হয়ে ওঠে।
শুধু তখনই ফুলবাগানে খানিক লাফিয়ে বেড়ানো যায়, এ্যাস্ট্রার পাতাগুলো যায় কুটকুট করে কাটা, আলতো ভাবে ছোঁয়া যায় ঘুমন্ত এক মৌমাছিকে আর শোনা যায় তার ঝিমন্ত গুনগুনানি।
তারপর শোনা যায় মোরগদের ডাক আর আসে মাঝরাত—সবচেয়ে ভালো সময়। হয়তো শিশির পড়বে, আর তাহলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments