সিন্ধু-সভ্যতার পরিচয়
যদি আপনার হাতে সময় থাকে আর মনে বাসনা থাকে তবে চলুন, সিন্ধসভ্যতার যুগে অর্থাৎ মোহেনজোদারো আর হরপ্পার যুগে এক চক্কর বেরিয়ে আসা যাক। যারা কিছু কিছু পড়াশোনা করেন, তাঁরা হয়তো বলবেন, এই বিষয়টা নিয়ে তো ইংরাজী আর বাংলায় যথেষ্ট লেখালেখি হয়ে গিয়েছে, আর কত? সেই একই পুরানো কাসুন্দি আর বেশী ঘেঁটে কি হবে? কিন্তু আমার কি মনে হয় জানেন, কাসুন্দিটা আরও একটু ভালো করে ঘাঁটা দরকার। এই নিয়ে অনেক কিছু জানবার ও চিন্তা করবার রয়েছে। এটা স্মরণ রাখতে হবে, আমাদের এই উপমহাদেশের সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে যে প্রচলিত ধারণা চলে আসছিল, সিন্ধু-সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের আবিষ্কারের ফলে তার মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসে গেছে। নতূন করে ইতিহাস লিখতে হচ্ছে। কিন্তু সবে সূচনা। সিন্ধুসভ্যতার স্বরূপ সম্পর্কে যেটুকু জানা গেছে, তাতে বিশ্বের ইতিহাস বিজ্ঞানী ও ইতিহাস রসিকদের মধ্যে আলোড়ন পড়ে গেছে। কিন্তু এটাও অতি বড় সত্য যে, আমরা তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারিনি। সেই সমস্ত প্রকাশিত তথ্য আমাদের এই উপমহাদেশের সভ্যতার ইতিহাস রচনা করে তুলবার পক্ষে অপরিহার্য। প্রাচীন মিসর ও মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে আমরা বিস্তারিতভাবে জানতে পেরেছি, তার কারণ এই দুই অঞ্চলেই প্রাচীন যুগের বহু লিখিত দলিলপত্র পাওয়া গিয়েছে, যাদের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের ছবিটা পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ওই ধরনের কোনো দলিলপত্র বা যে কোনো রকমের লেখার নিদর্শন পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে তা হচ্ছে সীলমোহরের উপর ও মাটির পাত্রের উপর অংকিত কতকগুলো সাংকেতিক চিহ্ন। এই সাংকেতিক চিহ্নগুলোর অর্থভেদ করতে পারলে কিছু কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য অবশ্যই পাওয়া যেতো। কিন্তু দেশ-বিদেশের পণ্ডিতরা বহু চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত তাদের অর্থভেদ করতে পারেননি।
সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে এ পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য আহরণ করা হয়েছে, তাই নিয়েই কি আমাদের তুষ্ট থাকতে হবে? কোনো রকম দলিলপত্রের সন্ধান যখন পাওয়া গেলো না, তখন আর কি করেই বা ভরসা পাওয়া যায়? সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের মনে এরকম একটা নিশ্চল ধারণা রয়েছে। কিন্তু দলিলপত্র ইতিহাস রচনার একমাত্র উপাদান নয়। ইতিহাসের মাল-মসলা নানা রূপেই ছড়িয়ে পড়ে থাকে। একটা অতি সামান্য জিনিসের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সংযোজন হয়ে যেতে পারে। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের আবিষ্কারের পর থেকে অনুসন্ধানী পণ্ডিতরা এই নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। তাঁরা যতই এগিয়ে চলেছেন, ততই নতুন নতুন পথের সন্ধান পাচ্ছেন।
পরবর্তী গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই সভ্যতা শুধু মোহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ এলাকায় এই সভ্যতার প্রসার ঘটেছিল। পাকিস্তানে মাকরান উপকুলের সুঞ্জাজেন দোর থেকে ভারতের গুজরাটের ক্যাম্বে উপসাগর পর্যন্ত এই সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলে এদের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে। মোহেনজোদারো ও হরপ্পা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু এই সভ্যতার বাহন হয়ে যারা এ বিরাট অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা তো কোনো প্রবল শত্রুর আক্রমণে বা প্রকৃতির দুর্যোগের ফলে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনুসন্ধানের কাজ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তার ফলে এই বিস্তারিত অঞ্চলে এই সভ্যতার কোনো নতুন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যাবে না, এমন কথা কেউ জোর করে বলতে পারে? ঐতিহাসিকরা বলেছেন, এই সভ্যতার বাহকরা ভারতের উর্বর অঞ্চলগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। কিন্তু শারীরিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে না পারলেও মালপত্রের আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে এবং অন্যান্য সূত্রে তাদের প্রভাব যে ছড়িয়ে পড়বে এটা বিচিত্র কিছু নয়। কোনো কোনো বিষয়ে তাদের প্রভাব যে সারা উপমহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সেটা কাল্পনিক কথা নয়, প্রামাণ্য বলে গৃহীত।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments