বাদামী নেকড়ে

তার একটু দেরি হয়ে গেল। কারণ শিশির-ভেজা ঘাসের জন্য পা-ঢাকা জুতো পরে নিতে হল তাকে। ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখতে পেল, তার স্বামী অপেক্ষা করছে, বাদামের কুঁড়ির ফুটে-ওঠা দেখতে দেখতে বিস্ময়ে তন্ময়। লম্বা লম্বা ঘাসের উপর দিয়ে ফলের গাছগুলোর চারপাশে সে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলল।

“নেকড়েটা কোথায়?” জিজ্ঞেস করল সে।

কুঁড়িদের সৃষ্টি-রহস্যের দার্শনিক ও কাব্যিক জগৎ থেকে নিজেকে যেন সজোরে বিচ্ছিন্ন করে নিল ওয়াল্ট আরভিন। উত্তর দিল—“এই তো ছিল কিছুক্ষণ আগেও।” চারদিকটা দেখে নিয়ে সে বলল, “একটা খরগোশের পেছনে ছুটতে দেখেছিলাম তখন।”

ছিমছাম জায়গাটা ছেড়ে সরু পথটা ধরে যাবার সময় সে ডাকল, “নেকড়ে, নেকড়ে, এদিকে আয়, নেকড়ে।” সরু পথটা গিয়ে পড়েছে লাক্ষা-ঘেরা ম্যানজানিটা জঙ্গল ছাড়িয়ে শহরতলির পথে।

আরভিন দুহাতের আঙ্গুল ঠোঁটের ফাঁকে পুরে সুতীক্ষ্ণ শিস দিল। দুহাত কানে দিয়ে বিকৃত মুখভঙ্গি করল।

“দোহাই! একজন কবির সুর বাঁধা অনেক সূক্ষ্ম। তুমি এমন বিশ্রী শব্দ করছ! আমার কানের পর্দা ছিঁড়ে যাচ্ছে।”

“হে অরফিউস!”

“বলতে যাচ্ছিলাম তুমি একজন রাস্তার আরব।” সে কর্কশভাবে কথাটা বলে ফেলল।

“কবিত্বের জন্য কারুর বাস্তববোধ কমে না, অন্তত আমার পক্ষে তো নয়। এমন ব্যর্থ প্রতিভা আমার নয় যে সে কেবল পত্র-পত্রিকায়ই রত্ন-মাণিক্য বিকোতে পারে।”

অন্যমনস্কতার ভান করে সে বলে চলল, “আমি সুরুচিসম্পন্ন সঙ্গীতজ্ঞ নই, নাচঘরের কোকিলকণ্ঠ গায়কও নই, কেন? না, আমি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন লোক। আমার সঙ্গীতে এমন কোন খাদ নেই যাতে তার রূপান্তর আমি ঘটাতে পারি না। যেমন করেছি দেখ—ফুলে-ছাওয়া কুটির, সুন্দর পাহাড়-ঘেরা মাঠ, লালগাছের ঝোপ, সাঁইত্রিশটি গাছের ফলবাগান, কালজাম গাছের সুদীর্ঘ এবং স্ট্রবেরি গাছের নাতিদীর্ঘ সারি, আধ মাইলের মধ্যে ঝরনার কলধ্বনি। আমি হলাম সৌন্দর্য-ব্যবসায়ী, সঙ্গীতের সদাগর। প্রিয়ে ম্যাজ, আমি খুঁজি উপযোগিতা। পত্রিকার সম্পাদকদের ধন্যবাদ, আমি গান গাই, সে-গান আমার লোহিত-কুঞ্জে পশ্চিমা বাতাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফেরে, সে-গান শ্যাওলা-ঢাকা পাথরের উপর দিয়ে জলের কলতান হয়ে বয়ে যায়, সেই ধ্বনি আমার কাছে সঙ্গীত হয়ে দেখা দেয়। আমি গান গাই, ফের আমি সেই সঙ্গীতের আশ্চর্য রূপান্তর ঘটাই।”

“ওহ তোমার সব সঙ্গীতের রূপান্তর যদি এমন সার্থক হত!” হেসে ফেলল সে।

“নাম করে বল যে কোন্‌টা হয়নি।”

“তোমার লেখা সেই দুটি সুন্দর সনেট, যার বদলে কেনা হল এমন একটা গরু যে নাকি এই শহরের সবচেয়ে ওঁচা দুধেল গাই।”

“কিন্তু গরুটি দেখতে সুন্দর।”

“সে মোটেও দুধ দিত না কিন্তু”, বাধা দিল ম্যাজ।

“তবু সে কি দেখতে সুন্দর ছিল না?” সে জোর দিয়ে বলল।

“কিন্তু এখানে উপযোগিতা ও সৌন্দর্যের ভরাডুবি।”—ম্যাজ উত্তর দিল।

“আরে ঐ তো নেকড়ে!”

ঝোপে-ঢাকা পাহাড়ের দিকটায় একটি ঝোপ নড়ে উঠল, আর তখনই দেখা গেল পাহাড়ের খাড়া গায়ের কিনারে, চল্লিশ ফুট উপরে একটি নেকড়ের মাথা থেকে কাঁধ পর্যন্ত। তার আঁকড়ে-থাকা সামনের পা দুটোর ধাক্কায় একটা নুড়ি ছিটকে পড়েছিল তাদের পায়ে, সে কান খাড়া করে তীক্ষ্ণ চোখে তাই দেখছিল। তারপর সে দৃষ্টি ফিরিয়ে, মুখ হাঁ করে যেন হাসতে হাসতে তাদের কাছে নেমে এল।

স্বামী-স্ত্রী চিৎকার করে উঠল, “এই যে নেকড়ে, আমাদের প্রিয় নেকড়ে।”

সেই শব্দ শুনে তার কান দুটো ওঠা-নামা করল, গন্ধ শুঁকল কোন অদৃশ্য হাতের সোহাগের। তারা দেখল সে ঘন ঝোপের মধ্যে ফিরে যাচ্ছে। তারা এগিয়ে চলল। কিছু পরে সরু পথটা ঘুরে এসে, নুড়ি ও ঝুরো মাটির এক ছোটখাট স্তূপের মধ্যে সে তাদের সঙ্গ ধরল। তার মধ্যে দেখানোপনা কিছু ছিল না। স্বামীর কাছ থেকে কানের চারপাশে চাপড় খেয়ে, স্ত্রীর কাছ থেকে আর কিছুক্ষণ সোহাগ কেড়ে তাদের আগে আগে সরু পথ ধরে সে চলল নেকড়ের মতোই অনায়াস

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice