ঠাণ্ডা গোস্তের মামলা

বোম্বাই ছেড়ে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারী মাসে করাচী হয়ে লাহোর এসেছি। তিন মাস যাবত দারুণ টানা-পোড়নের মধ্যে কাটাই। বুঝতে পারতাম না, কোথায় বসে আছি, করাচীতে আমার বন্ধু হাসান আব্বাসের বাড়ীতে, বোম্বেতে না লাহোরে। লাহোরে কয়েকটি হোটেলে কায়েদে-আজম ফাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নৃত্য গীতের আসর লেগেই আছে।

তিন মাস যাবত আমার চিন্তা বা কল্পনা রাজ্যে কোন স্থিতিশীলতা আসেনি। কখনও করাচীর দ্রুতগামী ট্রাম, গাধার গাড়ী, আবার বোম্বের বাজার ও অলিগলি, অনেক সময় লাহোরের জমজমাট হোটেলের দৃশ্য আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সারাদিন চেয়ারে বসে কল্পনা রাজ্যে হারিয়ে যেতাম। অবশেষে বোম্বে থেকে যা টাকা সঙ্গে এনেছিলাম, বাড়ীতে ও বাড়ীর অদুরে “ক্লিফটন পান্থসালায়” নিঃশেষ হয়ে গেছে। এবার আমার টনক নড়ে। এবার আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলাম, আমি লাহোরের উপকণ্ঠে অবস্থান করছি। ভাবতে থাকি কিছু একটা করতে হয়। খবর নিয়ে জানতে পারি, দেশ বিভাগের পর ফিল্ম কোম্পানীগুলির নিভু নিভু অবস্থা। চিত্রনির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কারবার কোম্পানীর অফিসের সম্মুখস্থ সাইন বোর্ডেই সীমাবদ্ধ। দারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। জমি বরাদ্দের তোড়জোড় চলছে। মোহাজির ও অমোহাজিররা ধরপাকড় করে কারখানা ও দোকান পাটের জন্য এলটমেণ্ট নিচ্ছে! আমাকে জমি নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এই লুটপাটে অংশগ্রহণে আমার মন সায় দেয়নি।

তখন জানতে পারি বিশিষ্ট কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও চেরাগ হাসান হাসরাত দু’জনে মিলে একটি উর্দু দৈনিক প্রকাশের চেষ্টা করছেন। উক্ত দৈনিকের নাম ‘ইমরোজ’। আমি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করি। তখন পত্রিকার ডামি তৈরী হচ্ছে। দ্বিতীয় বার যখন দেখা করি, উক্ত দৈনিকের কয়েক সংখ্যা বের হয়ে গেছে। পত্রিকার গেটআপ দেখে আনন্দিত হয়েছি। ইচ্ছে হয়েছে লেখনী শুরু করব কিন্তু লিখতে বসে দেখি কল্পনা রাজ্য ফাঁকা। অনেক চেষ্টা করেও পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারিনি। পাকিস্তানে উর্দু ভাষার রীতি কেমন হবে। আমাদের রাষ্ট্র কি ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে? বার বার প্রশ্ন জেগেছে পাকিস্তানের সাহিত্য কি ধরনের হবে। রাষ্ট্রের প্রতি আমরা সর্বদা অনুগত থাকব সত্য কিন্তু আমরা কি সরকারী নীতির সমালোচনার অধিকার পাব? নানা জিজ্ঞাসা আমার মনে ভীড় জমায় কিন্তু এগুলির কোন সমাধান পাইনি। যেদিকে তাকাই শুধু ভীতি আর শঙ্কা। কিছু লোক আনন্দে আত্মহারা ৷ কারণ তাদের হাতে আকস্মিকভাবে প্রচুর ধন সম্পদ এসে পুঞ্জীভূত হয়েছে। অধিকাংশ মোহাজির বিষণ্ন ও চিন্তাগ্রস্থ। কারণ তারা লুন্ঠিত; সর্বস্ব ত্যাগ করে এদেশে চলে এসেছে।

বেতারে ইকবালের গজল রাতদিন প্রচার করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফিচার প্রোগ্রামে হাঁস মুরগী পালন, জুতা তৈরী, চামড়া রঙ করার নিয়ম এবং মোহাজির ক্যাম্পে কতলোক এসেছে আর গেছে ইত্যাদি প্রচারিত হয়ে থাকে।

আমি বন্ধুবর আহামদ নাদিম কাসমীর সাথে দেখা করি। কবি সাহির লুধিয়ানভীর সাথে দেখা হয়। আরও অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সকলেই মানসিকভাবে উদ্বেগ ও শঙ্কার মাঝে কালাতিপাত করছেন। আমার মনে হয়েছে, এক বিরাট ভূমিকম্পের ধাক্কায় বিস্ফোরনোন্মুখ অগ্নিগিরির জ্বালামুখে কিছু লাভা আটকা পড়ে আছে। এগুলি বেরিয়ে পড়লে গোধূলির ন্যায় আকাশ পরিষ্কার হবে। তখন বলা যাবে, প্রকৃত পরিস্থিতি কি?

এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। বেকার সারাদিন ভবঘুরের ন্যায় ঘুরে বেড়াই। নিজে চুপচাপ অন্যদের নিরস রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক শুনি। ভবঘুরের ন্যায় ঘুরে বেড়ানোর ফলে আমার উপকার হয়েছে। চিন্তারাজ্যে যে সব আজে বাজে ভাবনা ভিড় জমিয়েছিল সব ক্রমশ দূরীভূত হয়। অতঃপর আমি চটুল রচনা লেখায় হাত দিই। ‘ইমরোজের’ জন্য ‘নাকের প্রকার ভেদ’ ও ‘দেওয়ালের লিখন’ শীর্ষক দু’টি রম্য নিবন্ধ লিখি। পাঠকদের কাছে আমার দুটো লেখাই পছন্দ হয়। এরপর আমি নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক রচনা লিখতে শুরু করি। এই রচনা পরে “তল্খ তরস আওর শিরিন”

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice