সাম্প্রদায়িকতা ও বাংলাদেশ

পঁচিশে জুলাই মহাবোধি সোসাইটি হলে একটি সেমিনার আয়োজিত হয়েছিলো। বেরিয়ে আসছিলুম। দরজায় এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভারি সুন্দর চেহেরা, বয়স বাইশ-তেইশ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেশ তো বক্তৃতা করলেন: কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে যত হিন্দু এসেছেন পূর্ব বাংলা ছেড়ে তাঁদের ঠেকালেন না কেন আপনাদের বঙ্গবন্ধু?’ আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম, ‘কখনকার কথা বলছেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘১৯৪৭ সাল থেকে!’

জানি, এ প্রশ্ন-বিচ্ছিন্নভাবে শুধু এ ভদ্রলোকের নয়: বাংলা দেশ প্রসঙ্গে এ প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি দেয়। কেউ মুখ ফুটে বলেন, কেউ বলেন না। এ প্রশ্ন মনে জাগাও অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমরা যেহেতু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলুম, তাই প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি কী করে পূর্ব পাকিস্তান পূর্ব বাংলা হলো এবং কী করে পূর্ব বাংলা বাংলা দেশ হলো। কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের জনগণ, যাঁদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘকাল কোন যোগাযোগ ছিলো না, হঠাৎ একদিন ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান শুনে নিশ্চয়ই বিস্মিত হয়েছেন—অনেক প্রশ্ন ভিড় করে এসেছে সে মুহূর্তে তাঁদের মনের কোণে—তারপর অবশ্য পূর্ণ সহানুভূতি নিয়ে নিপীড়িত বাঙালদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁরা আজো পাননি। তাঁরা তো জানেন ২৪ বছর আগে পূর্ব বাংলার লোকেরাই ভোট দিয়ে জিতিয়েছিলেন মুসলিম লীগকে। এবং মুসলিম লীগকে এঁরা ভোট দিয়েছেন একটি স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র—পাকিস্তান গড়ে তোলাবার জন্যেই। এ বঙ্গের লোকেরা আরো জানেন যে, পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের একান্ত বিষম দুটি জাতি একত্রিত হয়েছিলো কেবল ইসলাম ধর্মেরই নামে। তাহলে আজ শতাব্দীর এক পাদের মধ্যেই সেই বাঙালি মুসলমানরা ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরোধী হয়ে সর্বাত্মক সংগ্রামে লিপ্ত হলেন কেন? পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে এরা কি পাকিস্তানের পক্ষে বিপুল ও আন্তরিক উৎসাহ দেখান নি? অথবা পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরে এরা কি পাকিস্তানের যথেষ্ট অনুগত নাগরিক ছিলেন না?

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের কারণ নেই, একটি ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিক হিশেবে বাস করার উদ্দেশ্যেই পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ পাকিস্তানের পক্ষে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিলেন। তাদের মনে নিশ্চয় এমন উচ্চাশা ছিলো যে, ইসলামের সাম্য-মৈত্রীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান ন্যায় বিচার থেকে তাদের বঞ্চিত করবে না। কিন্তু এ মোহ ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। তাই পাকিস্তানের জন্মের মাত্র সাত বছর পরে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, দেখতে পাচ্ছি, ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ—পাকিস্তানস্রষ্টা মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। যে দল কেবল ধর্মীয় কারণে একদা মুসলমানদের একচেটিয়া ভোট পেয়েছিলো, সেই দলই সাত বছর পরে আর ভোট পায়নি। কেননা, তখন সংগ্রাম আর হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি, তখন সংগ্রাম শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জনের। মোহমুক্ত বাঙালিরা দেখেছেন ধর্মের নামে তাঁরা যে রাষ্ট্র গঠন করেছেন, সে রাষ্ট্রে ধর্ম সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না, বরং দেশের সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠকে শোষণ করেন ধর্মের নামে। এই শোষণের পরিমাণ ও তীব্রতা ক্রমশ জ্যামিতিক নিয়মে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেটাই সকল ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়ম। এই বিপুল অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মুখে ধর্মের মোহ কদ্দিন থাকে? ধীবে ধীরে তাই বাঙালিরা হতাশ হয়েছেন। ধর্মের ওপর তাঁদের আস্থা বিচলিত হয়েছে।

তদুপরি, বর্ধিত অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা লাভ করে, চিরকাল যাঁদের সঙ্গে ঝগড়া করেছেন, সেই হিন্দুদের প্রতি বাঙালি মুসলমানরা ক্রমশ বিদ্বেষমুক্ত হয়েছেন। এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে, একদা হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বড়ো রকমের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিলো। দৈবাৎ পূর্ব বাংলার জমিদার, মহাজন, উকিল, ডাক্তার যেহেতু হিন্দু ছিলেন এবং সেখানকার অধিবাসীর অধিকাংশ যেহেতু মুসলমান ছিলেন, সে কারণে, যদিও শোষণ করেছেন শোষকরা, তবু নাম হয়েছে হিন্দুদের। সেই হিন্দুদের প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতা থেকে বেঁচে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice