ঋত্বিক ঘটক বিজন ভট্টচার্য ও মাতৃতত্ত্ব
ঋত্বিক ঘটক ও বিজন ভট্টাচার্য বাংলায় এমন দুজন নাট্যশিল্পী যাঁরা যুগ-যুগান্তর সঞ্চিত শোষণ ও লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী জনগণের বিদ্রোহকে ভাষা দিতে গিয়ে প্রবলভাবে মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীক ব্যবহার করেছেন। দুজনেই যেহেতু বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম বা মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে জীবনাদর্শরূপে গ্রহণ করেছিলেন, সেইজন্য দুজনের কাজই আদৃত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে। এর কারণ, মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীককে বস্তুবাদী বলা গেলেও অগ্রসর বিজ্ঞানের পরিপোষক বলা যায় না। এই সম্প্রতি- দুই নাট্যশিল্পীর দুজনেরই প্রায় একটানা চল্লিশ বছরের কাজ যেহেতু তাঁদের মৃত্যুর পরেও আগামীতে বেশি-বেশি আদৃত হবে বলে মনে করার সৃষ্টি হয়েছে ইতিমধ্যেই, সেজন্যে বিতর্কের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচ্য। সামঞ্জস্য যদি আসে তবে কীভাবে আসবে, সেটি চিন্তনীয়।
এই দুই নাট্যশিল্পীই আদিম সাম্যবাদে ফিরে যাওয়ার জন্যে তাগিদ দেবার পরিবর্তে শ্রেণীসংগ্রাম দ্বারা শ্রেণীসমাজকে ভেঙে চুরমার করে সভ্য সমাজের চরম উৎকর্ষে পৌঁছবার দিকেই তাঁদের মূল্যবোধগুলিকে বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন। তাঁদের কাউকেই লোকনাট্যকারও বলা যায় না। দুজনেই আধুনিক নাট্যশিল্পী। বিজন ভট্টাচার্যের ‘দেবী গর্জন’ নাটক এবং ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'র চিত্রনাট্য থেকেই এটা প্রমাণিত। ব্যতিক্রমী আধুনিকতম রূপের মধ্যে একটা আবহমানতার সারসত্তাকে কেন তবে ধরে রাখতে চাইলেন তাঁরা? মাতৃতান্ত্রিকতার ভাবধারা আদিম সাম্যবাদী মানবগোষ্ঠীগুলিতে সর্বময় হিশেবে অধিষ্ঠিত থাকার পরে সামন্ততন্ত্রের আমলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রথা ও প্রসারের ভিত্তিতে শ্রেণীসমাজ ব্যবস্থায় একদিকে অভিজাত এবং অন্যদিকে জনগণের দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। এই দ্বিধাবিভক্ত ভাবধারাকে কীভাবে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের সঙ্গে যুক্ত রাখলেন তাঁরা? ভাবের জগতে সামন্ত্রতন্ত্রের শাসকশ্রেণীর মাতৃ-অর্চনা যে-প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন, তাকেই বা কী করে কাটিয়ে উঠলেন তাঁরা? এই ধরনের প্রশ্নগুলির মীমাংসা প্রয়োজনীয়। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের সঙ্গে মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীকগুলির সামঞ্জস্যবিধানের সম্ভাব্যতার জন্যে এই প্রয়োজন।
কেন তাঁরা দুজনেই নাটকে এবং চিত্রনাট্যে মাতৃতান্ত্রিক ভাবপ্রতীক ব্যবহারের দিকে এত বেশি ঝুঁকেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর কয়েকভাগে দেয়া যেতে পারে।
এই দুই বিদ্রোহীর প্রায় চল্লিশ বছরের কাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দুজনেই আধুনিক নাট্যজগৎ থেকে বেরিয়ে গণনাট্যে উপকরণের সন্ধানে শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে এমন কতকগুলি ভাবপ্রতীকের খোঁজ করছিলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ নিয়ে লেখা আধুনিকতম নাটককেও জনগণের সংগ্রামী বোধের মর্মভূমিতে সহজেই স্থাপন করা যেতে পারে। মাতৃপ্রতীকই তাঁদের কাছে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী মাধ্যম বলে এই সময়ে মনে হয়েছিল। এই মাতৃপ্রতীককে নিয়ে তাঁরা আমৃত্যু কাজ করেছিলেন।
তিরিশের দশকের শেষে এবং পুরো চল্লিশের দশকে এই দুই শিল্পীর প্রথম যৌবনের একই সঙ্গে অতিজিজ্ঞাসু ও সর্বগ্রাহী মনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের একটা প্রিয় কথা রং ধরিয়েছিল। সেটা হচ্ছে—‘জাতীয় রূপাবরণে সমাজতান্ত্রিক বিষয়বস্তু।' দুজনেই যেমন জনগণের মুক্তির উপায়কে সাম্যবাদী সমাজের রূপরেখায় স্থাপন করেছিলেন, তেমনি সঙ্গে-সঙ্গে বিনা দ্বিধায় বাংলায় গণমানসের প্রিয় রূপরেখাগুলিকে নিয়ে পরীক্ষা করার কাজে অন্যান্য সাথীদের সঙ্গে মিলে গণনাট্য আন্দোলনের যৌথ আত্মানুসন্ধানের কর্মী হিশেবে নিজেদের উৎসর্গিত করেছিলেন। মাতৃ-ভাব-প্রতীক অথবা মাতৃতন্ত্রকে বিপ্লবের কাজে ব্যবহার করার প্রাথমিক উৎস-সূত্র এখানেই।
দুজনেরই জীবনে আর-একটা তাগিদ মাতৃ-প্রতীককে প্রাধান্য দেবার জন্যে উপকরণের সন্ধানী করেছিল। শ্রমজীবী নারীকে অবক্ষয়ী সামন্তবাদী-পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যে-চরম দুঃখ, লাঞ্ছনা ও অবমাননার চক্রে নিষ্পেষিত করে আসছে; এবং এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে বিশেষ করে বাংলায় শ্রমজীবী নারীর তরফ থেকে যে-মর্মন্তুদ আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাতে বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিক ঘটক সমসাময়িক আরও অন্যান্য যুবার মতো বিশেষ করে চল্লিশের দশকের যুদ্ধ দুর্ভিক্ষ ও দেশভাগের সময়ের শ্রমজীবী নারীর চরম অবমূল্যায়নে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা দুজনেই তখন সেই সমাজের ভিত্তিকে রাতারাতি গড়ে তুলবার ব্যবস্থা করতে না-পেরে শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে মাতৃরূপের বর্ম তৈরি করেছিলেন এবং নারীকে সেই বর্ম পরিয়েছিলেন। এই বর্মের ছাঁচটাকে তাঁরা দুজনেই নিয়েছিলেন বাংলার নিপীড়িত জনগণের কাছ থেকে, যারা হাজার-হাজার বছর ধরে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments