আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের সাথী

২৮শে এপ্রিল (১৯৬৬) রাত্রিবেলা আমি দমদম সেন্ট্রাল জেলে পুলিসের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ আফিস হতে সেন্সর হয়ে আসা একখানা পত্র পাই। ২৩ শে এপ্রিল তারিখের এই পত্রখানা ছিল আমাকে লেখা আব্দুল হালিমের শেষ পত্র। তাতে সে আমায় জানিয়েছিল যে ১৮ই এপ্রিল, রাত্রিবেলা সে কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল হতে মুক্তি পেয়ে বাসায় ফিরেছে এবং “আমরা প্রত্যেক দিনই আপনাদের মুক্তির প্রতীক্ষা করছি।” ২৯ শে এপ্রিল (১৯৬৬) সকাল বেলা চা খাওয়ার পরে আমরা দৈনিক খবরের কাগজ পড়া শেষ করেছি, আমাদের কোনো কোনো সহবন্দী স্নান করতে গেছেন,—এমন সময়ে জেল অফিস হতে হঠাৎ বজ্রাঘাতের মতো দুঃসংবাদ এলো যে আব্দুল হালিম আর নেই। সেদিন ভোরে আকস্মিকভাবে তার হৃদয়ের স্পন্দন থেমে গেছে। শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছে আব্দুল হালিম—আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের কাজের সাথী। আর সে জেগে উঠবে না। আমার মনের অবস্থা কী রকম যে হয়ে গেল তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত শরীর যেন অবশ-অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে। যদিও আমি মুখ খুলে কাউকে কোনো কথা বলিনি তবুও কমরেডরা আমার অবস্থা বুঝলেন। দেখলাম আমাদের তরুণ কমরেড মহাদেব বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না। সব সময়ে আমার কাছে কাছে থাকছেন। আমার চেয়ে কমপক্ষে বারো বছরের ছোট আব্দুল হালিমের মৃত্যু-সংবাদ যে আমায় শুনতে হবে এমন কথা স্বপ্নেও আগে কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। আমি মরে গেলে আমাকে সমাহিত করার ব্যবস্থা তো হালিমের ই করার কথা ছিল।


গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে সে যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্যে তিলে তিলে আত্মদান করে গেছে, পার্টির বাইরে সে যে নিজের কোনই অস্তিত্ব রাখেনি... আব্দুল হালিম কখনও আত্মপ্রচার করত না। তা সত্ত্বেও একজন ত্যাগী রাজনীতিক কর্মীরূপে পার্টির বাইরের লোকেরাও তাকে জেনেছিলেন ও ভালোবেসেছিলেন।


জেল কর্তৃপক্ষ আরও খবর দিলেন যে হালিমের মৃতদেহকে শেষ সম্মান জানাতে যাওয়ার জন্যে গভর্নমেন্ট কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত ও আমাকে পুলিস হিফাজতে এক ঘণ্টার ছুটি মঞ্জুর করেছেন। বাইরে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত পুলিসরা এলেন একখানা ভাঙা গাড়ি নিয়ে। এই গাড়িতে আমরা কোনোরকমে ৩২-জি, ইলিয়ট রোডে হালিমের বাসা পর্যন্ত গেলাম বটে, কিন্তু গাড়িখানা আর কিছুতেই চলতে রাজি নয়, অথচ বাড়ির গেটে আমাদের অপেক্ষায় থাকা পুলিস অফিসাররা আমাদের জানালেন যে মৃতদেহ ৩৩ নম্বর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা যখন আমাদের গার্ডদের বললাম যে অন্তত ট্যাক্সি ভাড়া করে আমাদের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে নিয়ে চলুন তখন সাদা পোশাক পরা একজন পুলিস অফিসার তাঁর প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে এগিয়ে এলেন, এবং আমাদের তাঁর গাড়িতে যেতে বললেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই আমাদের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পৌঁছিয়ে দিলেন।

সেই বাড়িটি তখন লোকারণ্য। দোতলায় উঠতে আমার কষ্ট হয়। আমাকে একরকম শূন্যে তুলে ধরেই সকলে দোতলায় নিয়ে গেলেন। হলঘরে হালিমের মৃতদেহ রাখা হয়েছিল। আমার মনে হলো গভীর নিদ্রায় সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মৃত্যুর কোনো চিহ্ন নেই তার চেহারায়। হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাঁদের মৃত্যু হয় তাঁদের এই রকমই দেখায়।

আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। মনে হচ্ছিল খানিকটা কেঁদে নিতে পারলে আমার বুকটা কিছু হালকা হতো। এই সময়ে হালিমের মেয়ে তানিয়া ও ছেলে বিপ্লব এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার কান্নার বেগ আমি অতি কষ্টে সংবরণ করলাম। মনে হলো এই হতভাগ্য ছেলে-মেয়ে দু'টির যে অপরিমেয় শোক, তার সঙ্গে কি আর কারুর শোকের তুলনা হয়? কোন্ শৈশবে তারা মাকে হারিয়েছে। তাঁর কথা তাদের ভালো করে মনেও নেই। আব্দুল হালিমই ছিল একাধারে তাদের মা ও বাবা দু-ই। কী অনাথই না হলো তাদের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice