আমাদের সামাজিক অবস্থা এবং নারীর মানসিক সমস্যা

অতি সাধারণ ঘরের মেয়ে আনিলা (ছদ্মনাম)। তার স্বপ্ন ছিল অনার্স সম্পূর্ণ করে ও ভালো কোম্পানিতে চাকরি করবে, স্বাবলম্বী হবে। বাবা-মায়ের চাপে অনার্স অসম্পূর্ণ রেখেই তাকে বিয়ে করতে হলো। পড়াশোনা সম্পূর্ণ হলো না। স্বামী চায় না বাড়ির বউ চাকরি করুক, তাই স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছাও চিরদিনের জন্য বলি দিতে হলো। সব স্বপ্ন হারিয়ে তরুণীটি মানসিকভাবে জর্জরিত ও বিপর্যস্ত। বেঁচে থাকার ইচ্ছাও ত্যাগ করেছে। প্রতিনিয়ত সামাজিক ও মানসিক চাপে আনিলার মতো বহু নারী মানসিক রোগের শিকার ও অসুস্থ।

প্রতিবছর ১০০টির বেশি দেশে ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই নারী। পুরুষের সব ইচ্ছা ও চাহিদাকে অগ্রাধিকার প্রদান ও নারীদের প্রতি অবহেলার দৃষ্টিই এর প্রধান কারণ। ছোটবেলা থেকেই ছেলেসন্তানদের প্রতি মা-বাবার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ও কন্যাসন্তানকে পরিবার ও সমাজের বোঝা মনে করার মনোবৃত্তি নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অধিকাংশ সময়ই বেড়ে ওঠার সাথে সাথে একজন নারীকে শিক্ষা, পড়াশোনা, চাকরি সব ক্ষেত্রে অন্যের ইচ্ছা পূরণ করে চলতে হয়। নিজের বহু ইচ্ছা ও শখকে চিরকালের জন্য মেরে ফেলতে হয়। একজন নারীর কাছে অধিকাংশ সময়ই তার কোন বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা, তার জীবনের লক্ষ্য কখনো জানতে চাওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছা থাকলেও চাকরি করতে পারে না। আবার স্বামী চাইলেও সংসার চালানোর প্রয়োজনে চাকরি করে, পরবর্তীকালে হয়তো স্বামীর ইচ্ছাতেই চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। মানসিক চাপের শিকার হয়ে অনেক সময় নারীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মুক্তির পথ হিসেবে। অনেক সময় পাড়ার বখাটে যুবকদের কারণে অভিভাবকেরা তরুণীদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। জোরপূর্বক অচেনা পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়ে এক অজানা জীবন নারীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে নারীদের তা মেনে নিতে হয়। সংসারে ছেলেমেয়েদের মানুষ করার ক্ষেত্রেও নারীর ইচ্ছার কোনো মূল্যায়ন হয় না। প্রতি মুহূর্তে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে নারীরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের এ অসুস্থতাকে দেখা হয় অবহেলার চোখে। সামাজিক বাধা ও লোকলজ্জার ভয়ে নারীদের মানসিক অসুস্থতার কথা কাউকে বলা হয় না এবং চিকিৎসকের কাছেও নেয়া হয় না।

যত দিন সমাজে নারী ও পুরুষের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে না, সামাজিক ও মানসিকভাবে নারীর ওপর এ অত্যাচার বন্ধ হবে না, তত দিন নারীরা মানসিক অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাবে না। কাজেই সমাজে নারী ও পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা অতীব জরুরি। মানসিক অশান্তি, চাপ নানা শারীরিক অসুখের জন্যও দায়ী। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ সবার কাছে সহজভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে, যেন নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে কোনো সামাজিক বাধা, লজ্জা ও দ্বিধা কাজ না করে।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice