জেন্টলম্যান—রঞ্জন
কথাটা মনে পড়ল সেদিন সকালে বাথরুমে। একটু অদ্ভুতভাবে।
হাতে আমার ট্রুথব্রাশ, সামনে টুথপেস্টের টিউব। মাসের শেষ, তাই টিউব প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। যখন ভর্তি থাকে তখন আস্তে আমি ওটার লেজের দিকে চাপ দিই আর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রায় এক ইঞ্চি পরিমাণ টুথপেস্ট। কম নয়, ‘বেশি নয়। কিন্তু যে টিউব তার অন্তিম অবস্থায় পৌঁছেছে তার সাধ্য নেই অমন মিতাচারী হবার। তাই আমার ফুরিয়ে আসা টিউব সম্বন্ধে যখন আমার মনে সন্দেহ ছিল আধ ইঞ্চি পেস্টও তার অভ্যন্তরে আছে কিনা তখন স্বভাবতই আমি ওটার গলা টিপলুম জোরে—আর অমনি বেরিয়ে এলো প্রয়োজনাতিরিক্ত টুথপেস্ট, প্রায় দু’ ইঞ্চি। অপচয় হলো।
কিন্তু আমার ততক্ষণে মাজনের কথা মনে ছিল না। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল অজিত ঘোষের মুখ। ওর দশা হয়েছে আমার ওই টুথপেস্ট টিউবটার মতো। সবই প্রায় ফুরিয়ে গেছে। বাকি যা আছে তা মাথায় এসে উঠেছে। ওর আর সাধ্য নেই হিসেবী হবার। মাথার দিকে একটু টিপলে বেরিয়ে আসে বেহিসেবী দু’ ইঞ্চি।
অজিত ঘোষের টিউব যখন ভর্তি ছিল তখন আমি ওকে জানতুম না। আমি ছাড়া প্রায় সবাই জানতো। আজও কলকাতায় এমন প্রধান ব্যক্তি—অফিসে, ক্লাবে—অল্পই আছেন যাঁদের সঙ্গে অজিত অন্তরঙ্গ নয়! ম্যাকিনলে কোম্পানির নাম্বার ওয়ান মিস্টার উইলিয়াম আর্চারকে অজিত বিল্ বলে ডাকে অনায়াসে। ওয়াল্টার হ্যারিসন কোম্পানির বড় সাহেব আর সবায়ের কাছে অ্যাণ্টনি ক্যাম্পবেল হতে পারে, অজিতের কাছে অনেক দিন থেকে সে টোনি বয় মাত্র। এর কারণ বোঝাও শক্ত নয়, কেননা অজিত ঘোষ প্রথম সারির একটি ম্যানেজিং এজেন্সির অফিসে প্রবেশ করেছিল এমন দিনে যখন ওইসব চাকরিতে অল্প ভারতীয়েরই প্রবেশাধিকার ছিল। সরকারি চাকরিতে আই সি এস বা আই পি যেমন একদিকে আর আজকালকার আই এ এস অপর দিকে, অজিতের সঙ্গে স্বরাজোত্তর নেতাজী সুভাষ স্ট্রিটের কালো সাহেবদের ব্যবধান ততখানি বা তার চেয়েও বেশি। অজিত শুধু য়ুরোপীয়ান কভেনান্টেড অ্যাসিস্ট্যাণ্ট ছিল না, তার নিয়োগ হয়েছিল বিলাতে, যার নাম বোধ হয় হোম অ্যাপয়ণ্টমেণ্ট।
অজিতের অধিকার ছিল এই চাকরিতে। ওর পিতামহ ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, ওর বাবা ছিলেন স্বল্পসংখ্যক ভারতীয় আই এম এস-দের অন্যতম। ওর নিজের শৈশব কেটেছে ইংল্যাণ্ডে কোনো দ্বিতীয় শ্রেণীর পাবলিক স্কুলে—ছুটি কাটাতে সুইটজারল্যাণ্ডে বা দক্ষিণ ফ্রান্সে, পিতামহী ও পরে মায়ের সঙ্গে। প্রথমে কাজ করেছিল হোম অফিসে, পরে বদলি হয় প্রথম করাচি শাখায়, পরে বম্বেতে এবং সব শেষে কলকাতায়। এটা অজিতের কাছে শোনা নয়; যাঁরা জানেন বলেন, অজিত এতদিনে ওর কোম্পানির ডিরেক্টর হতো নিশ্চয়ই। এখন ওর জায়গায় অন্য ভারতীয় আছেন।
এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল এইটে বোঝাতে যে এত উপরে ছিল বলেই অজিতের পরবর্তী পতনে এত শব্দ হয়েছিল—আজও এ সম্বন্ধে গল্প শোনা যায় এ-মহলে ও-মহলে। এত উপর থেকে পড়েছে বলেই ওর নিজের আঘাত লেগেছিল এত বেশি।
বাইরে থেকে অনেকের কাছেই অজিত-পতন আকস্মিক বলে মনে হয়েছিল। অত বড় বাড়ি একদিনে ধসে যায় না। নিচে থেকে তার ভিত ক্ষয়ে যাচ্ছিল অনেক দিন থেকেই, কিন্তু অজিতের বাইরের জীবনযাত্রায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন কেউ দেখতে পায়নি। রেসে অজিতকে দেখা গেছে আগেকার মতো। তফাত যদি কেউ লক্ষ করতো তবে শুধু দেখা যেতো যে অজিত আগের চাইতে একটু বেপরোয়া এবং দুটো রেসের মধ্যে সে বারে যেন একটু বেশি সময় কাটাচ্ছে। ক্যালকাটা ক্লাবে আগেও অজিতের নিত্য উপস্থিতির কথা সবাই জানতো। দু’য়েকজন ছাড়া কেউই লক্ষ করেনি যে অজিত আগে কেউ ডাব্ল্ চাইলে তাকে বর্বর মনে করতো, এখন সে নিজেই ডাব্ল্ ছাড়া নেয় না। তারও কিছুদিন পরে বারম্যান জিজ্ঞাসা করেছিল : “আজ জিন্ কেন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments