সুর-শহরের সান্নিধ্যে

'গানবাজনায় ঢাকার নাম ছিল। অনেক ধ্রুপদী গায়ক ছিলেন। ভগবান সেতারীর বাজনা ছিল অপূর্ব, কেশব বন্দ্যোপাধ্যায়ের তবলা-বাদনের খ্যাতি ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। মধ্যবিত্ত সমাজে দুটি ছোট মেয়ের খুব নাম—একজন রানু সোম, প্রতিভা বসু নামে যাঁর সাহিত্যিক খ্যাতি, এবং অন্যজন রেণুকা সেনগুপ্ত—যাঁর “যদি গোকুলচন্দ্র ব্রজে না এলে” গানটির রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল রেকর্ড ভেঙে। অন্য গায়ক ও সংগীতজ্ঞ আসতেন বাইরে থেকে। একবার এলেন দিলীপ রায় এবং মাতিয়ে দিয়ে গেলেন। আর একবার এলেন আলাউদ্দীন খাঁ, যিনি সৃষ্টি করলেন ইন্দ্রজাল। নজরুল ইসলাম এসেছিলেন— যেখানে ডাকা হয় সেখানেই আবৃত্তি করতেন। “বিদ্রোহী" আর গেয়ে শোনালেন “দুর্গম গিরি কান্তার মরু”। (আট দশক—ভবতোষ দত্ত। পৃ. ৫৪ )

ঢাকা যখন সুরের আগুনে দীপ্তমান, তখন শহরটার, আজকের মত আভিজাত্য ছিল না। ঘরোয়া আঙিনায় বিলাসী মানুষের সখের আসরে, গুণীজনের আগমণ ঘটেছে একের পর এক। এভাবেই গড়ে উঠেছিল ঢাকার সংগীত জগতের প্রাথমিক বনিয়াদ। সেই ঐশ্বর্য মোড়া দিনগুলি, অনন্য মুহূর্তগুলি বাঙালি জীবনের অপরিমিত সম্পদ। কেবল কলকাতাই নয়, ঢাকা ঘিরে বাঙালি মানসিকতার যে অসাধারণ পরিমণ্ডল একদা গড়ে উঠেছিল, তারই একটি অভিজ্ঞান হল সংগীত। যাকে বাদ দিয়ে শহরের ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যায়।

ঢাকার জনজীবনে বিনোদনের ছিল নানান উপকরণ। সে বিষয়ের পূর্ববর্তী আলোচনায় আলোকপাত করা হলেও, আলোচনাটি পূর্ণাঙ্গ নয়। ঢাকার জনসাধারণের সাংগীতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন কাল থেকে। রাজা লক্ষ্মণ সেন অসাধারণ সুরসৃষ্টির জন্যই স্মরণীয় হয়ে আছেন। চোদ্দশতকে ইবন বতুতার বিবরণে পাওয়া যায় সংগীতচর্চার পরিচয়। সতের শতকে ইসলাম খাঁর দরবারে ছিল ১২০০ সংগীত ও নৃত্যশিল্পী। চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ উৎসব সে সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যার অন্যতম মাধ্যম ছিল সংগীত। হিন্দুমুসলমান সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সমবেত সংগীতে অংশগ্রহণ করত। হিন্দুদের মধ্যে চৈত্র সংক্রান্তির কালীনাচ ছিল সমাদৃত। তাছাড়া ছিল বিবিধ লোকসংগীতের জনপ্রিয়তা। কিন্তু মোঘল আমলে উচ্চাঙ্গ সংগীতচর্চা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

পঞ্জাবী ভাগ ও সারং ছাড়াও টপ্পা খেয়াল, গ্রুপদ, ঠুমরী চর্চায় বহু বিশিষ্ট সংগীত সাধক সেকালেই সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন রওশন খান, গোপাল, রহিম বসাক, মিঞা হাবিব, স্বপন খান, হামিক মোহাম্মদ, হোসাইন, ঈমাম বক্স, মিতান খান, মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক, কালু খান, রাজা কালীনারায়ণ রায়, মোহাম্মদ খান, মিঃ আলি মাহদী, মিঃ গুলাম মোস্তাফা, হাকিম রমজান, খাজা শাহজাদা প্রমুখ। “খাজা আহসানউল্লাহ হারমোনিয়াম বাজানোতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। সালাম ও আখতার সেইসময়ের প্রসিদ্ধ হারমোনিয়াম বাদক। নবাবপুরের বসাকরা পাখোয়াজ জনপ্রিয় করেছিলেন। রামকুমার কিশোরী, মোহন বসাক, কৃষ্ণলাল সুত্রধর ও হরিনাথ কর "পাখোয়াজ"-এ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এনায়েত খা সরোদের মাস্টার ছিলেন। নবাব খান (সাবহান, দেওয়ান মিনু মিঞা, ভাবান দাস বৈরাগী ও শ্যামদাস প্রমুখ দক্ষ সেতার বাদক ছিলেন। শ্যামদাস সরোদ বাজানোতে দক্ষ ছিলেন। (ঢাকা জেলা গেজেটিয়ার ১৯৯৩। পৃ. ১৪৭ )

জেমস টেলরের বিবরণে আছে, তাঁর সময়ে ঢাকার হিন্দুদের মধ্যে বেহালার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। ভায়োলিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ভায়োলিন তৈরির কারখানাও স্থাপিত হয় ঢাকায়। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভায়োলিন তৈরি হত। গোঁসাই ও বৈরাগিরাই এই বাদ্যযন্ত্র বেশি ব্যবহার করত। মুসলমানরা পছন্দ করত সেতার।

ধীরে ধীরে ঢাকা পরিণত হয়েছিল সংগীত নগরীতে। ধনী গৃহে সংগীতচর্চার রেওয়াজ ছিল। তাছাড়া যে কোনও আনন্দানুষ্ঠানে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাঈজি নাচ। ঢাকার ধনীরা এইসব বাঈজিদের নিয়ে আসতেন কলকাতা থেকে বা ভারতের অন্য কোথা থেকেও। এই বাঈজিদের কেউ কেউ ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন। ঢাকায় সংগীত ও নৃত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে বাঈজিদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সে সম্পর্কে বহু বিবরণও পাওয়া যায়। মোঘল আমল থেকেই ঢাকায় তাদের সমাদর বাড়ছিল। ঢাকায় পরবর্তীকালে বাঈজি নাচ-গানের সঙ্গে খেমটা নাচ-গানেরও ব্যাপক প্রসার ঘটে।

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice