পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িকতার ভূত ও বাঙালির সংস্কৃতি
'সাম্প্রদায়িক' শব্দটি যে সর্বদা খারাপ বা নিন্দনীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, তা অবশ্যই নয়। শব্দটির গঠনের দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায় যে, যা কিছু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সম্প্রদায় সম্পর্কীয়, তা সবই সাম্প্রদায়িক (সম্প্রদায়+ঞিক)। কাজেই ব্যুৎপত্তিগত অর্থে শব্দটি মোটেই নিন্দাৰ্থক নয়। যদি বলি: দুর্গা পূজা, ঈদ, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা—এগুলো সবই সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান, তাহলে কি ওগুলোকে নিন্দা করা হলো? হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—এইসব ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরা এই অনুষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের ধর্মের অনুশাসন রূপেই পালন করে থাকে। তাই এগুলো সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান। এতে নিন্দার কিছু নেই। কিন্তু অনুষ্ঠানগুলো যদি এ রকম হয়ে দাঁড়ায় যে হিন্দুরা দুর্গা পূজার পর বিসর্জন দেয়ার জন্য দুর্গা মূর্তি নিয়ে যাবে মুসলমানের মসজিদের সামনে দিয়ে ঢাক-ঢোল বাজাতে বাজাতে, কিংবা মুসলমান ঈদে গরু কোরবানি দেবে হিন্দু মন্দিরের সামনে, কিংবা খ্রীস্টান ও বৌদ্ধরাও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বড়দিন বা বুদ্ধপূর্ণিমা পালন করবে—তাহলে ঐসব অনুষ্ঠানগুলো নিন্দার্থেই হয়ে উঠবে সাম্প্রদায়িক।
অর্থাৎ বোঝা গেল: যে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ যদি তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত কোনো পার্বন অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বা তার অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে পালন করে তাহলে সেটি সাম্প্রদায়িক হয়েও নিন্দনীয় হয় না। কিন্তু এর বিপরীতটি করলেই—অর্থাৎ অন্য সম্প্রদায়কে আহত করলেই—এটি নিন্দনীয় হয়ে ওঠে, এবং সেখানে সাম্প্রদায়িক শব্দটিও নিন্দাসূচক অর্থই বহন করে। এ রকমই অন্য সব ক্ষেত্রেও। উনিশ শতকের বাংলায় রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মত মনীষীবৃন্দ 'হিন্দু' নামক একটি সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের আপন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে অনেক কুসংস্কার ও কদাচারের প্রাদুর্ভাব দেখে খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন।
তাই তাঁরা সেই সব কুসংস্কার ও কদাচার দূর করে আপন সম্প্রদায়ের সংস্কারসাধনে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁদের এই সংস্কার প্রয়াসে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণই ছিল লক্ষ্য, তাই এই সংস্কারের প্রকৃতিও অবশ্যই ছিল সাম্প্রদায়িক। কিন্তু তাই বলে রামমোহন বা বিদ্যাসাগরকে আমরা 'সাম্প্রদায়িক' বলে নিন্দা করতে পারি না নিশ্চয়ই। আপন সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তারা সাম্প্রদায়িক হয়ে যান নি। অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি যদি তাঁদের ঘৃণা থাকতো, কিংবা অন্য সম্প্রদায়ের অকল্যাণের বিনিময়ে আপন সম্প্রদায়ের কল্যাণ করতে চাইতেন, তাহলেই তাঁরা 'সাম্প্রদায়িক' বলে নিন্দিত হতেন। তেমনি নিন্দিত হতেন বেগম রোকেয়াও, যিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের নারীদের কল্যাণের জন্য তাঁর সকল কর্মপ্রয়াসকে নিয়োজিত করেছিলেন। বিশ শতকের বিশের দশকে যারা "মুসলিম সাহিত্য সমাজ' গঠন করেছিলেন, সেই আবুল হোসেন-কাজী আবদুল ওদুদ কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ মনীষীকে আমরা 'সাম্প্রদায়িক' বলে নিন্দা করতে পারতাম। কিন্তু তা আমরা করতে পারি না এ কারণে যে, তাঁরা আপন সম্প্রদায়ের প্রতি দরদী হয়েও অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন না।
কিন্তু দুঃখ এই: সবক্ষেত্রেই আমরা ঠিক একই রকম কথা বলতে পারছি না। উনিশ ও বিশ শতকের বাংলায় সম্প্রদায়-সংশ্লিষ্ট বা সম্প্রদায় সম্পৰ্কীয় অনেক কর্মকাণ্ডই যে স্বরূপত ‘সাম্প্রদায়িক' হয়ে উঠেছে—সে কথাও আমাদের স্বীকার করতেই হচ্ছে। যাকে আমরা উনিশ শতকের 'বঙ্গীয় রেনেসাঁস' বলি, সেটি যে অচিরেই রেনেসাঁসের সদর্থকতা পরিত্যাগ করে সংকীর্ণ হিন্দু রিভাইভ্যালিজমের পরিণতি পেয়েছিল – সে তো এক মর্মান্তিক সত্য। তারই প্রতিক্রিয়ায় এলো মুসলিম রিভাইভ্যালিজম। অর্থাৎ নবযুগের নাগরিক মধবিত্তের হাতে সৃষ্ট আধুনিক বঙ্গীয় সংস্কৃতি হয়ে উঠল একান্তই সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি। এখানে এই সাম্প্রদায়িক শব্দটিকে আর কোনোমতেই সদর্থক বলার সুযোগ রইল না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বদলে বিভাজনই যেখানে বড় হয়ে ওঠে, সেখানেই তো দেখা দেয় 'সাম্প্রদায়িকতা'। 'সাম্প্রদায়িক'—এই বিশেষণ শব্দটিকে প্রশংসার্থক না বললেও অন্তত নিরপেক্ষ বলা যায় অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু এই বিশেষণ শব্দটিতে ‘তা' লাগিয়ে বিশেষ্য 'সাম্প্রদায়িকতা করা হয় যখন, তখন তা পুরোপুরিই নিন্দার্থক হয়ে ওঠে। এই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments