রূপের ডালি খেলা

তখন আমরা ভাবতাম যে কারাভান্নায় রাস্তায় নিশ্চয় ঠুন-ঠুন ঘন্টি বাজিয়ে যায় ক্লান্ত ধূলি-ধূসর উট, ইতালিয়ানস্কায়া রাস্তায় থাকে কালো-চুল ইতালিয়ানরা, আর চুমকুড়ি সাঁকোতে সবাই চুমু খায়। পরে মিলিয়ে গেছে কারাভান আর ইতালিয়ানরা, রাস্তাগুলোর নাম পর্যন্ত এখন অন্য। অবিশ্যি চুমকুড়ি সাঁকোর নামটা এখনো তাই আছে।

আমাদের পাড়ার আঙিনাটা ছিল পাথরের খোয়ার বাঁধানো। খোয়া পড়েছিল সমানভাবে নয়, কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। জোর বৃষ্টি হলে নিচু জায়গাগুলো জলে ভরে যেত, উঁচুগুলো থাকত পাথুরে দ্বীপের মতো! জুতো যাতে না ভেজে তার জন্যে আমরা দ্বীপ থেকে দ্বীপে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতাম। তাহলেও বাড়ি পৌঁছতাম ভেজা পায়েই।

বসন্তে আঙিনাটা ভরে উঠত পপ্লারের ঝাঁঝালো রজনের গন্ধে, শরতে আপেল। আপেলের গন্ধটা আসত মাটির তলের কুঠরি থেকে, শব্জী জমা থাকত সেখানে। আঙিনাটা আমরা ভারি ভালোবাসতাম। কখনোই একঘেয়ে লাগত না। তাছাড়া অনেক খেলা জানতাম আমরা। খেলতাম লুকোচুরি, ডাংগুলি, বল ছোঁড়া-ছুঁড়ি, ভাঙা টেলিফোন। এসব খেলা আমরা পেয়েছিলাম একটু বড়ো ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে। কিন্তু আমাদের নিজেদের বানানো খেলাও ছিল। যেমন রূপের ডালি খেলা।

কার মাথা থেকে এটা বেরিয়েছিল জানি না, তবে আমাদের বেশ মনে ধরেছিল। পুরনো পপ্লার গাছের দলটা জুটলেই নির্ঘাৎ কেউ-না-কেউ বলে উঠত, ‘আয় রূপের ডালি খেলি!’

সবাই দাঁড়াতাম গোল হয়ে, ছড়া বলে পর পর গুণে যেতাম কে মাঝখানে দাঁড়াবে, ‘ এনা, বেনা, রেস...’

কোন এক দুর্বোধ্য ভাষার এই কথাগুলো ছিল আমাদের ঠোঁটস্থ: ‘কুইন্তের, কন্তের, জেস!’

কেন জানি আমরা সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিন্কাকে মাঝখানে দাঁড় করাতে ভালোবাসতাম, চেষ্টা করতাম যাতে ছড়াটা গিয়ে ঠিক ওর কাছেই শেষ হয়। চোখ নামিয়ে সে তার ফ্রকে হাত বুলাত। আগে থেকেই তার জানা থাকত যে তাকেই মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে রূপসী হয়ে।

এখন আমরা বুঝি যে সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিন্কা ছিল অসাধারণ অসুন্দর: চওড়া খাঁদা নাক ছিল তার, মোটা মোটা ঠোঁট, তার চারিপাশে আর কপালে রুটির গুঁড়োর মতো ছুলি। বিবর্ণ চোখ। সোজা সোজা অঘন চুল। হাঁটত পা ঘষে ঘষে, পেটটা সামনে এগিয়ে দিয়ে। কিন্তু এসব তখন আমাদের চোখে পড়ত না। যে ন্যায়পর অজ্ঞতায় আমরা তখন ছিলাম তাতে ভালো মানুষকে ধরা হত সুন্দর, খারাপকে অসুন্দর। আর সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিন্কা ছিল গুণী মেয়ে, তাকেই আমরা সুন্দরী করতাম।

মাঝখানে গিয়ে ও দাঁড়ালেই খেলার নিয়ম অনুসারে আমাদের ‘মুগ্ধ হতে’ হত—প্রত্যেক্যেই আমরা প্রশংসা করতাম বইয়ে-পড়া কোনো-না-কোনো কথা দিয়ে।

কেউ বলত, ‘ কী সুন্দর গলা, রাজহাঁসের মতো।’

‘রাজহাঁসের মতো নয়, মরাল গ্রীবা,’ সংশোধন করে দিয়ে আরেকজন খেই টানত, ‘কী সুন্দর প্রবালের মতো ঠোঁট...’

‘কী সুন্দর সোনালি চাঁচর।’

‘চোখ ওর ইয়ে... ইয়ে...’

‘কেবলি তুই ভুলে যাস! সাগরের মতো নীল।’

জ্বল-জ্বল করে উঠত নিন্কা। ফ্যাকাশে মুখে গাঢ় লাল ছোপ। পেটটা গুটিয়ে নিয়ে সে লীলাময়ীর মতো একটা পা এগিয়ে দিত। আমাদের কথাগুলো হয়ে উঠত আয়না, নিনকা তাতে নিজেকে দেখত সত্যিকারের রূপসী।

‘কী সুন্দর চিকন গা।’

‘কী সুন্দর বাঁকা ভুরু।’

‘ওর দাঁত... দাঁত...’

‘জানি না? মুক্কোর মতো দাঁত!’

আমাদেরও মনে হতে থাকত সবকিছুই ওর মরাল, প্রবাল, মুক্তোর মতো। আমাদের নিনকার চেয়ে রূপসী আর কেউ নেই।

তারপর আমাদের উচ্ছ্বাসের ঝুলি ফুরিয়ে গেলে নিনকা কিছু একটা গল্প শোনাত। হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাসে গা কুঁকড়ে সে বলত: ‘কাল আমি ভাই চান করছিলাম গরম সাগরে। বেশ রাত হতেই অন্ধকারে জ্বল-জ্বল করে উঠল সাগর। আমিও জ্বল-জ্বল করে উঠলাম। আমি ছিলাম একটা মাছ হয়ে...না, মাছ নয়, মৎস্য-কন্যা।’

রূপসীর কি কখনো বলা সাজে যে সে আলুর খোসা ছাড়িয়েছে, অথবা পড়া মুখস্থ করেছে, কিংবা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice