বন্ধুর সহমর্মী হত
লেখক: মোহাম্মদ সেলিম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ভারত
আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকাকে সহযোগিতামূলক বলার উপায় নেই। বার্মা ও শ্রলঙ্কা ছিল পাকিস্তানের মিত্র। নেপালের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিম-উত্তর পূর্ব দিকে সীমান্তসংলঘ্ন ভারতের পক্ষে কোনো প্রকার ধোয়াটে অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল না। বলা যায় ভূ-রাজনৈতিক এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ ও সুনির্দিষ্ট।
প্রবাসী সরকার গঠনে সহায়তা
৩ এপ্রিল ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের আলোচনার আগেই ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় বক্তৃতায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ভারত সরকারের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যে আশা সঞ্চার করে। যুদ্ধ পরিচালনা এবং সহানুভূতি ও সমর্থনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজন সরকার গঠনও জরুরি হয়ে পড়ে।
১৭ এপ্রিল বিএসএফের সক্রিয় সহযোগিতায় কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় নবীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে আমিরুল ইসলাম লিখেছেন, 'বিএসএফের চট্টোপাধ্যায়কে (শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায়) বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌছানো হবে।' ভারতীয় সীমান্তে এক কন্টিনজেন্ট বিএসএফকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয় সম্ভাব্য পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে ফায়ার কভার দেওয়ার জন্য।
ভারতের পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত বাঙালি কুটনীতিকদের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণার ক্ষেত্রে ভারতের সম্পৃক্ততা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৮ এপ্রিল ডেপুটি হাইকমিশন ভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব নতুন প্রতিষ্ঠিত মিশনের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় এই সরকার ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা লাভ করে। ভারতের আশ্রয় ও সাহায্যের ওপর এই সরকারের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভরশীল ছিল। এই সরকারের ওপর আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ভারতের কার্যকর সহায়তা অব্যাহত ছিল।
প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রের সংস্থান করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মার্চ-এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার দায়িত্ব বিএসএফের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ৩০ এপ্রিল তাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করা হয়। প্রায় দুই হাজার তরুণের সামরিক প্রশিক্ষণ মে মাসের শেষ দিকে শুরু হয়। এর মধ্যে বাছাই করা যুবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হতো; যেমন লক্ষ্ণৌতে গোলন্দাজ প্রশিক্ষণের জন্য, দেরাদুনে সিগন্যাল, আসাম ও নাগাল্যান্ডে কমান্ডো ট্রেনিং, নৌ ও বিমান সৈনিকদের জন্যও প্রশিক্ষণের পৃথক ব্যবস্থা ছিল।
মুক্তবাহিনীকে সংগঠিত করার পাশাপাশি এপ্রিল-মে মাসের দিকে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ক্রমবর্ধমান শরণার্থীর কারণে বাংলাদেশ সংকটের সামরিক সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করে ভারত সরকার। ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস লে. জেনারেল কে কে সিংকে সামরিক পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব ছিল যৌথভাবে বাংলাদেশ বাহিনীর হেডকোয়ার্টার্স এবং ভারতীয় ইষ্টার্ন কমান্ডের।
বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে গমনে ইচ্ছুকদের জন্য 'যুব শিবির' এবং 'অভ্যর্থনা শিবির' স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও প্রত্যেক যুব শিবিরে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন ভারতীয় সেনা অফিসার 'ক্যাম্প প্রশাসক' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে মেজর জেনারেল উবানের তত্ত্বাবধানে উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে এবং আসামের হামলংয়ে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিশেষভাবে নির্বাচিত আনুমানিক ৪০০ জন যুবককে 'সফিস্টিকেটেড টেকনিকস অব ওয়াটারবর্ন অ্যান্ড আন্ডার-ওয়াটার স্যাবোটাজ'-এর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
শরণার্থীদের সহায়তা
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম আঘাত এসেছিল হিন্দুদের ওপর, যা পরে ধর্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ থাকেনি। জুন মাস পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments