বাউল গান ও লালন ফকির
লেখক: অন্তরা চৌধুরী
সাধক শিল্পী ও সুরস্রষ্টাগণ ভাবতীয় সঙ্গীতকে উদার ভাবধারায় মণ্ডিত করে গেছেন—তাকে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাই তাঁদের অবদান দেশ কাল পাত্রের সীমা অতিক্রম করে চিন্তাশীল শিল্পীদের অন্তরে প্রেরণা এনেছে। মনীষী রমা রল্যা বলেছেন, 'Music and Poesy would go side by side, dreaming and their dreams mingling.' বাংলাদেশে সঙ্গীতের একটি মহান আদর্শ ছিল, সে আদর্শ হল কাব্যভাব ও সুরভাবের পূর্ব সমন্বয়। অনুশীলনেব ফলে এবং বাংলার গীতিকার ও সুরকারগণের নব নব অবদানে সঙ্গীতের মধ্যে অনেককিছু মৌলিকত্ব এসেছিল এবং বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে সেগুলি স্বীকৃতিও পেয়েছিল। বাউলসঙ্গীত এই অভিযান-পর্বেরই এক উর্বর ফসল।
চৈতন্য সমসাময়িককালে বাস্তবজীবনে উদাসীন, বাইরের দিক থেকে অসম্বদ্ধ—এমন এক ঈশ্বরভক্ত সম্প্রদায় সমাজে বাউল নামে পরিচিত হয়েছিল। মহাপ্রভু চৈতন্যচরিতামৃতে ঈশ্বরভক্ত অর্থে বাউল শব্দ একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। বাইরের দিকে আচার-আচরণ, ধর্ম-কর্মাদি অসঙ্গতিপূর্ণ ও রহস্যময় হলেও অন্তরে অন্তরে যাঁরা যথার্থ ঈশ্বর-ভাবরসে মাতাল হয়ে থাকতেন, তাঁরাই বাইরের লোকের নিকট বাতুল অর্থাৎ বাউল বলে অভিহিত হতেন। পরবর্তীকালে, বিশেষতঃ সহজিয়া পদেও এইরূপ বিশিষ্ট ধরনের সাধককে বোঝাতে বাউল শব্দ ব্যবহৃত হত। লৌকিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলার সহজিয়াদের চারটি থাক: আউল, বাউল, দরবেশ এবং সাঁই। এই ধরনের বিভাজন পরস্পরাঙ্গী। প্রখ্যাত বাউল লালন শাহ্ তাঁর গানে 'সাঁই লালন', 'দরবেশ লালন', 'ফকিরলালন', 'অধীন লালন' বা শুধু 'লালন' ভণিতা দিয়েছেন। নিজের গুরুকে 'দরবেশ সিরাজ সাঁই' বলেছেন। কোথাও তিনি নিজেকে বাউল বলেননি। তাহলে কি বুঝতে হবে লালন ও তাঁর গুরু সিরাজ একই সঙ্গে 'দরবেশ' আর 'সাঁই'? বাউল নন? আউল, বাউল, দরবেশ ও সাঁই পৃথক পৃথক শ্রেণী নয়। এগুলি লৌকিক অভিধা মাত্র। সনাতন গোস্বামীকে 'দরবেশ', রূপ গোস্বামীকে 'বাউল', শ্রীচৈতন্যকে 'বাউল', 'মহা বাউল' বলা হয়েছে। লৌকিক বিভাজনের এই গোলমেলে পথ পরিহার করে এদের একটি সাধাবণ অভিধা দিতে পারা যায় সেটি 'সহজিযা'। দার্শনিক বিচারে এরা মরমিয়াও (mystics)। 'বাউল' শব্দটির ব্যুৎপত্তি সন্ধানেও নানা বৈচিত্র্য এসেছে। বাউল শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্র, কাল, সীমাবদ্ধতা এবং বাউল-সাধনার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী 'বাউল একটি বিশেষ সাধনমার্গ এবং অর্থযুক্ত শব্দ। 'বাজুল' বজ্রগুরু। সম্প্রদায়বাচক নয়। সমরূপ শব্দ (homonym) 'বাউল'-এর দুটি পৃথক উৎস—আরবী 'বাউল' এবং সংস্কৃত 'বাতুল'। বাউলকে নিয়ে যিনি সাধেন তিনি 'বাউলিয়া'। মরমকে নিয়ে সাধলে 'মরমী', 'মরমিয়া'।
বাউল সম্প্রদায়ে জাতের ভেদ না থাকলেও সহজিয়া পন্থী হিন্দু বাউল এবং সূফী পন্থী মুসলমান ফকির বাউল (আউলিয়া)—এইরূপ দুটি সাধনপ্রণালী লক্ষ করা যায়। বাংলার বাউলদের যথার্থ আত্মীয়তার যোগ বৈষ্ণব সহজিয়াদের সঙ্গে। বৌদ্ধ সহজিয়াদের সঙ্গে এঁদের প্রত্যক্ষতঃ কোন যোগ নেই।
সহজিয়া বৈষ্ণব ও বাউলদের তত্ত্বকথা দাদু, কবীর, নানক, রুইদাস, রজ্জব ইত্যাদি উত্তরাপথের মধ্যযুগীয় সাধকদের দোঁহা ও গীতাবলীতে পাওয়া যায়। এই জাতীয় সন্ত সাধনা ও বাউল সাধনার মূল কথা—মানুষের দেহের মধ্যে যে পরম সত্য বা সত্তা রয়েছে, তাকে উপলব্ধি করতে হবে। ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,
'মনের মানুষকে অন্তরের মণিকোঠায় খুঁজিয়া বাহির করা ও তাঁহার সঙ্গে অন্তরঙ্গ মিলনরসে তন্ময় হইয়া যাওয়াই বাউল-সাধনার একমাত্র লক্ষ্য।'
বাউলেরা শাস্ত্র-আচার-বিগ্রহ মানেন না; চেতনার গভীরতলশায়ী প্রাণশক্তিকেই তাঁরা মর্মে মর্মে সাধনা করেন। তাই তাঁদের একমাত্র সাধ্য 'মনের মানুষ'। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলেছেন,
'In the conception of the 'Man of the heart' of the Bauls, we find a happy mixture of the conception of the Paramatman of the Upanisads, the Sahaja of the Sahajiyas, and suffistic conception of the Beloved.'
বাউলদের নৃত্যগীতেব সঙ্গে সূফীদের 'সমা' (দরবেশের নৃত্যগীত) তুলনীয় আবার বাউলের গুরুশিষ্যের সম্পর্কের মত সূফীরাও মুর্শিদ-মুরিদের (গুরু-শিষ্য) সম্পর্কে বিশ্বাসী। তাই সূফী বাউল গেয়েছেন,
'উনুর ঝুনুর বাজে নাও নিহাইল্যা বাতাসে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments