জন্মদিনের উৎসব
আমরা তখন শহুরে লোক হয়ে গিয়েছিলাম। ত্রিনিদাদের লোকসংখ্যা পুরোপুরি পাঁচ হাজার হলেও দাবি করা হতো দশ হাজার বলে। ওখানে একটা গ্রেড স্কুল বাড়ি ছিল আর নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপরের গাছগুলোর মধ্যে দিয়ে একটা হাইস্কুল বাড়ি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। হাইস্কুল আর ধনদৌলত মনে হতো একই সঙ্গে চলে। সে যাই হোক, আমরা যারা রেল লাইনের ওধারে থাকতাম, তারা জানতাম আমরা কখনোই হাইস্কুলে যাবার কথা কল্পনাও করতে পারবো না।
গ্রেড স্কুলের বাড়িটা শহরের অপর পাশে ছিল, পুরনো ঐতিহাসিক সানটা ফে ট্রেল (Santa Fe Trail) যেটা দিয়ে প্রথমে ইন্ডিয়ানরা, পরে প্রাচীন স্প্যানিয়ার্ডরা, আরও পরে মহান দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের যাত্রী শ্বেত প্রবর্তকরা পর্যটন করেছিল, ঠিকই তারই দিকে মুখ করে দাঁড়ানো এক পাহাড়ের ওপর। বাইরের দিকে প্রসারিত এক চূড়ো, যার ওপরে পশ্চিমের প্রাচীনতম প্রবর্তকদের অন্যতম শায়িত আছে তারই পায়ের কাছ দিয়ে রাস্তাটা ঘুরে গিয়েছিল। স্কুলটা ছিল আমার দেখা প্রথম গ্রেড স্কুল। প্রতিদিন আমি আমার ছোটভাই জর্জের হাত ধরে ওখানে নিয়ে যেতাম, আমবা জানতাম যে আমরা পূণ্যভূমির ওপর দিয়ে চলেছি, কেন না আমার মা ওটার সম্বন্ধে সব সময় সেই কথাই বলতো। শিক্ষিকারা ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর মনে হতো যেন তাদের মসৃণভাবে ইস্ত্রি করা হয়েছে; তারা মাপসই সব পোশাক আর সাদা ব্লাউজ পরতো, আর এমন ভাষায় কথা বলতো যা আমি প্রথম প্রথম প্রায় বুঝতেই পারতাম না। আমার মা তাদের মধ্যে একজনকে প্রথমদিনই খুলেই বলেছিল যে আমার বয়স প্রায় দশ বছর আর আমি আমার আগের স্কুলে ‘তৃতীয় পাঠ’ পর্যন্ত পড়েছি। শিক্ষিকাটি অনেকক্ষণ ধরে আমার মার দিকে তাকিয়েছিল, তার দৃষ্টি ঘোরাফেরা করছিল মার সুতির পোশাক, মার হাতগুলো, যেগুলো এত শিরা বার করা আর কর্ম জর্জরিত যে প্রায় কালো হয়ে গেছে আর তারপর, নীলাভ-কৃষ্ণবর্ণ চোখ দুটির দ্বারা উদ্ভাসিত তার বিষণ্ণ মুখের উপর। চোখ দুটি তরুণ—হাতগুলো পঞ্চাশ বছর বয়স্কা কোনো বাসনমাজা ঝিয়ের হতে পারতো। কিন্তু “হ্যাঁ”, শিক্ষিকাটি শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করেছিল, “আমি বুঝতে পেরেছি।”
সে ছিল এক মমতাময়ী অল্পবয়সী শিক্ষিকা। আমি যখন তার সামনে কাঁপা কাঁপা গলায় পড়ছিলাম তখন সে আমার আগ্রহ আর সুসজ্জিত ছেলেমেয়ে ভর্তি ঘরের কথা ভুলে যাবার চেষ্টা দেখে উৎসাহ দিয়ে হেসেছিল। তারপর আমাকে সে বোর্ডের কাছে পাঠিয়ে সংখ্যাগুলো লিখতে বলেছিল। নিচের গ্রেডে পাঠিয়ে দেবার ভয় আমাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ আমি একেবারে ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। সংখ্যাগুলো সব সময় আমার শত্রু ছিল। আমি যেমন তেমন করে নম্বরগুলো লিখতে লাগলাম… এক ধরনের সহজাত বুদ্ধি আমাকে সাহায্য করলো—আমি জানতাম সে মনে করবে আমি শুধু ভুল করছি মাত্র। আর হলোও তাই।
“এমন ভুল তুমি করছো কি করে!” সে প্রতিবাদ করছিল। আমি শূন্যভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম উত্তর দিইনি। সে খড়িটা নিয়ে সহজ অঙ্কটা কষে দিলো। তার হাতটা আমি এমন একাগ্রতার সঙ্গে লক্ষ্য করছিলাম যে এখনও পর্যন্ত, প্রায় বিশ বছর পরেও যে সংখ্যাগুলো সে লিখেছিল আর তার অনামিকায় একটা সোনার আংটি সমেত তার লম্বাটে ফর্সা হাতটা স্পষ্ট দেখতে পাই।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে সে এই পদ্ধতি চালিয়ে গেলো। সে যা বলতো আর লিখতো, তা আমি মুখস্থ করে নিতাম, কিন্তু কখনো বুঝতে পারিনি। আমার চোখের সামনে ধরা এক সারি সংখ্যা ছিল আর এখনও তাই রয়ে গেছে, আমার সামনে দাঁড়ানো একসার সৈন্যের মতো ওপরওয়ালার কাছ থেকে “গুলি করো!” হুকুম পেলেই গুলি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে।
ঐ স্কুলে আমার খুব লজ্জা লাগতো আর নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। ধারের দিকের সারির প্রথম আসনে বসতো ছোট্ট একটি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments