রক্তপ্রজন্ম
লেখক: আসফ-উজ-জামান
মুক্তি, আমি পালিয়েছি। দেশের জন্যে আমি সংগ্রাম করিনি। আমি ভীরু, স্বার্থপর। আমি চরিত্রহীন। তাই তো তোমাদেরও ফেলে রেখে চলে আসতে পারলাম। অথচ তুমি যখন মাতৃগর্ভে তখন তোমার ভবিষ্যৎ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে কত পরিকল্পনাই না আমার ছিল। তোমার মায়ের সঙ্গে আমিও স্বপ্ন দেখেছি কী করে তোমার আগামী জীবনকে কুসুমাস্তীর্ণ করব আমি।
আয়োজনের অভাব ছিল না। তুমি যখন চোখ মেলে পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেছিলে তখন যদি তোমার বোঝবার ক্ষমতা থাকত তা’হলে দেখতে আধ ডজন নার্স তোমাদের ঘিরে রেখেছে সর্বদা। তোমাদের সামান্যতম সুবিধাটুকু সর্বসত্তা দিয়ে মুছে দিতে তারা অনুক্ষণ প্রস্তুত। ভেবো না, সেইসব নার্সরা তোমাদের ভালবেসেছিল, আসলে তার খুশী করতে চেয়েছিল আমাকে। পরবর্তীকালে তাদের চাহিদাকে অক্ষুন্ন রাখার ব্যবসায়ী পদ্ধতিতে তাদের নৈপুণ্য ছিল সন্দেহাতীত। আর আমি কি এসব করেছিলাম তোমাদের ভালবেসে? আমার স্ট্যান্ডার্ড উজ্জ্বল রাখবার আত্মপ্রচারক অহমিকা সেখানে কি সক্রিয় ছিল না? জানি না। আমি একজন বুদ্ধিজীবী। তার মানে প্রজ্ঞাধান কোন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি নই। বুদ্ধির সাহায্যে যতটুকু সুখ নিজের জন্যে ছিনিয়ে নেয়া যায় সবই ছিল আমার করতলে। একটি প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংস্থার অধ্যক্ষ ছিলাম আমি, অর্থাৎ আরও কয়েকটি বুদ্ধিজীবীর প্রভুর আসনে ছিলাম সমাসীন।
মুক্তি, এখন মুষলধারে নেমেছে বৃষ্টি। তোমাকে গোপনে জানাই আমার আবৃত দুষ্কৃতির কথা। আমি অনেক অবিচার করেছি আমার সহকর্মীদের ওপর স্তরে স্তরে উপরে উঠতে গিয়ে, সম্ভাব্য সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে বিধ্বস্ত করেছি আমি। নিশ্চিহ্ন করেছি সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে। তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছি, অথচ কোথাও কেউ হত্যার অভিযোগে বিচার চায় নি আমার। আমার প্রতি পর্বত-প্রমাণ ঘৃণা নিয়েও আমার অধীন কর্মীরা আমার জন্য সেলাম সংরক্ষিত রেখেছে। কফির পেয়ালায় ঠোঁট ডুবিয়ে আমার চাইতে দুর্মুখ বন্ধুটিও আমার সবচাইতে ওঁচা মার্কা গ্রন্থটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। অবশ্য বিরুদ্ধাচরণ যে ছিল তা নয়। আমার দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে যাচ্ছিল কোন এক প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায়। সে কথা কেমন করে জানতে পেরে আমার ম্যানেজার দেখা করেন পত্রিকা সম্পাদকের সঙ্গে। অমনি সম্পাদক বিগলিত হয়ে ত্রুটি স্বীকার করলেন, ব্যর্থ হ’ল নিন্দুক সত্যবাদীটির সমস্ত উদ্যোগ। জনসাধারণের কাছে আমার ‘ইমেজ’ অক্ষুণ্ণ রাখতে সেদিন আমার ম্যানেজার মারফত কি করতে হয়েছিল, সে কথা না-ই বা শুনলে!
মুক্তি, আমরা তোমার ঘর সাজিয়েছিলাম। তোমার খেলার ঘর, পড়ার ঘর, শোওয়ার ঘর। সে সব মূল্যবান আসবাব, বিদেশ থেকে বিশেষ আয়াসে সংগৃহীত দুর্মূল্য পুতুল ও খেলনাগুলো সম্পর্কে ভবিষ্যতে তুমি কিছুই জানতে পারবে না। সেগুলো এখন লুট করেছে লুটেরা। রূপকথার সে ঘরগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে হানাদার। খেলবার জন্যে একটি মাটির খেলনাও তুমি পাবে না এরপর। মুক্তি, এখন অবিশ্রান্ত শ্রাবণ। চারিদিকে অন্ধকার ছিদ্রহীন, বাইরে কাঁদছে গ্রামের আকাশ। খবরের কাগজের বিছানায় বিনা বালিশে আমি শুয়ে আছি। ছাদের পচা বিচুলি চোয়ানো পানিতে ভরে গেছে মেঝে। তা ছাড়া জেগে আছে অবর্ণনীয় মশার দল। বাংলাদেশে যে এরা কখনও ছিল সে কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার সুসজ্জিত বাংলোয় তাদের—যে প্রবেশের কোন পথই ছিল না। তথাপি এই দুঃসহ রাতে আমার কষ্ট হচ্ছে না। বরং বুক ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে সত্যের মিছিল। একুশে ফেব্রুয়ারীতে ঢাকায় যা প্রথম বেরিয়েছিল; তারপর কতবার জানালার খড়খড়ি তুলে ফুটপাতে তাদের আমি দেখেছি। এবং তৎক্ষণাৎ জানালা বন্ধ করে তাদের নিপাত-মন্ত্র উচ্চারণ করেছি। হ্যাঁ, সেইসব বিগত মিছিলের পথভ্রষ্ট এক অনির্বাণ কণ্ঠ এইমাত্র আমাকে শুনিয়ে গেল তিক্ত সত্য। আমি দেশদ্রোহী, দেশকে আমি কখনও ভালবাসি নি, এমন কি আমার শিশুকন্যা মুক্তি তোমাকেও আমি ভালবাসিনি কোনদিন।
এ কথায় চরম আঘাত পেলাম আমি। আমি যদি আমার কন্যাকে না ভালবাসি তবে কার জন্যে করেছি এত সঞ্চয়!
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments