বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও মিত্রদের অবদান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র নয় মাস। নয় মাসের এই যুদ্ধে বাঙালি জাতিকে চরমতম ত্যাগ, দুঃখ, দুর্দশা ও নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এই নয় মাসে বাংলাদেশে যে গণহত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন হয়েছে স্মরণকালের ইতিহাসে তার নজির নেই। এর পাশাপাশি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকেও স্বীকার করতে হয়েছে চরম পরাজয়। পর্যাপ্ত রসদ ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের, জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছে বাঙালি।

'৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাস স্থায়ী এই মুক্তিযুদ্ধে এত দ্রুত বিজয় অর্জন কখনও সম্ভব ছিল না—যদি না ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমাদের পাশে থাকত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ছিল পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এবং ভারতের পাশে ছিল নেপাল ও ভূটানের মতো প্রতিবেশীরা। এই কটি দেশ ছাড়া আমেরিকা, চীন ও পশ্চিম ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সরকার পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পক্ষে অথবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নির্লিপ্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম পর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশে একটানা সফর করে সে সব দেশকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নমনীয় করার ক্ষেত্রে অসাধারণ কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মেয়াদ নয় মাসের হলেও বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সূচনা ঘটেছে '৪৮-এর ভাষা আন্দোলন থেকে। '৪৮-এ সূচিত ভাষা আন্দোলন এবং '৫৪-র নির্বাচনে পাকিস্তান অর্জনকারী মুসলিম লীগের ভরাডুবির ভেতর ধ্বনিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট এই কৃত্রিম রাষ্ট্রের মৃত্যুঘণ্টা। '৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারে না। ষাটের দশকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে নিয়ে গোপনে গঠন করেছিলেন 'ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট' এবং প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্বাধীনতার। তাঁর ছয় দফা এমনভাবে প্রণীত হয়েছিল যাতে বাঙালিত্বের বোধ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের ভেতর জাগ্রত করা যায়।

বাংলাদেশকে যাঁরা স্বাধীন করতে চেয়েছেন তাঁরা জানতেন ভারতের সহযোগিতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। পাকিস্তানের শাসকরাও এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল। যে কারণে '৪৮-'৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে '৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম ও জনগণের অভ্যুত্থানকে তারা পাকিস্তানকে দুর্বল করা এবং ভাঙার ভারতীয় ষড়যন্ত্র এবং কমিউনিস্টদের চক্রান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে আরম্ভ করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের নায়করা এবং '৭১-এর মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই ছিলেন তাদের কাছে 'ভারতের চর।'

যে ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টারা এবং স্বাধীনতার প্রধান শত্রু পাকিস্তানী শাসকরা অভিন্ন দৃষ্টি পোষণ করেছেন, যে ভারত '৭১-এ বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিবাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা প্রদান করেছে সেই ভারত সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণেতারা এবং গণমাধ্যমসমূহ দেশবাসীকে বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মকে এক রকম অন্ধকারেই রেখেছেন।

কয়েক বছর আগে আমাদের টেলিভিশনে ধাঁধার অনুষ্ঠানে এক বালককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল একাত্তর সালে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন দেশের যুদ্ধ হয়েছিল? বালক জবাব দিয়েছে—'একাত্তর সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ হয়েছে।' বারো বছরের এই বালকের উত্তরে বিস্মিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। পঁচাত্তরের পর থেকে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে অতি সামান্যই জানানো হয়েছে। বেতার টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় এভাবে—একাত্তরে আমরা এক কল্পিত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলাম। এ লড়াইয়ে এক কল্পিত মিত্র বাহিনী আমাদের সহযোগিতা করেছিল। কখনও এটা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice