সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং ভাষা
স্বাধীনতা এসেছে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। এ বিপ্লব রাজনৈতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক। এই বিপ্লবটি যেন একটি তিন অংকের নাটক, যার মধ্যাংকে রয়েছি আমরা এই মুহূর্তে।
এ বিপ্লবের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের উপকরণ বিস্ফোরকের মতো মিশ্রিত রয়েছে। তাছাড়া এই উপকরণগুলি আনুপাতিকভাবে সুষম করে সাজানো নেই। জীবনের প্রবাহে উপকরণসমূহের সুষম সজ্জা আসে নাটকের মতোই তৃতীয় অংক। আমাদের অবস্থাটাও অনেকটা সেরকম। তবে স্বাধীনতার পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অবস্থান ও গতিধারা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতা রাজনৈতিক মুক্তির পথের বাধাগুলিকে অপসারিত করার সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিকাশও সমৃদ্ধির বাধাগুলিকে অনেকাংশে অপসারিত করে দেওয়ার ফলে সংস্কৃতি আমাদের জীবনে কল্লোলিত হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের রাজনীতিকে অর্থপূর্ণ এবং আমাদের অর্থনীতিকে ফলপ্রসু করার কর্মকাণ্ডে এই কল্লোলিত সংস্কৃতি একটা পরিচলিকা শক্তিরূপে কাজ করবে।
’৫২ সালের রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারী বাংলাভাষা আন্দোলন সূচনা করেছিল রাজনৈতিক বিপ্লবের তাগিদের। সূচনা হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও তাগিদের। এই বিপ্লবের মতেই এসেছিল সামাজিক অর্থনৈতিক বিপ্লবেরও তাগিদ। ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত এই ত্রিবিধ তাগিদের মধ্যে কখনও কোন একটা তাগিদ প্রবলতর হয়েছিল, কখনো বা কোন আরেকটা প্রবলতর হয়েছিল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাগিদ বিশেষ করে মাতৃভাষার ব্যাপকতম উপকরণকে ভিত্তিকরে বরাবরই প্রবল ছিল। তবে আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো ছিল উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের জিঞ্জীরে আবদ্ধ। আমাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাগিদ তাই কখনও কখনও অবদমিত ছিল।
উপনিবেশিক কাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রকাশ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তাগিদকে পরিপূর্ণ মুক্তির দিকে এগিয়ে দিয়েছে। যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আমাদের অন্যতম লক্ষ হিসাবে নির্ণীত সমাজতন্ত্রে সম্ভাব্য, তা একে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে। সুতরাং স্বাধীনতার পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লব তিন দিক দিয়েই উৎসাহিত হচ্ছে বলা যেতে পারে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিপ্লবের কাছ থেকে উপকরণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি নিজেও বৈপ্লবিক উপকরণ তৈরী করে নিতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন পৌঁচেছে।
এই পটভূমিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব একটা সামগ্রিক বিন্যাস পেতে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক প্রয়াস স্বাধীনতার আগে বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরে উদ্বেলিত হচিছল পৃথক পৃথক খাতে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও তাই আলাদা আলাদা খাতে আলাদা আলাদাভাবে বয়ে চলেছিল। মুক্তি সংগ্রামী দেশবাসীর বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণী উপনিবেশিক শৃঙখলা ছিন্নকরার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকার সময় মুক্তির ছবি ও সুরকে সংস্কৃতির নিজ নিজ খাতে অভিব্যক্ত করার ব্যবস্থা করেছিল। বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মেহনতীর। সঙ্গীত, চিত্রকলা প্রভৃতির বিপুখী উপকরণকে নিজ নিজ ধারা অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়েছিল। তবে মিলন সেতুও ছিল। মিলন-সেতু ছিল স্বাধীনতার চিন্তা, ছাত্রসমাজ এবং মাতৃভাষা বাংলা। এরা ধরে রেখেছিল বলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব তার একটা সামগ্রিক তাগিদ রেখেছিল রাজনৈতিক এবং সামাজিক অর্থনৈতিক মুক্তির তাগিদে।
স্বাধীনতার পরে সামগ্রিক বিন্যাসের তাগিদ আসার দরুণ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটা কাজ পৃথক পৃথক সংস্কৃতির খাতগুলিকে একটি ধারায় পরিণত করা এবং সারা দেশের সমগ্র মুক্তিকামী জনগণকে সমাজতন্ত্রমুখী করে নেয়া।
সমাজতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি প্রযুক্তি ও প্রকল্প সম্পন্ন কর্মকাণ্ড যার বিকাশের তাগিদে শ্রমিক শ্রেণীর সমস্ত স্তর একত্রিত হবে এবং শ্রমিক শ্রেণী ভারসাম্য ঠিক রেখে কাজ করতে পারলে কৃষক এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত ও বিভিন্ন ধরনের মেহনতী মানুষ এবং ছাত্র সমাজ শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিপ্লবে শরিক হবে।
এক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র ও সংস্কৃতির প্রাণবন্ত সম্পর্কটিকে সঠিকভাবে বুঝতে পারার উপরেই অবশ্য নির্ভর করছে, সংস্কৃতির উপকরণকে এবং সাংস্কৃতিক সাধনাকে সামান্য মাত্রও অপচয় না করে আমরা সাবালীলভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারবো কি পারবো না।
এখানে ভাষার প্রশ্নটিকেই যাচাই করে দেখা যাক। ভাষা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সবচেয়ে বড় মাধ্যম এবং উপকরণ। সাজ সজ্জা, ছবি এবং সুর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments