পূর্ব পাকিস্তানে ‘পরিচয়’ নিষিদ্ধ

পূর্ব পাকিস্তানে ‘পরিচয়’-এর প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান আদেশক্রমে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫৯ সংখ্যা ও তৎপরবর্তী কোনো সংখ্যা ‘পরিচয়’ পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবে না।

কেন এই আদেশ, আমরা জানি না। প্রকাশ ‘পরিচয়’-এ নাকি ‘আপত্তিকর সংবাদাদি’ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কথাটা কি মূলত ঠিক?

‘পরিচয়’-এর পাঠকেরা জানেন, কী ধরনের লেখা ‘পরিচয়’ সাধারণত প্রকাশ করে এসেছে। বাঙলা ভাষায় যে সাহিত্য আমাদের আছে, তাকে অগ্রসর করাই ছিল ‘পরিচয়’-এর প্রধান কাজ। প্রগতিশীল সংস্কৃতির উজ্জীবনই ‘পরিচয়’-এর প্রধান লক্ষ্য।

এই লক্ষ্যসাধনে অন্যান্য অবশ্য প্রয়োজনীয় কর্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে ‘পরিচয়’ যে বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করেছে তা আবার মনে করিয়ে দেই। সে-ভূমিকাটি হল শান্তির জন্য সংগ্রামের ভূমিকা ; বিশ্বশান্তি তথা পাক-ভারত মৈত্রী ও সাম্প্রদায়িক শান্তির জন্য দ্বিধাহীন সংগ্রামের ভূমিকা।

মাঝে মাঝে বন্যা এসেছে, অশুভ প্রচারে আকাশবাতাস নিনাদিত হয়ে উঠেছে, পথরোধ করেছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং উন্মত্ততার প্রেতমূর্তি। সেইসব মূহুর্তে, এদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ‘পরিচয়’-এর ঘোষণাও কোনো ভয়কে মান্য করেনি, কোনো অন্ধসংস্কারের কাছে যুক্তিকে বিকিয়ে দেয়নি। মানুষের মহত্ত্বের আদর্শ, সাম্প্রদায়িক শান্তির পবিত্র আদর্শের জন্য অকপটে দাঁড়িয়েছে ‘পরিচয়’।

সেই সুদূর ১৩৫২-৫৩ সাল থেকে ‘পরিচয়’ হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রাধারমণ মিত্র প্রভৃতি বিশিষ্ট লেখকদের তথ্যসম্মত লেখা প্রকাশ করে সংগ্রাম করেছে বাঙলার ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক বিকৃতিসাধনের বিরুদ্ধে। ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদের কূটচালে যখন শুরু হল কলকাতা এবং অন্যত্র এক বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, তখন ‘পরিচয়’-এর সম্পাদকীয় মন্তব্য ‘ইতরতার অভিযান’ থেকে বাঙলার সংস্কৃতির সমস্ত ঐতিহ্যের দোহাই পেড়ে ডাক দেওয়া হয়েছিল প্রতিরোধের। আস্থা ঘোষিত হয়েছিল সেদিনকার বাস্তব অসাম্প্রদায়িক মূল শক্তি শ্রমিক-কৃষকের ওপর। দাঙ্গাকে ধিক্কার দিয়ে ‘শাদা ঘোড়া’, ‘আদাব’-এর মতো গল্পও প্রথম প্রকাশ পায় ‘পরিচয়’-এ।

একমাত্র ‘পরিচয়’-ই সম্ভবত এমন একটি সাহিত্য-পত্রিকা, যেখানে সেইদিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হিন্দু, মুসলিম মৈত্রীর বাণী, সাম্প্রদায়িক শান্তি ও পাক-ভারত বন্ধুতার বাণী নির্ভয়ে উচ্চারিত হয়ে এসেছে, যেখানে বাংলা ভাষার সংস্কৃতিতে পষ্ট করার জন্য হিন্দু-মুসলিম, পাকিস্তান ও ভারতের লেখকেরা সমান মর্যাদায় অংশ নিয়ে এসেছেন।

এই ‘পরিচয়’-কে ‘আপত্তিকর’ বলতে হলে আসলে আপত্তিকর ঘোষণা করতে হয় সাম্প্রদায়িক শান্তির আদর্শকেই, বিশ্বশান্তি ও পাক-ভারত মৈত্রীর বাণীকে, প্রগতিশীল-সংস্কৃতির ভব্যিষতকেই।

আমরা জানি, কোনো দেশের মানুষই এই মহত্তম আদর্শগুলিকে আপত্তিকর বলে ভাবতে পারেন না। যে আদেশ তা ভাবাতে চায় আপত্তিকর হল সেই আদেশটাই।

ইতিমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের অনেক পাঠক ও লেখকের কাছ থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। নিষেধাজ্ঞার সংবাদে তাঁরা ব্যথিত ও বিচলিত হয়েছেন। বাঙলা ভাষার জন্য যাঁদের ভালোবাসা এবং রক্তদান ইতিহাসে লেখা থাকবে, এ চিঠি তাঁদের। এ চিঠিগুলি আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ, এ চিঠিগুলি আমাদের কাছে ভবিষ্যতের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।

বিশেষ করে সেইজন্য তাঁদের কাছে আমাদের আবেদন—আপনারা যাঁরা বাঙলা ভাষাকে ভালোবাসেন, অবাধ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নীতিকে যারা শ্রদ্ধা করেন, তাঁরা এগিয়ে আসুন এই আপত্তিকর আদেশের প্রতিবাদ করুন। ‘পরিচয়’-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিশ্চিত করুন।

পূর্ব পাকিস্তানে ‘পরিচয়’-এর এ সংখ্যা হয়তো পৌঁছবে না, কিন্তু জানি যে শান্তির এ আবেদনকে আটক রাখার মতো বেড়া কোথাও নেই।


সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সম্পাদকীয়,পরিচয়

কার্তিক ১৩৫৯

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice