সমাজ কিরূপে পুঁজিতন্ত্রে বিকশিত হইল
সোভিয়েট ইউনিয়নে শ্রেণীর অস্তিত্ব লোপ পাইয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে শোষণেরও অবসান হইয়াছে। শ্রেণীই যদি না থাকে, তবে শোষণ করিবে কে কাহাকে? শ্রেণীর মূলোচ্ছেদ করাই ছিল ১৯১৭’র নবেম্বর বিপ্লবের লক্ষ্য। ১৯৩৩’এ, দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার সময়ে এই কাজটি সুসম্পূর্ণ হয়। যদিও শ্রেণীহীন সমাজই শ্রমিকের লক্ষ্য তথাপি সংগ্রাম করিয়াই তাহা অর্জন করিতে হইবে। যে-সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম চালাইতে হইবে, প্রথমত শ্রমিকের পক্ষে উহার আসল রূপটি জানিয়া লওয়া অত্যাবশ্যক।
পুঁজিতন্ত্র শ্রেণীর ভিত্তির উপর স্থাপিত। শ্রেণী পুঁজিতন্ত্রের পূর্ববর্ত্তী সমাজ-ব্যবস্থায়ও ছিল। অবশ্য আদিমযুগে শ্রেণী বলিয়া কোন কিছু ছিল না। পুঁজিতন্ত্রের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পুঁজিতন্ত্র পূর্বেও ছিল, পরেও থাকিবে। কিন্তু পূর্ববর্তী সমাজ-ব্যবস্থাগুলিকে অস্বীকার করা যখন অসুবিধা হইয়া পড়ে তখন তাঁহারা বলেন, এই সব মানুষের গড়া, স্বাভাবিক নয়। পুঁজিতন্ত্রই একমাত্র স্বাভাবিক সমাজ-ব্যবস্থা। মার্ক্স প্রুঁধকে জবাব দিয়াছিলেন, ‘খৃষ্টীয় ধর্ম-যাজকেরাও মনে করিত, খৃষ্ট ধর্মই একমাত্র স্বাভাবিক ধর্ম; আর সব ধর্ম মানুষের মন গড়া’।
আদিমযুগে শ্রেণী ছিল না; কত লক্ষ লক্ষ বছর মানুষ শ্রেণীহীন সমাজের মধ্যে কাটাইয়াছে তাহা বলা কঠিন। আজ ইহা প্রমাণিত হইয়া গিয়াছে যে জীবজন্তুর জগৎ হইতেই মানুষের উৎপত্তি। কিন্তু মানুষ কখনো একা থাকে নাই। প্রথম হইতেই সে দলবদ্ধ হইয়া বাস করিয়াছে। অবশ্য দলগুলি ছিল ছোট ছোট। প্রশ্ন হইতে পারে, মানুষের এই দলবদ্ধতার কারণ কি? দলবদ্ধ হইয়া বাস করার মূলে ছিল অস্তিত্বের সংগ্রাম। তখন প্রকৃতি ছিল প্রতিকূল; প্রকৃতিকে বশে আনার কোন উপায় মানুষের জানা ছিল না। হাতে তাহার হাতিয়ার ছিল পাথরের এরূপ অবস্থায় মানুষের পক্ষে একক থাকা অসম্ভব ছিল। তাই দলবদ্ধ হইয়া বাস করা ছাড়া উপায় ছিল না। গোষ্ঠীর লোকেরা এক সঙ্গে কাজ করিত, আহার যাহা জুটিত সকলে মিলিয়া ভাগ করিয়া খাইত। আহার সংগ্রহ করিতে তাহাদের কঠোর পরিশ্রম করিতে হইত। সামাজিক বিকাশের এত নিম্নস্তরে অসমতা অথবা বৈষম্যের সৃষ্টি হইতে পারে নাই।
এরূপ যৌথ জীবনে সকলেরই কাজ নির্দ্দিষ্ট থাকিত। স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে শ্রমের বিভাগ ছিল। পুরুষেরা শিকার করিত, মেয়েরা ঘরের কাজ করিত। আদিম যৌথ জীবনে সমাজের এক অংশ অপর অংশের শ্রমের ফল ভোগ করিবে অথবা উহাকে শোষণ করিবে তাহা কখনো সম্ভব হইত না। হাতিয়ার ছিল অত্যন্ত সরল: সকলেই অনায়াসে তাহা সংগ্রহ করিতে পারিত। অতএব উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ ছিল না। আদিম সমাজে শ্রেণী ছিল না, ব্যক্তিগত বিত্ত ছিল না, রাষ্ট্রও ছিল না। সমাজ যখন দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া পড়ে, এবং সমাজের সকল সম্পত্তি কতিপয় লোকের হস্তগত হয়—তখনই দেখা দিয়াছে রাষ্ট্র। আদিম সমাজে চলতি রীতি নীতি দ্বারাই শৃঙ্খলা রক্ষিত হইত। বয়োবৃদ্ধ এবং নারীর যথেষ্ট সম্মান ছিল; সামাজিক ব্যাপারে তাহাদের কর্তৃত্বও ছিল অসীম। লেনিন বলেন, সমাজে রাষ্ট্রের উৎপত্তি শ্রেণীর উৎপত্তির সমসাময়িক। সমাজের এক অংশ যাহাতে অন্য অংশকে শোষণ করিতে পারে সে জন্যই রাষ্ট্রের সৃষ্টি; শাসক শ্রেণীর হাতে রাষ্ট্র একটি বিশেষ প্রকারের যন্ত্র।
আমরা স্পষ্টই দেখিলাম, সমাজে শ্রেণীর অস্তিত্ব প্রথম হইতেই ছিল না; বহুকাল মানুষের সমাজে শ্রেণীর কোন চিহ্নই ছিল না। কিন্তু আদিম সমাজ একেবারে অনড়, নিশ্চল ছিল এরূপ মনে করা ভুল। সে-সমাজে পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তুখুব ধীরে ধীরে। হাতিয়ারগুলি ক্রমে ক্রমে উন্নত হইয়াছে। আগুনের আবিষ্কার হয় এবং উহার উপযোগিতা জানা যায়। এখন হইতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পশু, চামড়া, মাংস, লোম ইত্যাদির বিনিময় হইতে লাগিল।
এদিকে লোক সংখ্যা বাড়িয়া যাওয়ায় নূতন নূতন উৎপাদন আবশ্যক হইয়া পড়ে। গাছ-গাছড়ার চাষ পূর্বে আরম্ভ হইয়াছিল। কৃষিকার্য্যও কিছুটা শুরু হইল। কতক লোক জমিকেই আঁকড়াইয়া থাকে; জমির সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা হইতেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তি গড়িয়া
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments