-
সম্প্রতি সোভিয়েট রাশিয়া ভ্রমণ উপলক্ষে সেখানকার সাহিত্যিকমণ্ডলীর সঙ্গে পরিচয় লাভের সুযোগ পেয়েছিলাম। এর আরেকটি কারণ এই যে, সোভিয়েট রাশিয়ায় আমরা ছিলাম মস্কো লেখক সংঘের অতিথি ৷
মস্কো, লেনিনগ্রাদ, তিব্লিসি, তাসখণ্ড সর্বত্র লেখক, কবি, নাট্যকার সংঘ আমাদের অভ্যর্থনা করেছেন। কেবল ভাবের আদানপ্রদান নয়, ভারতের প্রাচীন ও আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে আদানপ্রদানের জন্যে তাঁদের আগ্রহ দেখেছি। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রেণীসংঘর্ষ বর্জিত যে নুতন সভ্যতা গড়ে উঠছে, এই সমস্ত লেখক তাকে লালন করবার ভার নিয়েছেন। অনেকের সঙ্গে আলাপ করে এদের মনের প্রসারতা দেখে মুগ্ধ হলাম। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এঁরা দেশবিদেশের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বমানবের কল্পনার কুহকমুক্ত জ্ঞানের সাধনাকে গ্রহণ করেছেন। এঁরা অনেকেই জানেন যে, ভারতের প্রাচীন
-
আমার বিশ্বাস, প্রাণকান্ত ভুল করিতেছে।
গণেশ পপুলার লোক। জনপ্রিয় হইতে হইলে যে সকল গুণাবলী থাকা নিতান্তই প্রয়োজন গণেশের সে সকল আছে। সংক্ষেপে, সে মিথ্যাবাদী, মিষ্টভাষী এবং প্রয়োজনীয়। অনর্গল মিথ্যাভাষণ সত্ত্বেও তাহার মিষ্টবচনে আমরা বিগলিত হইয়া যাই এবং নিজেদের প্রয়োজনের খাতিরে তাহাকে ত্যাগ করিতে পারি না। গণেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিলে প্রাণকান্তের পরাজয় অনিবার্য।
জনপ্রিয় বলিয়া গণেশ যে অজাতশত্রু এমন কথা বলিতেছি না। জনপ্রিয় বলিয়াই তাহার শত্রু আছে। কিন্তু এই সকল শত্রু এখনও পরোক্ষচারী। প্রকাশ্যত গণেশের বিরুদ্ধাচরণ করিবার মতো শক্তিসংগ্রহ এখনও তাহারা করিতে পারে নাই। মনে মনে তাহারা গণেশ-চরিত্রের ছোট বড় নানা দোষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে এবং সুযোগসুবিধামতো সেগুলিতে নানা রঙ ফলাইয়া
-
শিশুকে এত ভাল লাগে কেন?
আমার নবাগত দৌহিত্রটি সম্প্রতি আমার মনে এই চিন্তাটি উদ্রিক্ত করিয়াছে। পাঁচ বৎসরের শিশু, কিন্তু তাহাকে লইয়াই সমস্ত দিন মাতিয়া আছি, অন্য কিছু করিবার আর অবসর নাই। কখনও তাহাকে কাগজের নৌকা বানাইয়া দিতেছি, কখনও জাহাজ, কখনও দোয়াত, কখনও ঘুড়ি। শুধু তাই নয়, তাহাকে আমার গৃহিণীর কল্পিত প্রণয়ী ধরিয়া লইয়া তাহার সহিত নানারূপ ছদ্মকলহে প্রবৃত্ত হইয়াছি। বালকটি শিষ্ট নহে, শান্ত তো নহেই।
ইতিমধ্যেই সে আমার হুঁকা উল্টাইয়াছে, কলিকা ভাঙিয়াছে, চশমার খাপটি বারংবার খুলিয়া চশমাটি অধিকার করিতে চাহিতেছে। ধূলিধূসরিত দেহ লইয়া ক্রমাগত আমার ঘাড়ে পিঠে পড়িতেছে। বালাপোশখানার দফা রফা হইয়া গেল।
তথাপি কিছুতেই তাহার উপর চটিতে পারিতেছি না।
-
সেকেলে লম্বা থার্ড ক্লাস কামরা, প্রচুর জায়গা। ভিড় একেবারে নেই। কামরার একধারে বসিয়া আছেন প্রকাশবাবু, প্রকাশবাবুর স্ত্রী সুলোচনা এবং তাঁহাদের কন্যা উমা। উমার বয়স ষোলো কি ছাব্বিশ তাহা তাহার মুখ দেখিয়া বা চেহারা দেখিয়া নির্ণয় করা সম্ভব নয়। রোগা ছিপছিপে চেহারা। চোখের কোণে কালি পড়িয়াছে। গালের হাড় দুটি বেশি উঁচু। তবু মোটের উপর দেখিতে মন্দ নয়। দেখিতে আরও হয়তো ভালো হইত যদি মুখে আর একটু সজীবতার ছাপ থাকিত। মুখের ভাবটি বড়ই ম্রিয়মাণ। প্রকাশবাবু বেঁটে বলিষ্ঠগঠন ব্যক্তি। কালো রং। গোঁফ দাড়ি কামানো। মুখটি চতুষ্কোণ। চক্ষু দুইটি বড় বড় এবং রক্তাভ। মুখভাব উপর্যুপরি সাত-গোল-খাওয়া-ফুটবল-টিমের ক্যাপ্টেনের মতো মরিয়া। সাতটি কন্যার পিতা তিনি। উমা
-
ট্রেন আসিয়াছিল। কয়েকটি সুবেশা, সুতন্বী, সুরূপা যুবতী স্টেশনে আসিয়াছিলেন। তাঁহাদেরই আশেপাশে কয়েকজন বাঙালি ছোকরাও, কেহ অন্যমনস্কভাবে, কেহ বা জ্ঞাতসারে, ঘোরাফেরা করিতেছিল। ভিড়ের মধ্যে এক বৃদ্ধা যে একজনের হোল্ড-অলের স্ট্যাপে পা আটকাইয়া পড়িয়া গেলেন, তাহা কেহ লক্ষ্য করিল না। করিবার কথাও নয়, বিদেশাগত শিভ্যালিল্প জিনিসটা যুবতীদের কেন্দ্র করিয়াই বিকশিত হয়। সকলে অবশ্য যুবতীদিগকে লইয়া প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে ব্যস্ত ছিল না। যাঁহার হোল্ড-অলের স্ট্র্যাপে পা আটকাইয়া বুড়ি পড়িয়া গেলেন, তিনি শিক্ষিত ভদ্রলোক, কাছেই ছিলেন। তিনি বুড়িকে স-ধমক উপদেশ দিলেন একটা।
“পথ দেখে চলতে পার না? আর-একটু হলে আমার স্ট্র্যাপটা ছিঁড়ে যেত যে!”
বুড়ির ডান পা-টা বেশ মচকাইয়া গিয়াছিল। তবু তিনি খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া
-
সেদিন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি নামল সন্ধ্যার আগেই। দুপুর থেকে গুমোট হয়েছিল, বিকেল বেলা মেঘ এল আকাশ ছেয়ে। অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক। কড় কড় করে বাজ পড়ল কোথায় যেন। তাড়াতাড়ি বাড়ির সদর দরজাটা বন্ধ করে দিল শঙ্করী। তারপর ঘরের জানালাগুলোও।
একটা জানালা বন্ধ করা গেল না। ছিটকিনি ছিল না। বার বার খুলে যেতে লাগল সেটা। জলের ছাঁট ঢুকতে লাগল ঘরের ভিতর। জানালার নীচেই দড়ির খাট ছিল একখানা, তার উপর বিছানা ছিল। সেইটে টেনে সরিয়ে নিয়ে এল শঙ্করী। তারপর জানালাটা ঢেকে দিলে একটা মোটা কম্বল দিয়ে। তবু জল আসতে লাগল, কপাট দুটো দড়াম দড়াম শব্দও করতে লাগল। শঙ্করী ভ্রূকুঞ্চিত করে চেয়ে রইল সেদিকে
-
শালা হারামিকা বাচ্চা...
একটু চটলেই এই তার বুলি, কখনও স্বগত কখনও প্রকাশ্যত। ছোট নিষ্ঠুর চোখ দুটো, মুখময় ছোট বড় কতকগুলো আঁচিল, একটা ছোট আবও আছে ডান দিকের চোয়ালটার নীচে। ভ্রূ নেই বললেই হয়। দাড়ি আছে। কটা, কোঁকড়ানো, অবিন্যস্ত। হঠাৎ দেখলে মনে হয় একটা ওলের উপর কটা চুল গজিয়েছে, কতকগুলো। তাকে কেউ বোঝে না, সে-ও কাউকে বুঝতে চায় না। তাই উদীয়মান কমিউনিস্ট লেখক কমরেড দুলাল দত্ত যখন গল্প লেখার রসদ সংগ্রহ করবার উদ্দেশ্যে তার বাড়ি গিয়ে জিন্না-গান্ধী-সম্পর্কিত আলোচনা করে মুসলমানের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং পাকিস্তান যে কতদূর ন্যায়সঙ্গত তা বিচার করে তার প্রকৃত-মনোভাব জানবার চেষ্টা করছিল তখন যদিও সে তার হলদে শ্বা-দন্ত
-
একেই বলে বিড়ম্বনা।
আমি একজন ডেলি প্যাসেঞ্জার। সেদিন সমস্ত দিন আপিসে কলম পিষে ঊর্ধ্বশ্বাসে হাওড়ায় এসে লোকাল ট্রেনের একখানি থার্ড ক্লাসে বসে হাঁপাচ্ছি—এমন সময় দেখি সামনের প্লাটফর্ম থেকে বোম্বে মেল ছাড়ছে আর তারই একটি কামরায় এমন একখানি মুখ আমার চোখে পড়ে গেল যাতে আমার সমস্ত বুক আশা আনন্দে দুলে উঠল।
ভয়ে ভয়ে রুদ্ধনিশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলাম—‘এতদিন কোথায় ছিলি? আমাকে চিনতে পারিস?
বহুদিন আগে আমার এক ছেলে তারকেশ্বরে মেলা দেখতে গিয়ে ভিড়ে কোথায় হারিয়ে যায়—আর ফেরেনি। অনেক খোঁজ-খবর করেছিলাম, কিছুতেই কিছু হয়নি। ভগবানের ইচ্ছা বলে মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ তারই মুখখানি—হ্যাঁ, ঠিক সেই মুখটিই বোম্বে মেলের একটা কামরায় দেখতে পেলাম।
আর
-
সুবিখ্যাত ফরাসী গ্রন্থকার আনাতোল ফ্রাঁস তাঁহার 'পেঙ্গুইন আইল্যান্ড' নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে দেখাইয়াছেন, কি করিয়া পেঙ্গুইন পাখিরা মানুষে রূপান্তরিত হইল এবং নানা বিবর্তনের ভিতর দিয়া শেষ পর্যন্ত তাহাদের কি পরিণতি ঘটিল। পাখিকে মানুষে পরিণত করিবার জন্য কোনও দুরূহ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাহায্য লইতে হয় নাই। ভগবানের ইচ্ছা হইল—পাখিরা মানুষ হোক, অমনই তাহারা মানুষ হইয়া গেল।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে বঙ্গদেশেও অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে। আনাতোল ফ্রাঁস বোধ হয় খবরটি টের পান নাই, পাইলে তাহা নিশ্চয় উক্ত পুস্তকের একটি অধ্যায় বৃদ্ধি করিত।
প্রাচীন আর্যগণ বাংলা দেশের তদানীন্তন অধিবাসীদের পক্ষীজাতি বলিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। সুধী-সমাজে এ কথা সুবিদিত। যে কথাটি সুবিদিত নয়, তাহাই আমি বর্ণনা করিতেছি।
পিতামহ ব্রহ্মা
-
"এই দেখ ইন্দুর ডায়েরি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি পড়ে দেখ দিকি, কিছু মানে বার করতে পার কিনা।"
বলিষ্ঠকায় ভুজঙ্গধর মরক্কো-চামড়া দিয়া বাঁধানো সুদৃশ্য খাতাখানি আমার দিকে আগাইয়া দিল।
"ঊনত্রিশে তারিখে যেটা লিখেছে সেইটে পড়! আরও পাতা উলটে যাও—হ্যাঁ, ওইখান থেকে পড়।"
পড়িতে লাগিলাম। ভুজঙ্গধর ভ্রু-কুঞ্চিত করিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ভুজঙ্গাধর আমার বাল্যবন্ধু এবং ইন্দুমতীর স্বামী।
ইন্দুমতী লিখিয়াছেন, "কাল রাত্রে যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটেছে তা এতই অসম্ভব যে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি কাউকে বলিওনি, এমন কি মাণিককেও না। মাণিককে বলতে খুবই লোভ হচ্ছে, কিন্তু ভয় হচ্ছে পাছে সে আমাকে ভীতু বলে ঠাট্টা করে। তার
-
হঠাৎ মাখন সিং এসে হাজির হল অনেক দিন পরে। শিকারী মাখন সিং। কাঁধে বন্দুক, হাতে একজোড়া মরা পিটেল। পিটেল অতি সুস্বাদু বুনোহাঁস। মাখন অনেক বুনোহাঁস খাইয়েছে আমাকে। প্রায়ই হাঁস মেরে আনত। হরিণের মাংস, বুনো শুয়োরের মাংস, সজারুর মাংস, ফ্লরিকানের মাংস ওর দৌলতেই খেয়েছি। আমার ঘরে বাঘের যে চামড়াটা দেওয়ালে টাঙানো আছে সেটাও মাখনের দেওয়া। খুব বড় শিকারী ও। পরণে খাকি হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট। কাইজারি গোঁফ। মাথার চুল কদম ছাঁট।
অনেক দিন পরে এল আজ।
"কি মাখনলাল, এস এস। এতদিন কোথায় ছিলে?"
"নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই। ভাবলাম অনেকদিন দাদার সঙ্গে দেখা হয় নি, দেখা করে আসি। আজ ভাগ্য ভালো দুটো
-
দীপ-শিখা নিষ্কল্পভাবে জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল, যেন অধীরভাবে কার প্রতীক্ষা করছে। আর আকুল আগ্রহই যেন অচঞ্চল করেছিল তাকে। একটু পরেই ধীরে ধীরে সে কাঁপতে লাগল। এসেছে, হাওয়া এসেছে। কাঁপুনি বেড়ে গেল তার। মনে হতে লাগল, হাওয়ার বাহুপাশে আত্মহারা হয়ে পড়েছে সে বুঝি।
দীপ-শিখা। ছেড়ে দাও, ও কি করছ?
হাওয়া। আমাকে ছেড়ে কি থাকতে পারবে তুমি? বিজ্ঞানীরা কি বলেছেন জানো?
দীপ-শিখা। কি?
হাওয়া। আমার মধ্যে না কি অক্সিজেন-নামে একরকম গ্যাস আছে। সেই গ্যাসই নাকি মূর্ত করেছে তোমাকে শিখা-রূপে। আমি না থাকলে, তুমিও থাকতে না।
দীপ-শিখা। ইস্—। কি করছ তুমি—
হাওয়ার বেগ বাড়ল। দীপ-শিখা কাঁপতে লাগল অসহায়ভাবে।
ঘরের আর এক কোণে।
"ছিঃ, কি
ক্যাটাগরি
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.