-
বেলা ব’য়ে যায়,
গোধূলির মেঘ-সীমানায়
ধূম্রমৌন সাঁঝে
নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে,
শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে;
পান্থ ম্লান চিতার কবলে
একে-একে ডুবে যায় দেশ জাতি সংসার সমাজ;
কার লাগি, হে সমাধি, তুমি একা ব’সে আছো আজ—
কি এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!
অতীতের শোভাযাত্রা কোথায় কখন
চকিতে মিলায়ে গেছে পাও নাই টের;
কোন্ দিবা অবসানে গৌরবের লক্ষ মুসাফের
দেউটি নিভায়ে গেছে—চ’লে গেছে দেউল ত্যজিয়া,
চ’লে গেছে প্রিয়তম—চ’লে গেছে প্রিয়া
যুগান্তের মণিময় গেহবাস ছাড়ি
চকিতে চলিয়া গেছে বাসনা-পসারী
কবে কোন বেলাশেষে হায়
দূর অস্তশেখরের গায়।
তোমারে যায়নি তা’রা শেষ অভিনন্দনের অর্ঘ্য সমর্পিয়া;
সাঁঝের নীহারনীল সমুদ্র মথিয়া
মরমে পশেনি তব তাহাদের বিদায়ের
-
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’লাে আজ রাত্রেতার মুখে খবর পেলুম:সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকারজন্মমাত্র সুতীব্র চীৎকারে।খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাতউত্তোলিত, উদ্ভাসিতকী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।সে ভাষা বােঝে না কেউকেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষাপেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগেরপরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুরঅস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান:জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠেচ’লে যেতে হবে আমাদের।চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণপ্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমিনবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।অবশেষে সব কাজ সেরেআমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকেক’রে যাবাে আশীর্বাদ,তারপর হব ইতিহাস॥
ছাড়পত্র
-
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজআমি তাে জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজমাটিতে লালিত, ভীরু শুধু আজ আকাশের ডাকেমেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।যদিও নগণ্য আমি তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজেতবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গােপনে মর্মরধ্বনি বাজে।বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলাের আনাগােনাশিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনাআজ শুধু অঙ্কুরিত; জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতাউদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা।তারপর দৃপ্ত শাখা মেলে দেবাে সবার সম্মুখেফোটাবাে বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে।সংহত কঠিন ঝড়ে, দৃঢ় প্রাণ প্রত্যেক শিকড়শাখায় শাখায় বাধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়,অঙ্কুরিত বন্ধু যতাে মাথা তুলে আমারই আহ্বানেজানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।আগামী বসন্তে জেনাে মিশে যাবাে
-
এখনাে আমার মনে তােমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,এখনাে তােমার গানে সহসা উদ্বেল হ’য়ে উঠি—নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ কুটি।এখনাে প্রাণের স্তরে স্তরে,তােমার দানের মাটি সােনার ফসল তুলে ধরেএখনাে স্বগত ভাবাবেগেমনের গভীর অন্ধকারে তােমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।তবুও ক্ষুধিত দিন ক্রমশ সাম্রাজ্য গড়ে তােলে,গােপনে লাঞ্ছিত হই হানাদারী মৃত্যুর কবলে;যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তােমার সৃষ্টিকেএখনাে প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।তবুও নিশ্চিত উপবাসআমার মনের প্রান্তে নিয়ত ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস—আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,আমার বিনিদ্র রাত্রে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,আমার রােমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতেআমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।তাই আজ
-
ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি:পাশে এক বিরাট প্রাসাদপ্রতিদিন চোখে পড়ে;সে প্রাসাদ কী দুঃসহ স্পধায় প্রত্যহআকাশকে বন্ধুত্ব জানায়;আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি।চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি—এ অট্টালিকার প্রতি ইটের হৃদয়েঅনেক কাহিনী আছে। অত্যন্ত গোপনেঘামের, রক্তের আর চোখের জলের।তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারেসেলাম জানায় লােকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে।আমি তাই এ প্রাসাদে এতােকাল ঐশ্বর্য দেখেছি,দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা।হঠাৎ সেদিনচকিত বিস্ময়ে দেখিঅত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্ণিশের ধারেতাশ্বত্থ গাছের চারা!অমনি পৃথিবীআমার চোখের আর মনের পর্দায়আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিলো একটি পলকে।ছােট ছােট চারাগাছ—রসহীন খাদ্যহীন কার্ণিশের ধারেবলিষ্ঠ শিশুর মতাে বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছ্বাসে।
হঠাৎ চকিতে,এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ
-
খবর আসে।দিকদিগন্ত থেকে বিদ্যুৎবাহিনী খবর;যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ঝড়——এখানে সাংবাদিকতার নৈশ নৈঃশব্দ্য।রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝংকৃত ছন্দে—প্রকাশের ব্যগ্রতায়;তােমাদের জীবনে যখন নিদ্রাভিভূত মধ্যরাত্রিচোখে স্বপ্ন আর ঘরে অন্ধকার।অতল অদৃশ্য কথার সমুদ্র থেকে নিঃশব্দে শব্দেরা উঠে আসেঅভ্যস্ত হাতে খবর সাজাইভাষা থেকে ভাষান্তর করতে কখনাে চমকে উঠি,দেখি যুগ থেকে যুগান্তর।কখনাে হাত কেঁপে ওঠে খবর দিতে;বাইশে শ্রাবণ, বাইশে জুনে।তােমাদের ঘুমের অন্ধকার পথ বেয়েখবর-পরীরা এখানে আসে তােমাদের আগে,তাদের পেয়ে কখনাে কণ্ঠে নামে ব্যথা, কখনাে বা আসে গানসকালে দিনের আলোয় যখন তােমাদের কাছে তারা পৌছয়তখন আমাদের চোখে তাদের ডানা ঝরে গেছে।তােমরা খবর পাও,শুধু খবর রাখাে না কারাে বিনিদ্র চোখ আর উৎকর্ণ কানের।ঐ কম্পােজিটর কি চমকে ওঠে নিখুঁত
-
কালাে মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায়ভীত মন খোজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখতাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্ত্যলােককেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায়।অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণেতীব্র ভ্রুকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে;অভিশাপময় যে সব আত্মা আজো অধীরতাদেয় সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবিরনিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে।চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে সব দিনেতাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,হীন স্পধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে—ছিনিয়ে আমায় নিতে পারাে আজো সুযােগ পেলেতাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখিনি ঋণে।অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রােদনেনরম সােফায় বিপ্লবী মন উদ্বোধনে;আজকে কিন্তু জনতা জোয়ারে দোলে প্লাবননিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনুধাবনকরেছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশােধনে।অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু
-
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহস্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহবিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই নেই ভয়পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়—আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্যবাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্যসঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্করতাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখরএ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বারপথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভারক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসেঅবিশ্রান্ত; একে একে হয়
-
আমি তো বলতে গেলে দাঁতনখের চাষ ছেড়ে সাজলুম প্লাইকাঠের নেতা
ছদ্মবেশ ধরলে দেখি আসল চেহারাখানা বেরিয়ে পড়ে রে
স্ববিরোধিতা ছাড়া কি আর অন্য কোনো মৌলিক কাজ আছে? বল!
আমি তো বলতে গেলে জরাজীর্ণ আকাশজুড়ে ঢিল্ লা-চিল
বুড়োভান করার ভান করি আর তা জীবন নামে চালাই
সাঁতারু-খেলানো জলে নৌকার ছইয়ে জীবন পেতেছি
আমি তো বলতে গেলে পাষাণ-রিদয় পাথর ভেঙে দেখি
বালি-ঝুরঝুর চাইনি মেলে কাছিম খেকো বেতো রুগির দল
জলে-ডোবা পাঙাশ মেয়ের ঠোঁটে ডানাউড়া হাসি খুঁজছে
আমি তো বলতে গেলে ঘৃতাহুতির ভ্যাজাল ধোঁয়ায় কেঁদে
সত্য বানাই মৃত্যু বানাই হুর্ধ-অধ গোলচক্কর বানাই
সাপটা ছিল নিজের গর্তে হাত ঢুকিয়ে তাকেও তো ভুল বোঝাই
-
মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।
পাহাড়, সাগর, নদী প্রান্তর জুড়ে—
আমরা জেগেছি, নবচেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে জ্বলি,
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।
কায়েমি স্বার্থবাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,
জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।
গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথে কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা—
আমরা ভেঙেছি, জয় বাংলার যত বিজয়ের বাধা।
কায়েমি স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো—
সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে—
চিরবিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।
আনো দেখি সাত কোটি এই দাবির মৃত্যু তুমি,
চিরবিজয়ের
-
তোমার অশরীরি উপস্থিতি কি ভয়ঙ্কর!
না, ভয়ের কিছু নেই, আমি ভূত-প্রেতের কথা বলছি না।
বলছি, তোমার শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে
অশরীরী উপস্থিতি আমাকে নিয়ত উদ্বিগ্ন করে।
যখন ছিলে, ভাবনা বলতে ছিল শুধু—তুমি আছো।
আর আজ যখন নেই, অষ্টপ্রহর ভাবনা—তুমি নেই, অথচ ছিলে।
-
অবশ্যম্ভাবী বিপন্নতায় থমকে দাঁড়িয়ে
আবার এগোয় উদ্বায়ী স্বপ্নবৎ মন।
দু’পাতা মুখস্থ বিদ্যের বিপ্লবের ঘোর কাটে
অনাহূত আকস্মিকতায়।
রৌদ্রজ্জ্বল দিন শেষে
বিকেলের শেষ আলোটুকুর সাথে
চুইয়ে পড়ে বিবর্ণ জীবনের সমস্ত রঙ।
এরপর আলোহীন অন্ধকারে
রঙিন জীবনের বৈভবে মুখ লুকিয়ে
হাঁতড়ে ফিরি
ফেলে আসা অনাগত
অতীত বিপ্লবের হাড্ডিসার ফসিল।
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- আবুল হাসনাত (১)
- কাইফি আজমি (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (৫)
- জীবনানন্দ দাস (১০)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১)
- বিষ্ণু দে (১)
- মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- মলয় রায়চৌধুরী (১)
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- মেহেরুন নেসা (১)
- যতীন সরকার (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (২)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- শামসুর রাহমান (১)
- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সুকান্ত ভট্টাচার্য (৯)
- সুনির্মল বসু (৩)
- হরবোলা (১০)
- হাফেজ শিরাজি (১)
- হাসান মুরশিদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.