-
অনাদিকাল জ্বলে থাকা অরূন্ধুতির আলো
নিভে যায় অনুল্লেখ আঁধারী আলোর টানে।
অতিকায় অভিমানের ভারে ভারাক্রান্ত মানুষটিকেও
পেরোতে হয় এক অনতিক্রম্য পথ।
মানুষ জানে, মানুষের হৃদয়ে মানুষের নিঃস্বার্থ ঠাঁই নেই।
মিথোজীবি মন কখনো কখনো পরাশ্রয়মুক্ত জীবনের খোঁজে
হাঁতড়ে বেড়ায় আলোকিত আঁধার।
তবুও চাতক অপেক্ষায় অনুনমিত সহসাই
এবেলা-ওবেলার মত ফুরিয়ে যায় যাপিত জীবন।
-
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়
তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল
জোনাকিতে ভ’রে গেছে; যে-মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ–কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;
আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,
খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:
পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে-মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক;
আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত
এড়ায়ে
-
ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি:পাশে এক বিরাট প্রাসাদপ্রতিদিন চোখে পড়ে;সে প্রাসাদ কী দুঃসহ স্পধায় প্রত্যহআকাশকে বন্ধুত্ব জানায়;আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি।চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি—এ অট্টালিকার প্রতি ইটের হৃদয়েঅনেক কাহিনী আছে। অত্যন্ত গোপনেঘামের, রক্তের আর চোখের জলের।তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারেসেলাম জানায় লােকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে।আমি তাই এ প্রাসাদে এতােকাল ঐশ্বর্য দেখেছি,দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা।হঠাৎ সেদিনচকিত বিস্ময়ে দেখিঅত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্ণিশের ধারেতাশ্বত্থ গাছের চারা!অমনি পৃথিবীআমার চোখের আর মনের পর্দায়আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিলো একটি পলকে।ছােট ছােট চারাগাছ—রসহীন খাদ্যহীন কার্ণিশের ধারেবলিষ্ঠ শিশুর মতাে বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছ্বাসে।
হঠাৎ চকিতে,এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ
-
সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্য প্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।
বলতে পারা যায় কি এই সম্যক কল্পনা-আভা কোথা থেকে আসে? কেউ কেউ বলেন, আসে পরমেশ্বরের কাছ থেকে। সে কথা যদি স্বীকার করি তাহলে একটি সুন্দর জটিল পাককে যেন
-
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহস্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহবিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই নেই ভয়পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়—আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্যবাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্যসঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্করতাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখরএ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বারপথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভারক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসেঅবিশ্রান্ত; একে একে হয়
-
কবিতা কি এ-জিজ্ঞাসার কোনো আবছা উত্তর দেওয়ার আগে এটুকু অন্তত স্পষ্টভাবে বলতে পারা যায় যে কবিতা অনেক রকম। হোমরও কবিতা লিখেছিলেন, মালার্মে র্যাঁবো ও রিলকেও। শেকস্পীয়র বদ্লেয়র রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টও কবিতা রচনা ক’রে গেছেন। কেউ-কেউ কবিকে সবের ওপরে সংস্কারকের ভূমিকায় দ্যাখেন; কারো-কারো ঝোঁক একান্তই রসের দিকে। কবিতা রসেরই ব্যাপার, কিন্তু এক ধরনের উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিজ্ঞতা ও চেতনার জিনিস—শুদ্ধ কল্পনা বা একান্ত বুদ্ধির রস নয়।
বিভিন্ন অভিজ্ঞ পাঠকের বিচার ও রুচির সঙ্গে যুক্ত থাকা দরকার কবির; কবিতার সম্পর্কে পাঠক ও সমালোচকেরা কি ভাবে দায়িত্ব সম্পন্ন করছেন—এবং কি ভাবে তা’ করা উচিত সেই সব চেতনার ওপর কবির ভবিষ্যৎ কাব্য, আমার
-
আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার।
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
-
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজআমি তাে জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজমাটিতে লালিত, ভীরু শুধু আজ আকাশের ডাকেমেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।যদিও নগণ্য আমি তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজেতবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গােপনে মর্মরধ্বনি বাজে।বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলাের আনাগােনাশিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনাআজ শুধু অঙ্কুরিত; জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতাউদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা।তারপর দৃপ্ত শাখা মেলে দেবাে সবার সম্মুখেফোটাবাে বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে।সংহত কঠিন ঝড়ে, দৃঢ় প্রাণ প্রত্যেক শিকড়শাখায় শাখায় বাধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়,অঙ্কুরিত বন্ধু যতাে মাথা তুলে আমারই আহ্বানেজানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।আগামী বসন্তে জেনাে মিশে যাবাে
-
এখনাে আমার মনে তােমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,এখনাে তােমার গানে সহসা উদ্বেল হ’য়ে উঠি—নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ কুটি।এখনাে প্রাণের স্তরে স্তরে,তােমার দানের মাটি সােনার ফসল তুলে ধরেএখনাে স্বগত ভাবাবেগেমনের গভীর অন্ধকারে তােমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।তবুও ক্ষুধিত দিন ক্রমশ সাম্রাজ্য গড়ে তােলে,গােপনে লাঞ্ছিত হই হানাদারী মৃত্যুর কবলে;যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তােমার সৃষ্টিকেএখনাে প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।তবুও নিশ্চিত উপবাসআমার মনের প্রান্তে নিয়ত ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস—আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,আমার বিনিদ্র রাত্রে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,আমার রােমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতেআমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।তাই আজ
-
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন—
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্
আমি একাই—ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন—
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে—আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তিতা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী
-
তোমার অশরীরি উপস্থিতি কি ভয়ঙ্কর!
না, ভয়ের কিছু নেই, আমি ভূত-প্রেতের কথা বলছি না।
বলছি, তোমার শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে
অশরীরী উপস্থিতি আমাকে নিয়ত উদ্বিগ্ন করে।
যখন ছিলে, ভাবনা বলতে ছিল শুধু—তুমি আছো।
আর আজ যখন নেই, অষ্টপ্রহর ভাবনা—তুমি নেই, অথচ ছিলে।
-
যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই।
হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।
কত করি উৎপাত
আবদার দিন রাত,
সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা!
আমাদের মুখ চেয়ে
নিজে রন নাহি খেয়ে,
শত দোষে দোষী তবু মা তো ত্যজে না।
ছিনু খোকা এতটুকু,
একটুতে ছোটো বুক
যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন
বুকে করে নিশিদিন
আরাম-বিরামহীন
দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- আবুল হাসনাত (১)
- কাইফি আজমি (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (৫)
- জীবনানন্দ দাস (১০)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১)
- বিষ্ণু দে (১)
- মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- মলয় রায়চৌধুরী (১)
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- মেহেরুন নেসা (১)
- যতীন সরকার (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (২)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- শামসুর রাহমান (১)
- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সুকান্ত ভট্টাচার্য (৯)
- সুনির্মল বসু (৩)
- হরবোলা (১০)
- হাফেজ শিরাজি (১)
- হাসান মুরশিদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.