-
একটা কুকুরকে গুলি মারিবার সময়েও এক আধটু ভয় হয়, যদিই কুকুরটা আসিয়া কোনো গতিকে গাঁক করিয়া কামড়াইয়া দেয়! কিন্তু আমাদের এই কালা আদমিকে গুলি করিবার সময় সাদা বাবাজিদের সে ভয় আদৌ পাইতে হয় না। কেন না তাহারা জানে যে, আমরা পশুর চেয়েও অধম। একবার এক সাহেবের গুলির চোটে আমাদের স্বগোত্র এক কালা আদমি মারা যায়, তাহাতে সাহেব জিজ্ঞেস করেন ‘কৌন্ মারা গিয়া?’ একজন আসিয়া বলিল, ‘এক দেহাতি আদমি হুজুর!’ সাহেব দিব্যি পা ফাঁক করিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘ওঃ, হাম সমঝা থা, কোই আডমি!’ অর্থাৎ ওই গ্রাম্য বেচারা সাহেবের বিড়াল-চোখে মানুষই নয়। মনুষ্যকে এত বড়ো ঘৃণা আর কেহ কোথাও প্রদর্শন
-
“সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি-করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোল ছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণ রক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমূখী হলুদ চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুন্ঠনকারী একটি মানুষ। তাঁর জন্য আমি জগন্নাথ হল-এ যে-সভাটি আহ্বান করেছিলাম তাতে ভিড় জমে ছিল প্রচুর। দূর শহর থেকে ইডেন কলেজের অধ্যাপিকারাও এসেছিলেন, তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে সকলেই মুগ্ধ: মৃত অথবা বৃদ্ধ অথবা প্রতিষ্ঠানীভূত না-হওয়া পর্যন্ত কবিদের বিষয়ে, যাঁরা স্বাস্থ্যকরভাবে সন্দিগ্ধ, সেই
-
আজ মনে পড়ে সেই দিন আর সেই ক্ষণ – বিকাল আড়াইটা যখন কলিকাতার সারা বিক্ষুব্ধ জনসংঘ টাউনহলের খিলাফত-আন্দোলন-সভায় তাহাদের বুকভরা বেদনা লইয়া সম্রাটের সম্রাট বিশ্বপিতার দরবারে তাহাদের আর্ত-প্রার্থনা নিবেদন করিতেছিল, আর পুত্রহীনা জননীর মতো সারা আকাশ জুড়িয়া কাহার আকুল-ধারা ব্যাকুলবেগে ঝরিতেছিল! সহসা নিদারুণ অশনিপাতের মতো আকাশ বাতাস মন্থন করিয়া গভীর আর্তনাদ উঠিল, – ‘তিলক আর নাই!’ আমাদের জননী জন্মভূমির বীরবাহু, বড়ো স্নেহের সন্তান – ‘তিলক আর নাই!’ হিন্দুস্থান কাঁপিয়া উঠিল – কাঁপিতে কাঁপিতে মূর্ছিত হইয়া পড়িল। ওরে, আজ যে তাহার বুকে তাহারই হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা ধসিয়া পড়িল! হিন্দুস্থানের আকাশে বাতাসে কোন্ প্রিয়তম-পুত্রহারা অভাগি মাতার মর্মবিদারী কাতরানি আর বুকচাপড়ানি রণিয়া রণিয়া গুমরিয়া
-
ভাবে আর কাজে সম্বন্ধটা খুব নিকট বোধ হইলেও আদতে এ জিনিস দুইটায় কিন্তু আশমান-জমিন তফাৎ।
ভাব জিনিসটা হইতেছে পুষ্পবিহীন সৌরভের মতো, একটা অবাস্তব উচ্ছ্বাস মাত্র। তাই বলিয়া কাজ মানে যে সৌরভবিহীন পুষ্প, ইহা যেন কেহ মনে করিয়া না বসেন। কাজ জিনিসটাই ভাবকে রূপ দেয়, ইহা সম্পূর্ণভাবে বস্তুজগতের।
তাই বলিয়া ভাবকে যে আমরা মন্দ বলিতেছি বা নিন্দা করিতেছি, তাহা নহে; ভাব জিনিসটা খুবই ভালো। মানুষকে কব্জায় আনিবার জন্য তাহার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া না তুলিতে পারিলে তাহার দ্বারা কোনো কাজ করানো যায় না, বিশেষ করে আমাদের এই ভাব-পাগলা দেশে। কিন্তু শুধু ভাব লইয়াই থাকিব, লোককে শুধু কথায় মাতাইয়া
-
বছর বিশ পঁচিশ আগে ‘সীমান্ত গান্ধী’ বলে খ্যাত আবদুল গফফর খান-এর ‘দেশ’ থেকে কয়েকজন আমার কাছে যখন আসেন, তখন স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতা মূল্য হিসাবে দেশবিভাগের প্রসঙ্গ ওঠে (সীমান্ত গান্ধী ১৯৪৭ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে গান্ধীজীর কাছে অনুযোগ করেছিলেন যে পাঠানদের তিনি ঠেলে দিয়েছেন ‘নেকড়ে বাঘের মুখে’), আর কথায় কথায় আমার মনে আসে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় মহাশয়ের ছড়া, “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল / আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে / ভাগ হয়নিকো নজরুল!” ছড়া শুনে সীমান্তপ্রদেশের পাঠান স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যে বিমল আনন্দ পেয়েছিলেন তা মনে পড়ছে। অন্নদাবাবুর ছড়ার উদ্ধৃতিতে যদি ভুল করে ফেলে থাকি, তো তার দায় আমার স্মৃতিভ্রংশের।
এরই
-
নজরুলের কারাদণ্ড হয়েছিল তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত, ধূমকেতু’তে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে একটি কবিতা লেখার জন্য। নজরুলই বাংলার প্রথম দণ্ডিত লেখক নন। তাঁর আগে বেশ কিছু কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক সরকারী রোষে পড়েছেন ও দণ্ডিতও হয়েছেন। এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ্য, মুকুন্দদাস, সখারাম গণেশ দেউস্কর। কিন্তু নজরুলকে নিয়ে যেমন দেশজুড়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়েছে, তেমন অন্য কারো ক্ষেত্রে হয়নি। নজরুলকে কারারুদ্ধ করা হলে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। এমন ব্যাপক প্রতিবাদের নানা কারণ আছে। যেসব বাঙালী সাহিত্যিক বা কবির বই ইংরেজ আমলে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল নিঃসন্দেহে নজরুল তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কবি। আর জনপ্রিয়তায় তিনি তো সমসাময়িক সকলের উপরে ছিলেন। সেযুগে তরুণদের মুখে মুখে ফিরত
-
চিন্তা করো বেশি, বলো অল্প এবং লেখো তার চেয়েও কম।—জন রে
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম কবি কাজী নজরুল ইসলামের, আর তার দুই স্ত্রী নার্গিস ও প্রমীলা হচ্ছেন পূর্ব বাংলার দৌলতপুর ও তেওতার মেয়ে।
প্রথমেই আসে নার্গিস অধ্যায়। এই আলোচনায় যার নাম প্রথমে আসে তিনি হচ্ছেন ঢাকা কলেজ থেকে বিএ পাস করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরের খাঁবাড়ির সন্তান আলী আকবর খান। কাজী নজরুল ইসলাম ও আলী আকবর খান উভয়েই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-ফেরত সৈনিক। উভয়ের আশ্রয় তখন কলকাতায়। কাজী নজরুলের আশ্রয় বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির অফিসে। এখানে তাঁর সহবাসী কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ এবং সাহিত্য সমিতি পত্রিকার প্রকাশক আফজাল উল হক। পাঠ্যপুস্তক
-
স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশমুখো হইয়া কোন্ অজানা পাষাণ-দেবতাকে লক্ষ করিয়া কেবলই কান্না জুড়িয়া দিলাম, তখন কবির কণ্ঠে আশার বাণী দৈব-বাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’!’ বাস্তবিক আজ আমরা অধীন হইয়াছি বলিয়া চিরকালই যে অধীন হইয়া থাকিব, এরূপ কোনো কথা নাই। কাহাকেও কেহ কখনও চিরদিন অধীন করিয়া রাখিতে পারে নাই, কারণ ইহা প্রকৃতির নিয়ম-বিরুদ্ধ।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া কেহ কখনও জয়ী হইতে পারে না। আজ যাহারা স্বাধীন হইয়া নিজের অধীনতার কথা ভুলিয়া অন্যকেও আবার অধীনতার জাঁতায় পিষ্ট করিতেছে, তাহারাও চিরকাল স্বাধীন ছিল না। শক্তি লাভ করিয়া
-
‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ কথাটা যেমন দিনের মতো সত্য, ‘বাণিজ্যে বসতে মিথ্যা’ কথাটা তেমনই রাতের মতো অন্ধকার। শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি না করিতে পারিলে জাতির পতন যেমন অবশ্যম্ভাবী, সত্যের উপর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত না করিলে বাণিজ্যের পতনও আবার তেমনই অবশ্যম্ভাবী। মদকে মদ বলিয়া খাওয়ানো তত দোষের নয়, যত দোষ হয় মদকে দুধ বলিয়া খাওয়ানোতে। দুধের সঙ্গে জল মিশাইয়া বিক্রি করিলে লাভ হয় যত, প্রবঞ্চনা করার পাপটা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। একটা জাতি ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা যত বড়ো হয় হউক, কিন্তু প্রবঞ্চনা বা মিথ্যার বিনিময়ে যেন তাহার জাতির বিশ্বস্ততা আর সুনাম বিক্রি করিয়া সে ছোটো না হইয়া বসে। ভণ্ড লক্ষপতি অপেক্ষা দরিদ্র তপস্বী ঢের ভালো।
-
তোরণে তোরণে ভৈরব-বিষাণ বাজিয়া উঠিয়াছে – ‘জাগো পুরবাসী!’ দিকে দিকে মঙ্গল শঙ্খে তাহারই প্রতিধ্বনি উঠিয়া আমাদের রক্তে রক্তে ছায়ানটের নৃত্যরাগ তুলিয়াছে। এই যে আমাদের জীবনের উন্মাদ নট-নৃত্য, এ শুধু বিশ্বের কল্যাণ-মুক্তিতে নয়, এই মুক্তি-যুগে আমরাও আমাদের ভাবী সিংহ-দ্বারের পূর্বতোরণে নহবতের বাঁশি শুনিয়াছি বলিয়া। তাই আর আমরা শুধু দার্শনিকের ভিতরের যুক্তিতে সন্তুষ্ট নই, এখন চাই বাইরের ব্যবহারিক জীবনে মুক্তি। এই ‘আজাদি’র সাড়া না পাইলে আমাদের জীবনে আজ এমন তরুণের উচ্ছৃঙ্খলতা, সবুজের স্বেচ্ছাচারিতা দেখা দিত না। রক্তনিশান লইয়া আজ আমাদের নূতন করিয়া যাত্রা শুরু; এই শোভাযাত্রার দুর্মদ অগ্রযাত্রী আমাদের যে কিশোর আর তরুণের দল, সর্বাগ্রে তাহাদিগেরই অন্তরে বাহিরে ‘আজাদি’র নেশা জমাইয়া তুলিতে
-
হে মোর দুর্ভাগা দেশ! যাদের করেছ অপমান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
—রবীন্দ্রনাথ
আজ আমাদের এই নূতন করিয়া মহাজাগরণের দিনে আমাদের সেই শক্তিকে ভুলিলে চলিবে না – যাহাদের উপর আমাদের দশ আনা শক্তি নির্ভর করিতেছে, অথচ আমরা তাহাদিগকে উপেক্ষা করিয়া আসিতেছি। সে হইতেছে, আমাদের দেশের তথাকথিত ‘ছোটোলোক’ সম্প্রদায়। আমাদের আভিজাত্য-গর্বিত সম্প্রদায়ই এই হতভাগাদের এইরূপ নামকরণ করিয়াছেন। কিন্তু কোনো যন্ত্র দিয়া এই দুই শ্রেণির লোকের অন্তর যদি দেখিতে পার, তাহা হইলে দেখিবে, ওই তথাকথিত ‘ছোটোলোক’-এর অন্তর কাচের ন্যায় স্বচ্ছ, এবং ওই আভিজাত্যগর্বিত তোমাদের ‘ভদ্রলোকের’ অন্তর মসিময় অন্ধকার। এই ‘ছোটোলোক’ এমন স্বচ্ছ অন্তর, এমন সরল মুক্ত উদার প্রাণ লইয়াও যে কোনো
-
জাপানে নজরুল চর্চা এখন শুরু হয়েছে বা এখনও শুরু হয় নি বললেও চলে। নজরুল চর্চা সম্পর্কে কিছু কথা বলার আগে জাপানে বাংলা সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছু বলা যাক ।
জাপানে এখনও সাধারণ লোকের মধ্যে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই জানা আছে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই জাপানে তাঁর পরিচয় শুরু হয়। গত ১০০ বছর ধরে জাপান সবসময় পশ্চিমমুখী ছিল বলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় উনিশশো দশক থেকে শুরু হয়েছে তার কারণ তিনি পশ্চিম দেশে শ্রেষ্ঠ কবি রূপে সমাদৃত। তখন জাপানে এমন কেউ ছিল না বাংলা ভাষা বুঝতে পারে আর অনুবাদ করতে পারে। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের সব রচনার অনুবাদ করা হয়েছিল ইংরেজী থেকে। এখন সেই
ক্যাটাগরি
লেখক
- আকবর উদ্দীন (১)
- কল্পতরু সেনগুপ্ত (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (২১)
- কাজী মোতাহার হোসেন (১)
- কিওকো নিওয়া (১)
- জগৎ ঘটক (১)
- জীবনানন্দ দাস (১)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- প্রতিভা বসু (১)
- বুদ্ধদেব বসু (১)
- মন্মথ রায় (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- শামসুন নাহার মাহমুদ (১)
- শিশির কর (১)
- শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১)
- হীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.