-
তখন আমার পনের কি ষোল বছর বয়েস হবে বোধহয়। এখনকার সময়ে শুনলে শিশুই মনে হবে। এখন তো পঁচিশ বছরেও কৈশোর কাটে না মেয়েদের। যা হোক, নজল ইসলামকে ঘিরেে আমার সব কথাই ওই সময়টুকূর পরিমণ্ডলে বাধা। ইদানিং ভুলে যাই ভীষণ। অতীত হাতড়ালে অনেক কথা একসঙ্গে ভিড় করে আসে। ঘটনাগুলোর ওপর অনেক দিনমাস বছরের প্রলেপ পড়েছে। তবু এখনো ভুলতে পারি না সেইসব গান। গান খুব ভালোবাসতাম। গান গাইতেও পারতাম। খুব প্রিয় ছিল আমার নজরুল গীতি। সেই যে ‘মন হারালে না পাওয়া যায় মনের বতন…’ ‘বাগিচা বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে…’ অপূর্ব সেই গানের পথ ধরেই স্মৃতিতে ভেসে আসেন তিনি। টুকরো অনেক ঘটনা মনে পড়ে
-
১৯২৬ সালের গোড়ায় নজরুল হুগলী থেকে কৃষ্ণনগর বাস করতে এসেছিলেন, ১৯২৯ সালের গোড়ার দিকে কলকাতায় চলে যান। দিন তারিখ মাসগুলো স্মৃতির কোঠা থেকে হারিয়ে গিয়েছে। ১৯২৬ সালে অবিশ্যি তিনি চাঁদসড়কের ঐ বাড়িতে বাস করতে এসেছিলেন। তবে ১৯২৬ সালের গোড়ায় তৎকালীন অন্যতম কংগ্রেসী নেতা ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রধান সহকারীদের মধ্যে অন্যতম হেমন্তকুমার সরকার নজরুলকে কৃষ্ণনগর নিয়ে আসেন। প্রথমে তিনি এসে ওঠেন হেমন্তকুমারের বড় ভাই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার জ্ঞানচন্দ্র সরকারের গোয়াড়ির একটা বাড়ীতে। বাড়ীটা ছিল অত্যন্ত ঘিঞ্জি জায়গায়। আশেপাশে সবাই অত্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু যদিও তাঁরা ও তাঁদের ঘরের মেয়েরা নজরুলের গান শোনার জন্য এই বাড়ীতে ভিড় জমাতেন। শেষে চাঁদসড়কের এই মুক্ত বাড়ীতে এসে
-
কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ কবে হয়েছিল, ঠিক মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে কলকাতার তালতলা বাজারের কাছে কোন এক গলিতে বস্তি এলাকার একতলা কোন ক্ষুদ্র কোঠায় একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, আর এবার মেডিক্যাল কলেজের সামনে কলেজ স্ট্রীটের[*]কোন মেস-এর দু’তলায়। তখন তাঁর ঝাঁকড়া চুল আর আয়ত দুটো চোখই আমার সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এরপরে কারমাইকেল হোস্টেলের কোন এক নৈশ অনুষ্ঠানেই বোধ হয় সর্বপ্রথম তাঁর গান শুনি, এই সময় তাঁর হারমোনিয়াম বাজানোর কৃতিত্ব দেখেও মুগ্ধ হয়েছিলাম। আরো পরে ইউরোপীয় এসাইলাম লেন, পানবাগান স্ট্রীট, বাগবাজার এলাকা, ইসমাইল স্ট্রীট, ইলিয়ট রোড, এন্টালী, জেলিখাটোলা, কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট, মানিকতলা এবং
-
রাণীগঞ্জের ইস্কুলে তখন আমাদের ক্লাশ বসে দোতলায়।
পশ্চিমদিকে বড় বড় জানলা। সেই খোলা জানলার পথে দেখলাম, দলে দলে লোক ছুটছে রেললাইনের দিকে। কি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। ইস্কুলের ছেলে—ক্লাশ ছেড়ে যেতেও পারি না। সবাই ভাবছে, ছুটি হোক, ছুটি হলেই ছুটবো ওইদিকে।
ছুটি হলো। বাইরে বেরিয়েই শুনলাম, সাঁওতালদের একটা মেয়ে নাকি কাটা পড়েছে ট্রেনের তলায়। তার মৃতদেহটা পড়ে আছে লাইনের ধারে।
ইস্কুলের ছেলেরা অনেকেই গেল দেখতে। আমার কিন্তু একা যেতে মন সরলো না। কিছুদিন ধরে কি যে হয়েছে নজরুলের সঙ্গে দেখা না হলে বিকেলটা মনে হয় মাটি হয়ে গেল।
নজরুল পড়ে শিয়াড়শোল ইস্কুলে, আমি পড়ি রাণীগঞ্জে। এক এক সময় আফশোষ
-
নজরুলের কারাদণ্ড হয়েছিল তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত, ধূমকেতু’তে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে একটি কবিতা লেখার জন্য। নজরুলই বাংলার প্রথম দণ্ডিত লেখক নন। তাঁর আগে বেশ কিছু কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক সরকারী রোষে পড়েছেন ও দণ্ডিতও হয়েছেন। এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ্য, মুকুন্দদাস, সখারাম গণেশ দেউস্কর। কিন্তু নজরুলকে নিয়ে যেমন দেশজুড়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়েছে, তেমন অন্য কারো ক্ষেত্রে হয়নি। নজরুলকে কারারুদ্ধ করা হলে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। এমন ব্যাপক প্রতিবাদের নানা কারণ আছে। যেসব বাঙালী সাহিত্যিক বা কবির বই ইংরেজ আমলে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল নিঃসন্দেহে নজরুল তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কবি। আর জনপ্রিয়তায় তিনি তো সমসাময়িক সকলের উপরে ছিলেন। সেযুগে তরুণদের মুখে মুখে ফিরত
-
“সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি-করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোল ছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণ রক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমূখী হলুদ চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুন্ঠনকারী একটি মানুষ। তাঁর জন্য আমি জগন্নাথ হল-এ যে-সভাটি আহ্বান করেছিলাম তাতে ভিড় জমে ছিল প্রচুর। দূর শহর থেকে ইডেন কলেজের অধ্যাপিকারাও এসেছিলেন, তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে সকলেই মুগ্ধ: মৃত অথবা বৃদ্ধ অথবা প্রতিষ্ঠানীভূত না-হওয়া পর্যন্ত কবিদের বিষয়ে, যাঁরা স্বাস্থ্যকরভাবে সন্দিগ্ধ, সেই
-
আজ মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহামাতার মহা আনন্দের দিন, আজ মহামানবতার মধ্যযুগের মহা উদ্বোধন! আজ নারায়ণ আর ক্ষীরোদসাগরে নিদ্রিত নন। নরের মাঝে আজ তাঁহার অপূর্ব মুক্তি-কাঙাল বেশ। ওই শোনো, শৃঙ্খলিত নিপীড়িত বন্দিদের শৃঙ্খলের ঝনৎকার। তাহারা শৃঙ্খল-মুক্ত হইবে, তাহারা কারাগৃহ ভাঙ্গিবে। ওই শোনো মুক্তি-পাগল মৃত্যুঞ্জয় ঈশানের মুক্তি-বিষাণ! ওই শোনো মহামাতা জগদ্ধাত্রীর শুভ শঙ্খ! ওই শোনো ইস্রাফিলের শিঙায় নব সৃষ্টির উল্লাস-ঘন রোল! ওই যে ভীম রণ কোলাহল, তাহাতেই মুক্তিকামী দৃপ্ত তরুণের শিকল টুটার শব্দ ঝনঝন করিয়া বাজিতেছে! সাগ্নিক ঋষির ঋক্মন্ত্র আজ বাণীলাভ করিয়াছে অগ্নি-পাথারে অগ্নি-কল্লোলে। আজ নিখিল উৎপীড়িতের প্রাণ-শিখা জ্বলিয়া উঠিয়াছে ওই মন্ত্র-শিখার পরশ পাইয়া। আজ তাহারা অন্ধ নয়, তাহাদের চোখের উপরকার কৃষ্ণ
-
জাপানে নজরুল চর্চা এখন শুরু হয়েছে বা এখনও শুরু হয় নি বললেও চলে। নজরুল চর্চা সম্পর্কে কিছু কথা বলার আগে জাপানে বাংলা সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছু বলা যাক ।
জাপানে এখনও সাধারণ লোকের মধ্যে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই জানা আছে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই জাপানে তাঁর পরিচয় শুরু হয়। গত ১০০ বছর ধরে জাপান সবসময় পশ্চিমমুখী ছিল বলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় উনিশশো দশক থেকে শুরু হয়েছে তার কারণ তিনি পশ্চিম দেশে শ্রেষ্ঠ কবি রূপে সমাদৃত। তখন জাপানে এমন কেউ ছিল না বাংলা ভাষা বুঝতে পারে আর অনুবাদ করতে পারে। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের সব রচনার অনুবাদ করা হয়েছিল ইংরেজী থেকে। এখন সেই
-
প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। মাঝখানে একটা যুগ; বেশীদিন নয়, বছর কুড়ি-পঁচিশ। বাংলার মুসলমানের জাতীয় জীবনে এটা একটা বিশেষ স্মরণীয় যুগ। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে জাতির জীবনে যে ক্ষীণ চেতনার সঞ্চার হয়েছিল, এ যুগে তা যেন হঠাৎ জোয়ারের মত ভেঙে পড়ল। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে আশ্রয় করেই মূখ্যত এসেছিল এই জোয়ার। নজরুলের আবির্ভাব অস্বাভাবিক না হলেও অত্যন্ত আকস্মিক তাঁর আগুন ঝরা লেখা হঠাৎ চমক লাগালো বাঙালি পাঠক সমাজের মনে।
যুদ্ধ-ফেরতা নজরুলের যখন প্রথম আবির্ভাব হল কলকাতায়, আমার স্বামী ঐ সময় কলিকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তখনকার কথা পরে তাঁর মুখে যেমন গল্প শুনেছি, ঠিক তেমনি বলছি। তিনি বলেছেন—‘মেডিক্যাল কলেজের সামনে
-
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদের জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।
জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে—এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায়—জীবনকে নতুন ক’রে প্রতিপালন করবার প্রযোজনে।
কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময়—বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় ব’লেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না
-
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও সঙ্গীত এবং সাধারণভাবে সাহিত্যসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও বহুত্বকে একটি বৃক্ষের শাখা প্রশাখা হিসাবে না দেখে একেবারে পৃথক করে করে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে আমাদের যার যার পছন্দমত বেছে নেবার একটা ঝোঁক তাঁর কাজের সামগ্রিকতাকে আড়াল করে দেয় এবং উৎকর্ষকে খণ্ডিত করে। অযৌক্তিক হলেও দুঃখের বিষয়, এটাই ঘটেছে বিশেষ করে চল্লিশের দশকে। এই বিভাজন ও তার ঝোঁকের মূলে কি কি কারণ রয়েছে এবং এদের অতিক্রম করার জন্যই বা কি কি পদক্ষেপ নেয়া, হয়েছে, আমরা এদের এখানে সংক্ষেপে খতিয়ে দেখছি এক এক করে। আমাদের মূল লক্ষ্য নজরুলের অব্যাহত ও অবিভাজ্য সত্তাটিকে প্রতিষ্ঠিত দেখা।
নজরুলের বিভাজনের জন্য হয়তো নজরুল নিজেও
-
স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশমুখো হইয়া কোন্ অজানা পাষাণ-দেবতাকে লক্ষ করিয়া কেবলই কান্না জুড়িয়া দিলাম, তখন কবির কণ্ঠে আশার বাণী দৈব-বাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’!’ বাস্তবিক আজ আমরা অধীন হইয়াছি বলিয়া চিরকালই যে অধীন হইয়া থাকিব, এরূপ কোনো কথা নাই। কাহাকেও কেহ কখনও চিরদিন অধীন করিয়া রাখিতে পারে নাই, কারণ ইহা প্রকৃতির নিয়ম-বিরুদ্ধ।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া কেহ কখনও জয়ী হইতে পারে না। আজ যাহারা স্বাধীন হইয়া নিজের অধীনতার কথা ভুলিয়া অন্যকেও আবার অধীনতার জাঁতায় পিষ্ট করিতেছে, তাহারাও চিরকাল স্বাধীন ছিল না। শক্তি লাভ করিয়া
ক্যাটাগরি
লেখক
- আকবর উদ্দীন (১)
- আবুল হাসনাত (১)
- কল্পতরু সেনগুপ্ত (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (২১)
- কাজী মোতাহার হোসেন (১)
- কিওকো নিওয়া (১)
- জগৎ ঘটক (১)
- জীবনানন্দ দাস (১)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- প্রতিভা বসু (১)
- বুদ্ধদেব বসু (১)
- মন্মথ রায় (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- শামসুন নাহার মাহমুদ (১)
- শিশির কর (১)
- শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১)
- হীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১)
- হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.