-
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ে নজরুল ইসলাম বাক্শক্তিহীন ছিলেন। তার স্বাভাবিক চেতনা ছিল না, তথাপি পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকে কবিকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বেসরকারীভাবে কেউ কেউ বলতেন। তখনো সরকারীভাবে ঘোষিত না হলেও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদার কথা চিন্তা করা হতো। এর বিপরীতে আরেকটি দিক ছিল জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েও তার গান ও কবিতার অঙ্গচ্ছেদ করার চেষ্টা হতো হিন্দুয়ানীর অভিযোগে। এভাবে যথেচ্ছ শব্দ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কম ছিল না। পাকিস্তান আমলে ‘নওবাহার’ পত্রিকায় নজরুলের সমালোচনায় কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন: “নজরুলকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু নজরুলের সবচেয়ে বড় অপবাদ যদি কিছু থাকে, তবে এই।... পাকিস্তানের কবি হওয়া
-
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ঢাকার রাজনৈতিক জগতের মানচিত্রটা বদলে যায় অনেক। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার গতিধারাকে প্রবাহিত করে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের অভূতপূর্ব পদক্ষেপ, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ কোন্দল এসব তো ছিলই। ’৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ভারতীয় বিপ্লবীদের মেরুদণ্ডকে অনেকখানি শক্ত করে দিয়েছিল কেবল নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বুকে ভীতির কম্পন জাগিয়েছিল। তাছাড়া বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকট ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু গঠন করেন সর্বভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লক। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সংগঠন
-
...গান-বাজনার পথটা ঢাকায় তিরিশ দশকেও বড়ো হেয় বলে গণ্য করা হত। কিন্তু সেইসঙ্গে একদিকে স্বদেশি গানের রেয়াজ আর অন্যদিকে ছিল ব্রহ্মসংগীতের প্রচলন। দেশাত্মবোধক নানা গানের প্রচলনের সঙ্গত কারণ ছিল। মুকুন্দ দাসের যাত্রা ঘুরে ফিরে পাড়ায় পাড়ায় চলত। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের গানগুলোও প্রচলিত হয়েছিল। বিপ্লবী ভূপেন রক্ষিতে পিতা যোগেশ রক্ষিত, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান শেখাতেন। তখন বাড়ির মেয়েরা, যারা স্কুলে যেত, তাদের মধ্যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সা রে গা মা সাধার প্রচলন হয়েছে। নিতান্ত ছেলেবেলায় স্কুলের প্রাইজ বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গান করেছিলাম । সেই থেকে বাড়িতে বাধা সত্ত্বেও গানের টান থেকে গেল। পাড়ায় কিশোরদের থিয়েটারের জন্য দাদার (বিপ্লবী অনিল রায়) ডাক এল। লীলাদির
-
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়,
-
এটা বাস্তব যে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানকার বাসিন্দারা আজকের মতোই খালি মাথায় থাকত। মুসলমানগণ যখন এখানে আগমন করেন তখন তারা পাগড়ি বেঁধে আসেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেননা এখানে যারা পশ্চিম থেকে আসেন, তারা পাগড়ি পরিধান করেই আসেন। অর্থ এই যে, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সবই পাগড়ি পরিহিত দেশ এবং আগমনকারীরা ঐ দিক থেকেই এসে থাকেন। অতঃপর ইসলাম ধর্মে পাগড়ির সম্মান রক্ষিত হয়েছে এবং ইমামতির জন্য পাগড়ি আবশ্যক করা হয়েছে।' এখানে (ঢাকাতে) দরবেশদের বংশ ছিল এবং তাঁরাও সর্বদা পাগড়ি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ঢাকার বিখ্যাত খানকাসমূহ, মগবাজার এবং আজিমপুরের বুজর্গদের যে সব ছবি দেখা গেছে সবাইকেই এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি
-
শবেবরাতের পরেই প্রত্যেক জায়গায় পবিত্র রমজানের আগমন হয়েছে বলে মনে করা হতো এবং বিশ তারিখের পর সব ধরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হতো। আলহামদুলিল্লাহ্! শহরে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং মাশাআল্লাহ, অধিকাংশগুলিতেই নামাজ পড়া হয়। মসজিদের চুনকাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ধনীদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রি এবং মজুরদের আগমন রমজান শরিফের প্রকাশ্য পূর্বাভাস ছিল। গরিব লোকেরাও রমজানের চাঁদের পূর্বে নিজেদের ঘর স্বচ্ছ মাটি দিয়ে মুছে লেপে ঝক ঝকে তক তকে বানিয়ে ফেলত। প্রত্যেক বাড়িই ক্ষমতা অনুসারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করত এবং করাতো। ঘোড়োঞ্চি'বা জলকান্দা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হতো। নতুন ঘড়া, মাটির নতুন হুক্কা, নতুন নৈচা ইত্যাদি আনা হতো এবং সুরভিত করে নেয়া হতো। তামাকের বিশেষ বন্দোবস্ত
-
তোরা: চুগতাই বা তুর্কী শব্দ। কার্যপ্রণালী, আইন এবং পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ঢাকায় তোরাবন্দীর ভোজ বলতে সেই খাদ্য পরিবেশনকে বুঝাত যা সম্ভ্রান্ত বা অভিজাতদের বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রচলিত ছিল। এই তোরাবন্দীতে বিশেষ শৃঙ্খলা এবং বিশেষ নিয়মে খাঞ্চা বণ্টন করা হতো। আমি যে সময়ে বুঝতে শিখেছি তখন তোরাবন্দীর আহার্য পরিবেশন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তোরাবন্দীর গঠন-আকৃতি এই শুনেছি যে, একটি বড় খাঞ্চায় (কান্তি) অথবা কয়েকটি খাঞ্চার মধ্যে মাটির পেয়ালায় এবং পেয়ালা-পাত্রসমূহে খাবার লাল বানাতে (মোটা পশমী কাপড়ের খানপোষে) ঢেকে অতিথিদের বাড়িতে পাঠানো হ'তো। ঐ সকল খাঞ্চায় চার ধরনের রুটি, চার ধরনের চাউল (ভাত), চার ধরনের রুটি-খাদ্য, চার প্রকারের কাবাব, চার
-
প্রাচীনকাল থেকেই পান হিন্দুস্থানের শোভা এবং নামসমূহের মধ্যে 'বাংলা পান', বাংলার বিশিষ্টতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা পান যদিও বড় হয় এবং একটা পানেই গাল ভরে যায় কিন্তু তাতে কোনো সৌন্দর্য নেই এবং এই পানের ঝাঁঝ কোনো কোনো ঋতুতে অসহনীয় হয়ে যায়। পানের একটি প্রকার যাকে সাঁচি পান বলা হয় এটি অবশ্য নরম, ঝাঁঝ কম এবং স্বাদের দিক থেকেও ভাল, কিছুটা হলেও সুগন্ধি আছে। বাংলায় সর্বত্রই কম বেশি সাঁচি পান পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট লোকেরা এটিকে ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার একটি বাজারের নাম 'সাঁচি পান দরীবা", যা এখন বাজার নেই বরং মহল্লা হয়ে গেছে। এই পানের প্রকৃতি ঠাণ্ডা, এজন্য
-
দেশভাগের পর কলকাতার পাট ঢুকিয়ে যখন এক রত্তি ঢাকায় এলাম, তখন ব্রিটিশ-উত্তর যুগের সেই বাঘাহামা কালে বিনোদনের জায়গা বলতে ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ছটা প্রেক্ষাগৃহ রমনার রম্ভা 'ব্রিটানিয়া', সং বংশালের 'মানসী', কাচারি পল্লীর 'মুকুল', সদরের শোভা 'রূপমহল', উর্বশীসম 'লায়ন', চর্মে ঘর্ম আর্মেনিটোলার 'নিউ পিকচার হাউস', আর চকের চাকু 'তাজমহল'। পরে পঞ্চাশের দশকের মধ্যে গড়ে ওঠে মায়া (বর্তমানে স্টার), নিউ প্যারাডাইজ (অধুনালুপ্ত), গুলিস্তান, নাজ ও নাগরমহল (বর্তমানে চিত্রামহল)। কোনো নাট্যশালা নয়, কোনো চিড়িয়াখানা নয়, ভালো পার্ক নয়, সাংবৎসরিক সার্কাস নয়-কিছু না। তবে অপার সবুজের স্নেহসান্নিধ্য পেতে ছিল কিন্তু নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বলধা গার্ডেনের আশ্চর্য সব তরুলতা ও বৃক্ষেরা-রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ক্যামেলিয়া থেকে শুরু করে
-
আমরা উঠলুম ৩৬ নম্বর কামিনীভূষণ রুদ্র রোডে, যার পোশাকি নাম চাঁদনী ঘাট। ১৯৪৮-এর ঢাকা। ব্রিটিশ আমলের পুরো গন্ধ তো ছিলই, মোগল আমলের ছিটেফোঁটা লালবাগ, আমলিটোলা, চকবাজার, মোগলটুলি, ইসলামপুর-এসব এলাকার অলিগলিতে যেন বা সেকালও উঁকি মারত। আমাদের এই হিসেবে প্রাউডলকের উদ্যান নগরী শ্যামলী রমনা হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এক বিস্ময়। এ কথা বলা যাবে না নবাবি আমলের ঢাকা সম্পর্কে। বিদ্যুতের ব্যবহার তখনো সর্বগামী ছিল না। ফলে সন্ধে নামলেই সেকালের জেলা শহরগুলোর মতোই অন্ধকার নেমে আসত ঢাকার শিরা-উপশিরায়, বাড়ি বাড়ি জ্বলে উঠতো হারিকেন লণ্ঠনের আলো। মাঝে মাঝে খাপছাড়াভাবে কোনো কোনো ভাগ্যবানের বাড়ির জানালা গলিয়ে বিদ্যুতের ঝলমলে নরম আলো এসে পড়ত খোয়াভাঙা রাস্তার
-
সুত্রাপুরের ১৯নং ওয়ালটার রোডের বাড়িটাকে আজ ক’জনই-বা চেনে! কিন্তু আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে এই বাড়িটা পুরানো ঢাকা শহরের অধিবাসীদের অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় এই ঢাকা শহরে জমিদারদের সুপরিকল্পিত উচ্ছেদনীতির বিরুদ্ধে চান্দিনা স্বত্বের প্রজাদের এক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই বাড়িটি আর তার স্রষ্টা ছিলেন এই বাড়ির মালিক মহম্মদ সফীউল্লাহ।
বিদ্যার দিক দিয়ে ম্যাট্রিক ফেল হলেও সফীউল্লাহ তাঁর নিজের পাড়ায় সুশিক্ষিত হিসাবেই গণ্য ছিলেন। এই অঞ্চলের স্থানীয় মুসলমান সমাজে ম্যাট্রিক পাস করা ছেলে তখন সুলভ ছিল না। কোনোকিছু নিয়ে লেখালেখি করার প্রয়োজন হলে পাড়ার লোক তাঁর কাছেই ছুটে আসত। ফলে তিনি মুখে
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.