-
সুবচনীর খোঁড়া হাঁস এই সব বুনো-হাঁসদের দলে ভিড়ে উড়তে, আর এ-গ্রামের সে-গ্রামের সব সরাল, ঘেংরালদের দেখে হাসি-মস্করা করতে পেয়ে, ভারি খুশি হয়েছে। সে ভুলে গেছে যে নিজেই সে এত-কাল পালা-হাঁসই ছিল—ঐ সরাল-ঘেংরালের মতো ঘর আর পুকুর করে কাটিয়েছে। তার উপর সে আজন্ম-খোঁড়া, সবে আজ নূতন উড়ছে। বুনো হাঁসের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে চলা তার কর্ম নয়! খোঁড়ার ডানার তেজ ক্রমেই কমছে আর দমও ক্রমে ফুরিয়ে আসছে, সে হাঁপাতে-হাঁপাতে তাড়াতাড়ি ডানা ঝাপটেও আর পেরে উঠছে না মধ্যে থেকে এক-এক-করে প্রায় আটহাঁস পিছিয়ে পড়েছে। সেথো হাঁসরা যখন দেখলে খোঁড়া পিছিয়ে পড়ে, আর পারে না, তখন পাণ্ডা-হাঁসকে ডাক দিয়ে জানালে—“চকা-নিকোবর, চকা-নিকোবর!”
চকা উড়তে-উড়তেই
-
মেঘনার মোহানায় চর যে কখন কোথায় পড়ে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আজ যেখানে জল, কাল সেখানে দেখা গেল চড়া পড়ে বালি ধূ-ধূ করছে; কাল যেখানে দেখেছি চরে উলু-ঘাস, বালু-হাঁস; বছর ফিরতে সেখানে দেখলেম চরও নেই, হাঁসও নেই—অগাধ জল থৈথৈ করছে! এক-রাতের মধ্যে হয়তো নদীর স্রোত ফিরে গেল—জলের জায়গায় উঠল বালি, বালির জায়গায় চলল জল।
বাগদী-চরে হাঁসেরা যখন উড়ে বসল, তখন চরের চারদিকে জল—ডাঙা থেকে না সাঁতরে চরে আসা মুশকিল। অপার মেঘনার বুকে একটুকরো ময়লা গামছার মতো ভাসছিল চরটি, কিন্তু রাত হতেই জল ক্রমে সরতে লাগল, আর দেখতে-দেখতে সরু এক-টুকরো চড়া, ডাঙা থেকে বাগদীচর পর্যন্ত, একটি সাঁকোর মতো দেখা দিলে।
চাঁদপুরের জঙ্গলে
-
উত্তর থেকে বড়নদী দেখানে ব্রহ্মপুত্রের জলে এসে মিলেছে ঠিক সেই বাঁকের মুখেই কতকালের পুরানো ডিমরুয়ার আসামী রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি। নাটবাড়ির নিচেই নদী মজে গিয়ে মস্ত চর পড়েছে। এত কাল থেকে হাড়গিলে পাখিরা এই চর দখল করে আছে যে, ক্রমে চরটার নামই হয়ে গেছে হাড়গিলার চর। এই চরের ওপারেই দেওয়ানগিরি মস্ত একটা বুড়ো আঙুলের মতো আকাশের দিকে ঠেলে উঠেচে। এই দেওয়ানগিরি হল যত ফরিয়াদি পাখির আড্ডা। একপারে রইল আসামী মাছেদের রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি আর এক পারে দেওয়ানী ফরিয়াদির আড্ডা দেওয়ানগিরি, মাঝখানে বসে রয়েছেন হাড়গিলে। আসামী ফরিয়াদিতে লড়াই মোকদ্দমা প্রায়ই হয়, তাতে দুই দলই মাঝে-মাঝে মারা পড়ে।
হাড়গিলের খাম্বাজং রাজা দুই দলের
-
মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো। আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।
খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো—তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন—বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।
এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা
-
বেবিলন দেশের নাম হয়তো তোমরা শুনেছো! সেই দেশের সম্রাট নমরূদ ছিলেন যেমন অহঙ্কারী তেমনি অত্যাচারী। রাজকোষে ছিল তাঁর প্রচুর মণিরত্ন, ধন-ঐশ্বর্য-দেহে বীর্য, অগণিত লোক-মস্কর।
একবার অগণিত সৈন্যসামন্ত নিয়ে তিনি অভিযানে বের হলেন। দেশের পর দেশ তাঁর করায়ত্ত হতে লাগলো। চারদিকে বয়ে গেলো রক্তের নদী—শোনা যেতে লাগলো নিপীড়িতের আর্তনাদ—দুর্বলের হাহাকার—বুকফাটা ক্রন্দন। তবু বিরাম নাই—বিশ্রাম নাই—শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস—জয় আর জয়। গ্রীস, তুরস্ক, আরব, পারস্য ও পাকভারতে তাঁর বিজয়-নিশান উড়তে লাগলো। তিনি হলেন অর্ধ পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি। দম্ভে তাঁর বুক উঠলো ফুলে—দুনিয়াটাকে খেলাঘর বলে তাঁর মনে হতে লাগলো।
একদিন নমরূদ আম-দরবারে বসে অমাত্য-পারিষদ নিয়ে খোশগল্পে মশগুল আছেন, এমন সময়ে একজন ফকির এসে
-
টিয়া পাখির বাচ্চা মার কাছে সারাদিন গল্প শোনে। ওর মা কত-যে গল্প জানে! পুরনো একটা ভাঙ্গা বাড়ির ছোট্ট খুপড়িতে ওদের বাসা। সেই বাড়িতে মানুষজন কেউ নেই, ছাড়াবাড়িটা জংলা গাছে ছেয়ে গেছে। গোটা দুই শেয়াল নীচের ঘরে বাসা বেঁধেছে। এ ছাড়া এ বাড়িতে একদল চামচিকে আছে, সাপ-খোপ আছে, পোকামাকড় আছে, অনেক কিছ্ইু আছে। কিন্তু ওদের সঙ্গে টিয়া পাখির কোনোই সম্পর্ক নেই। টিয়া তার বাচ্চাটাকে নিয়ে দোতলায় ঘুলঘুলিটায় বাসা বেঁধে আছে।
মা মাঝে মাঝে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসে। সেই আধো আলো আধো অন্ধকারে ওই ছোট্ট বাসাটুকুর মধ্যে বাচ্চা কিন্তু বেশ মনের আনন্দেই আছে। মাঝে মাঝে মা যখন ওকে ফেলে বাইরে চলে
-
কিজিল-আয়িয়াক
আকাশের তলে যত পাহাড়ে গাঁ আছে, আমার জন্মের জায়গাটা তার মধ্যে সবচেয়ে সেরা, সবচেয়ে সুন্দর। আমাদের গাঁ কথা বলে, সবচেয়ে মিষ্টি আমুদরিয়া নদীর গানে। জীবনে শুধু একবার, এক ঢোক তার জল খেলে, সে স্বাদ কখনো ভোলা যাবে না।
আজো পর্যন্ত রোজ সকালে গাঁয়ের চারপাশে দেখা যাবে খরগোশ, সজারু, শেয়াল, হিংস্র শৃগালের নখরের দাগ। সে কী বলব!
ছেলেবেলায় আমার ধারণা ছিল না কিজিল-আয়িয়াক জিনিসটা কী। হয়ত তার জন্যে দায়ী আমার আত্মীয়স্বজনেরা। আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসে তারা সবসময় আমায় খেপাত: ‘কই, দেখা তো তোর পা। তুই যখন কিজিল-আয়িয়াকের ছেলে, তখন তোর পা হওয়ার কথা সোনার।’
তুর্কমেন ভাষায় ‘কিজিল’ মানে লাল, তবে
-
পুতনা বলিয়া একটা বড়ই ভীষণ রাক্ষসী কংসের রাজ্যে বাস করিত। ছোট ছোট ছেলেদিগকে কৌশলে বধ করাই ছিল ইহার ব্যবসা। রাত্রিকালে কোন খোকা খুকি এই হতভাগিনীর দুধ পান করিলে আর তাহাদের রক্ষা ছিল না। সে-সব খোকা খুকির দেহ তখনই চূর্ণ হইয়া যাইত।
যখন জানা গেল যে কংসকে মারিবার লোকের জন্ম হইয়াছে, অমনি সে দুষ্ট এই পুতনাকে ডাকিয়া বলিল যে ‘যত ষন্ডা ষণ্ডা খোকা দেখিবে, সকলকেই বধ করিতে হইবে।’ তদবধি সেই হতভাগিনী কেবলই ছোট ছোট খোকা মারিয়া বেড়ায়। এমন করিয়া কত খোকার প্রাণ সে হরণ করিল তাহার সংখ্যা নাই।
নন্দের একটি খোকা হইয়াছে শুনিয়া এই রাক্ষসী একদিন গোকুলে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন
-
দুর্গার এক নাম ‘পার্বতী’, অর্থাৎ, পর্বতের মেয়ে। তাঁর পিতা হিমালয়, মা মেনকা। শিবের সঙ্গে যাতে তাঁর বিয়ে হয় এজন্য পার্বতী অনেক দিন ধরে কঠিন তপস্যা করেছিলেন, তার ফলে শেষে শিবের সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হল।
পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। কিন্তু বর যে, সে তো আর নিজে কনের বাপের কাছে গিয়ে বিয়ে ঠিক করতে পারে না, তাহলে লোকে হাসে। কাজেই শিব সপ্তর্ষিদের ডেকে পাঠালেন। সপ্তর্ষিরাও তখনই সোনার বল্কল পরে, মুক্তামালা গলায় দিয়ে, মণি-মানিকের গহনা ঝলমলিয়ে তাঁর কাছে এসে জোড় হাতে বললেন, ‘আমাদের কী সৌভাগ্য! প্রভু আজ আমাদের স্মরণ করেছেন। আজ্ঞা করুন, আমাদের এখন কী করতে হবে।’
শিব
-
মৌচাকের জন্যে গল্প চেয়েছেন, একটা ভূতের গল্প হলে ভালো হয় লিখেছেন। গল্প একটা দেবো, তবে ভূতের নয়, এবং গল্প নয়— সত্য ঘটনা।
লাহোর মিউজিয়ামে যখন চাকুরি করতাম, সে সময় লাহোরের বিখ্যাত ‘দেশবন্ধু’ কাগজের সম্পাদক বিনায়ক দত্ত সিং মহাশয়ের সঙ্গে আমার যথেষ্ট আলাপ হয়। মি. সিং প্রাচীন সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান, তাঁদের আদি বাসভূমি পাঞ্জাবে নয়, রাজপুতনার কোটা রাজ্যে। তিন পুরুষ পূর্বে তাঁর পিতামহ রাজকার্য উপলক্ষ্যে এসে পাঞ্জাবে বাস করেন। সেই থেকেই তাঁর দেশ ছাড়া। সন্ধ্যার পর তাঁর বৈঠকখানায় গিয়ে বসতাম এবং দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো আমলের বর্ম, কুঠার, পতাকা, বল্লম প্রভৃতি রাজপুতের যুদ্ধাস্ত্র সম্বন্ধে নানা ইতিহাস ও আলোচনা শুনতে বড়ো ভালো লাগত।
-
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট রুবাইয়াৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে মা তার কিভাবে ম্যাচবক্স থেকে একটা কাঠি বের করে সেটা বক্সটার একপাশে ঘষে দিতেই কাঠিটার মাথায় আগুন ধরে গেল। সে আগুন আবার চুলোর কাছে নিয়ে ধরতেই চুলোয় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো।
রুবাইয়াৎ মাকে প্রশ্ন করলো—আগুন জ্বলে কেমন করে, আম্মু? মা বললো—যাও, রাফসান ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করো। যদি ভাইয়া বলতে না পারে তাহলে আমি বলবো, কেমন?
রুবাইয়াৎ দৌড়ে রাফসান ভাইয়ার কাছে গেল। দেখলো সে পড়াশুনায় ব্যস্ত, সামনের মাসেই তার বড়সড় একটা পরীক্ষা আছে কিনা। তবুও তাকে সাহস করে প্রশ্ন করে বসলো রুবাইয়াৎ—আচ্ছা ভাইয়া, আগুন জ্বলে কেমন করে?
পড়াশুনায় বাধা পড়ায় রাফসান প্রথমে বিরক্ত
-
রানী রাজাকে বলল, রাজা, তোমার বড্ড বেশী ঘুম। তুমি দিনেও ঘুমোও, রাতেও ঘুমোও। এত ঘুম কি ভালো? এত ঘুম ঘুমোলে রাজ্য চালাবে কি করে?
রাজা বলল, সে কি, বেশী ঘুমোলাম আবার কখন? সারা দিনে রাতে তো চব্বিশ ঘণ্টা। তার মধ্যে এ কাজ আছে, ও কাজ আছে, নাওয়া আছে, খাওয়া আছে, আরও কত কি আছে। রাজার কাজের কি কোনো শেষ আছে? তার ওপর যখন তখন তোমার এই ঘ্যান-ঘ্যানানি, প্যান-প্যানানি। এর মধ্যে কি আর ঘুমোবার যো আছে! মনের সাধ মিটিয়ে ঘুমোতে না পেরে আমার গায়ে আর জুত লাগছে না, রোগাও হয়ে যাচ্ছি দিন দিন।
রানী অবাক হয়ে বলল, শোন কথা! রোগা না
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৯)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- ইয়াকভ আকিম (১)
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (২৬)
- কানিজ ফাতিমা (১)
- কায়ুম তাংগ্রিকুলিয়েভ (৪)
- গোলাম মোরশেদ খান (৩)
- চিত্রা দেব (১)
- জওহরলাল নেহেরু (১)
- জগদীশ চন্দ্র বসু (৩)
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৬)
- প্রযোজ্য নয় (১)
- বন্দে আলী মিয়া (১৫)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১)
- বিপ্রদাশ বড়ুয়া (২)
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (২)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- শহীদ আখন্দ (১)
- শহীদুর রহমান (১)
- সত্যেন সেন (১৯)
- সামিহা সুলতানা অনন্যা (১)
- সুবীর বৈরাগী (১)
- হাসান তারেক (২)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.