বই
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা
১৯৮৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সত্যেন সেনের “ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা” বইটি উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনে মুসলমান জনগণের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের অনালোচিত অধ্যায়কে তুলে ধরে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ফরায়াজী আন্দোলন, তিতুমীরের সংগ্রাম, ১৯৪০-এর দশকের গণজাগরণ—সব মিলিয়ে এটি ইতিহাসের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পাঠ।
-
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ লোকের মুখে মুখে সিপাহী বিদ্রোহ নামে প্রচলিত হয়ে এসেছে, এই নামটা আমরা পেয়েছিলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্র্রিটিশ সরকার এর নাম দিয়েছিলো Sepoy Mutiny অর্থাৎ সৈন্য বিদ্রোহ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তাই মনে হবে বটে তার কারণ গোরা সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহীদের স্বল্পবেতন উর্ধ্বতন নাগরিক প্রভুদের দুর্ব্যবহার এবং নানা রকম অভাব-অভিযোগ সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘদীন ধরে অসন্তোষ সঞ্চিত করে তুলছিল। এই সমস্ত অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বলে ১৭৬৪ সালে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সৈন্যদের মধ্যে এই জুলুম অবাধেই চলে আসছিল। ১৮৫৭ সালে দেশীয় সৈন্যরাই বিদ্রোহে প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত কারণে
-
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল.
-
হোসেন আহমদ মাদানি তাঁর কৈশোরে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থী হিসাবে এসেছিলেন, তিনি মাহমুদ আল হাসানের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। কিন্তু এখানকার শিক্ষা শেষ হওয়ার আগে তাঁর পিতা ১৮৮৯-১৮৯০ সালে তাঁকে নিয়ে মক্কায় চলে যান। তাঁরা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। তখন থেকে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত হোসেন আহমদ প্রধানতঃ হেজাজে অবস্থান করতেন, তবে মাঝে মাঝে ভারতে আসতেন। মাহমুদ আল হাসান যখন ভারত থেকে মক্কা এলেন তখন পর্যন্ত হোসেন আহমদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সর্ম্পক ছিলনা। কিন্তু মাহমুদ আল হাসানের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ফলে তিনি ভারতের সংগ্রামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। মাহমুদ আল হাসানের প্রিয় শিষ্য এবার তাঁর সহকর্মী ও পরামর্শদাতা হয়ে দাঁড়ালেন।
মাহমুদ
-
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে
-
দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র ও আলীগড় শিক্ষা কেন্দ্র এই উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে বিশেষ পরিচিত। অবশ্য আজকালকার দিনের শিক্ষিত তরুণ মুসলমানেরা আলীগড়ের নাম যে ভাবে জানে দেওবন্দ এর নাম তেমন করে জানে না। হিন্দুদের পক্ষে এ কথা সত্য, আলীগড়ের কথা তারা অনেকেই জানে কিন্তু দেওবন্দের কথা খুব কম লোকেই জানে। অথচ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র যে দেশপ্রেমিক ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে, সেজন্য হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলের কাছেই তা স্মরণীয় থাকা উচিত ছিল।
এই উপমহাদেশের সুদুর পল্লী অঞ্চলে মুসলমানদের কাছে একসময় আলীগড়ের চেয়েও দেওবন্দের নামই কিন্তু অনেক বেশী পরিচিত ছিল। এর প্রধান কারণ দেওবন্দ কেন্দ্র উলেমাদের দ্বারা পরিচালিত এবং এখানে প্রাচীন
-
জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁদের নাম বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। কিন্তু নিজেদের ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফলে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকদের ত্রুটি বিচ্যুতির দরুণ এই সমস্ত নাম বিস্মৃতির তলায় চাপা পড়ে যায়। এমনি একটি নাম বদরুদ্দিন তায়াবজী। ভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টদের নামের ধারাবাহিক তালিকায় তাঁর নামটা খুঁজে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তাঁর দেশের মানুষ তার সর্ম্পকে খুব কম খবরই রাখে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন প্রথম গঠিত হয়, সে সময় যে ক’জন নেতৃস্থানীয় মুসলমান তার সঙ্গে যোগদান করেন, নিঃসন্দেহে বদরুদ্দিন তায়াবজী তার মধ্যে প্রধান। তিনি সে সময় ভারতের একজন বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী মুসলমান হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এটা এখনকার মুসলমান সমাজ
-
১৮২৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই দিনটি অবিস্মরণীয়। অবিস্মরণীয় বটে, কিন্তু স্মরণ করা যাক এই দিবসটির ইতিহাস ও তাৎপর্য আমাদের কজনেরই বা জানা আছে। আমাদের দেশের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অধিকাংশের অজ্ঞতা, অবহেলা বা একদেশ দর্শিতার বশে এই দিবসটি বিস্মৃতির তলায় চাপা পরে গিয়াছে। আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ, এমনকি রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা পর্যন্ত এই দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কে উদাসীন। অথচ এই সময় থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা, এই তারিখেই যুক্ত প্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ তার দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ শুরু করেছিলেন।
এই ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম একমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার দুটো কারণ
-
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী-আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। এই সময় থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এক নূতন রূপ-সংগ্রামী রূপ গ্রহণ করল। নানা কারণে সারা ভারতের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করেছিল। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে সমগ্র ভারতকে এক নূতন পথের নিশানা দিল। এই আন্দোলন প্রধানতঃ বাংলা প্রদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বটে কিন্তু তার প্রবাহ দেখতে দেখতে সারা দেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই নূতন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মূলে যার দায়িত্ব সর্বাধিক তিনি হচ্ছেন ভারতের তদানীন্তন বড়লাট লর্ড কার্জন। অবশ্য দুদিন আগে হোক বা পরে হোক ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যেত
-
মওলবী লিয়াকত হোসেন
আজকের দিনে এই নামটি খুব কম লোকের কাছেই পরিচিতি। কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। বস্তুতঃ লিয়াকত হোসেন বাঙালী নন তাঁর জন্ম হয়েছিল বিহারে। তা হলেও বাংলাদেশকে তিনি জন্মভূমির মতোই আপন বলে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। আমরা বাঙালিরাও যেন সেই দৃষ্টি নিয়ে তাঁকে দেখতে পারি।
মৌলবী লিয়াকত হোসেন এর প্রাথমিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের কোনো কিছুই জানা নেই। একজন উদ্যোগী ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবেই তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয়। তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপের মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ১৯০৫ সালের কথা। সে সময় বড়লাট লর্ড কার্জন নবজাগ্রত বাঙালী শক্তিকে নিষ্পেষিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গভঙ্গের
-
এটা খুবই আশ্চর্যের কথা, মাহমুদ আল হাসান নামটি আমাদের দেশের খুব কম লোকের কাছেই পরিচিত, দেশকে যারা ভালবাসেন, এই নামটি তাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষালাভ করে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই পতাকাবাহীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর প্রভাবে ও দৃষ্টান্তে এই শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষাকর্মীরা সংগ্রামী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
মাহমুদ আল হাসান ১৮৫১ সালে উত্তর প্রদেশের বেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি তাঁর পিতার সাথে মিরাটে ছিলেন। এই মিরাটেই সিপাহীদের মধ্যে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। ছয় বছর বয়সের বালক মাহমুদ আল হাসান তখন থেকেই এই বিদ্রোহীদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী এবং বিদ্রোহ ভেঙ্গে পড়ার পর ব্রিটিশ
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে, মৌলবী বরকতুল্লাহ্র নাম তারা অবশ্যই শুনেছেন। ১৯১৫ সালের ১লা ডিসেম্বর তারিখে কাবুলে স্বাধীন ভারতের যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়, রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ ছিলেন তার রাষ্ট্রপতি, আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মৌলবী বরকতুল্লাহ্।
মৌলবী বরকতুল্লাহ্র বিপ্লবী জীবনের সবটাই কেটেছে ভারতের বাইরে, প্রবাসে এশিয়া, আমেরিকা, ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল, তাই স্বদেশে ফিরে যাবার পথ কোনো দিন তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়নি। অবশেষে একদিন দেশ থেকে বহুদূরে বিদেশের মাটিতে তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছিল।
তাঁর জন্মস্থান ছিল ভূপোলে। ১৯০১ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য লণ্ডনে গিয়ে শ্যামলী কৃষবর্মা
-
দেওবন্দ এর শিক্ষাকেন্দ্র থেকে যারা স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ওবায়দুল্লাহ্ সিন্ধীর নাম উল্লেখযোগ্য। এক বিচিত্র চরিত্র, দীর্ঘকাল ধরে উল্কার মত জ্বলতে জ্বলতে চলেছেন, কিন্তু নিজে উল্কার মত পুড়ে ছাই হয়ে যাননি। বিপ্লবী ওবায়দুল্লাহ্ দেওবন্দ থেকে যে অগ্নিমশাল নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, তা নিয়ে দেশ-দেশান্তরে অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন।
জীবনের কৈশোর থেকে তার বিদ্রোহের শুরু। এ এমন এক বিদ্রোহের ডাক যার প্রেরণায় মানুষ পুরাতনকে ছেড়ে নুতন এবং নুতনকে ছেড়ে নুতনতর লক্ষ্যের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ভয় পায় না। ১৮৭১ সালে পাঞ্জাবের শৈলকোট জেলায় এক সম্ভ্রান্ত শিখ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ইসলামের উদার বাণীর অমোঘ আহ্বান শুনতে
ক্যাটাগরি
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.