১৮৯৪–১৯৫০
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন ক...
See more >>-
পাড়াগাঁয়ের মাইনার স্কুল। মাঝে মাঝে ভিজিট করতে আসি, আর কোথাও থাকবার জায়গা নেই, হেডমাস্টার অবিনাশবাবুর ওখানেই উঠতে হয়। অবিনাশবাবুকে লাগেও ভালো, বছর বিয়াল্লিশ বয়স, একহারা চেহারা, বেশ ভাবুক লোক। বেশি গোলমাল ঝঞ্ঝাট পছন্দ করেন না, কাজেই জীবনের পথে বাধা ঠেলে অগ্রসর না-হতে পেরে দেবলহাটি মাইনার স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপে পনেরো বছর কাটিয়ে দিলেন এবং বাকি পনেরোটা বছর যে এখানেই কাটাবেন তার সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর সতেরো আনা।
কার্তিক মাসের শেষে হেমন্ত সন্ধ্যা। স্কুলের বারান্দাতে ক্লাসরুমের দু-খানা চেয়ার টেনে নিয়ে আমরা গল্প করছিলাম। সামনেই একটা ছোটো মাঠ, একপাশে একটা বড়ো হুঁতগাছ, একপাশে একটা মজা পুকুর। সামনের কাঁচা রাস্তাটা গ্রামের বাজারের দিকে গিয়েছে।
-
দেশ থেকে রবিবারে ফিরছিলাম কলকাতায়। সন্ধ্যার আর বেশি দেরি নেই, একটু আগে থেকেই প্ল্যাটফর্মে আলো জ্বেলেছে, শীতও খুব বেশি। এদিকে এমন একটা কামরায় উঠে বসেছি, যেখানে দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই যার সঙ্গে একটু গল্পগুজব করি। আবার যার-তার সঙ্গে গল্প করেও আনন্দ হয় না। আমার দরের কোনো লোকের সঙ্গে গল্পে করে কোনো সুখ পাইনে, কারণ তারা যে-কথা বলবে সে আমার জানা। তারা আমারই জগতের লোক, আমার মতোই লেখাপড়া তাদেরও, আমারই মতো কেরানিগিরি কী ইস্কুল-মাস্টারি করে, আমারই মতো শনিবারে বাড়ি এসে আবার রবিবারে কলকাতায় ফেরে। তারা নতুন খবর আমায় কিছুই দিতে পারবে না, সেই একঘেয়ে কলকাতার মাছের দর, এম. সি. সি-র খেলা, ইস্টবেঙ্গল
-
এক-একজন লোকের স্বভাব বড়ো খারাপ, বকুনি ভিন্ন তারা একদণ্ডও থাকতে পারে না, শ্রোতা পেলে বকে যাওয়াতেই তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ। হীরেন ছিল এই ধরনের মানুষ। তার বকুনির জ্বালায় সকলে অতিষ্ঠ। আপিসে যারা তার সহকর্মী, শেষপর্যন্ত তাদের অনেকের স্নায়ুর রোগ দেখা দিলে, অনেকে চাকরি ছাড়বার মতলব ধরলে।
সব বিষয়ের প্রতিভার মতোই বকুনির প্রতিভাও পৈতৃক শক্তির আবশ্যক রাখে। হীরেনের বাবার বকুনিই ছিল একটা রোগ। শেষবয়সে তাঁকে ডাক্তারে বারণ করেছিল, তিনি বেশি কথা যেন না-বলেন। তাতে তিনি জবাব দিয়েছিলেন—তবে বেঁচে লাভটা কী ডাক্তারবাবু? যদি দু-একটা কথাই কারো সঙ্গে বলতে না পারলুম! কথা বলতে বলতেই হৃৎপিণ্ড দুর্বল হবার ফলে তিনি মারা যান—মার্টার টু দি
-
সন্ধ্যা হইবার দেরী নাই। রাস্তায় পুরনো বইয়ের দোকানে বই দেখিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময় আমার এক বন্ধু কিশোরী সেন আসিয়া বলিল, এই যে, এখানে কি? চল চল জ্যোতিষীকে হাত দেখিয়ে আসি। তারানাথ জ্যোতিষীর নাম শোননি? মস্ত বড় গুণী।
হাত দেখানোর ঝোঁক চিরকাল আছে। সত্যিকার ভালো জ্যোতিষী কখনও দেখি নাই। জিজ্ঞাসা করিলাম—বড় জ্যোতিষী মানে কি? যা বলে তা সত্যি হয়? আমার অতীত ও বর্তমান বলতে পারে? ভবিষ্যতের কথা বললে বিশ্বাস হয় না।
বন্ধু বলিল—চলই না। পকেটে টাকা আছে? দু—টাকা নেবে, তোমার হাত দেখিও। দেখ না বলতে পারে কি না। কাছেই একটা গলির মধ্যে একতলা বাড়ির গায়ে টিনের সাইন বোর্ডে লেখা আছে—
তারানাথ
-
পাড়ায় ছ’সাত ঘর ব্রাহ্মণের বাস মোটে। সকলের অবস্থাই খারাপ। পরস্পরকে ঠকিয়ে পরস্পরের কাছে ধার-ধোর করে এরা দিন গুজরান করে। অবিশ্যি কেউ কাউকে খুব ঠকাতে পারে না, কারণ সবাই বেশ হুঁশিয়ার। গরিব বলেই এরা বেশি কুচুটে ও হিংসুক, কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না বা কেউ কাউকে বিশ্বাসও করে না।
আগেই বলেছি, সকলের অবস্থা খারাপ এবং খানিকটা তার দরুন, খানিকটা অন্য কারণে সকলের চেহারা খারাপ। কিশোরী মেয়েদেরও তেমন লালিত্য নেই মুখে, ছোট ছোট ছেলেরা এমন অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং এমন পাকা পাকা কথা বলে যে, তাদের আর শিশু বা বালক বলে মনে হয় না। কাব্যে বা উপন্যাসে যে শৈশবকালের কতই প্রশস্তি
-
আষাঢ় মাসের প্রথমে জ্যৈষ্ঠের গরমটা কাটিয়া গিয়াছে তাই রক্ষা, যে কষ্ট পাইয়াছিলাম গতমাসে! এই বাগানঘেরা হাটতলায় কি একটু বাতাস আছে?
কিছু করিতে পারিলাম না এখানেও। আছি তো আজ দেড় বছর। শুধু এখানে কেন, বয়স তো প্রায় বত্রিশ-তেত্রিশ ছাড়াইতে চলিয়াছে, এখনও পর্যন্ত কী করিলাম জীবনে? কত জায়গায় ঘুরিলাম, কোথাও না-হইল পসার, না-জমিল প্র্যাকটিস। বাগআঁচড়া, কলারোয়া, শিমুলতলী, সত্রাজিৎপুর, বাগান গাঁ—কত গ্রামের নামই বা করিব! কোথাও মাস-কয়েকের বেশি চলে। এই পলাশপাড়ায় যখন প্রথম আসি, বেশ চলিয়াছিল কয়েক মাস। ভাবিয়াছিলাম ভগবান মুখ তুলিয়া চাহিলেন বুঝি। কিন্তু তার পরেই কি ঘটিল, আজ কয়েক মাস একটি পয়সারও মুখ দেখিতে পাই না।
এখন মনে হয় কুণ্ডবাবুদের আড়তে
-
সংসারটা এমন কিছু বড়ো নয়। মাত্র দুটো মেয়েমানুষ এবং একজন পুরুষের সমবায়ে গঠিত। ডাক্তার, ডাক্তারের বউ এবং তাদের এক বিধবা পিসিমা, আবার এই পিসিমা ডক্তারের চেয়ে বছর দশেকের ছোটো। সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ডাক্তার। চক্রধরপুরে বদলি হয়েছে সম্প্রতি। ছোট্ট সংসার—আরও ছোট্ট একখানা বাড়িতে অবস্থিত—বেশ ভালোভাবেই চলছিল সুখে, শান্তিতে, হাসিতে ও আনন্দে–উদয়াস্ত সুমহান কাল কেটে যাচ্ছিল মোহন ছন্দে।
এ হেন সময়ে ডাক্তার একখানা চিঠি পেল এই মর্মে, কলকাতা থেকে নাকি তার বাপের ছোটো কাকার বড়ো ছেলের রুগণ বধূ আসছে তার শরীরের ক্ষতিপূরণ করতে এই পাহাড়ের দেশে। অলকার স্বামীই ডাক্তারের চেয়ে অনেক ছোটো।
প্রস্তাবনাটা পিসিমার কাছে উত্থাপিত হলে তো সে প্রতিবাদ করলে, “বেশ,
-
ঝমঝম বর্ষা।
ভাদ্র মাসের দিন। আজ দিন পনেরো ধরে বর্ষা নেমেছে, তার আর বিরামও নেই, বিশ্রামও নেই। ক্ষুদিরাম ভটচাজের বাড়িতে আজ দু-দিন হাঁড়ি চড়েনি।
ক্ষুদিরাম সামান্য আয়ের গৃহস্থ। জমিজমার সামান্য কিছু আয় এবং দু-চার ঘর শিষ্য-যজমানের বাড়ি ঘুরে ঘুরে কায়ক্লেশে সংসার চলে। এই ভীষণ বর্ষায় গ্রামের কত গৃহস্থের বাড়িতেই পুত্র-কন্যা অনাহারে আছে—ক্ষুদিরাম তো সামান্য গৃহস্থ মাত্র! যজমান-বাড়ি থেকে যে কটি ধান এসেছিল, তা ফুরিয়ে গিয়েচে।—ভাদ্রের শেষে আউশ ধান চাষিদের ঘরে উঠলে তবে আবার কিছু ধান ঘরে আসবে, ছেলেপুলেরা দু-বেলা পেটপুরে খেতে পাবে।
নেপাল ও গোপাল ক্ষুদিরামের দুই ছেলে। নেপালের বয়স বছর বারো, গোপালের দশ। ক-দিন থেকে পেটভরে না-খেতে পেয়ে ওরা
-
ভয়ানক বর্ষা। ক-দিন সমানভাবে চলিয়াছে, বিরাম বিশ্রাম নাই। প্রতুল মেসের বাসায় নিজের সিটটিতে বসিয়া বসিয়া বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছে। কোথায় বা বাহির হইবে? যাইবার উপায় নাই কোনোদিকে, ছাদ চুইয়া ঘরে জল পড়িতেছে—সকাল হইতে বিছানাটা একবার এদিকে, একবার ওদিকে সরাইয়াই বা কতক্ষণ পারা যায়? সন্ধ্যার সময় আরও জোর বর্ষা নামিল। চারিদিক ধোঁয়াকার হইয়া উঠিল, বৃষ্টির জলের কুয়াশার ফাঁকে ফাঁকে গ্যাসের আলোগুলো রাস্তার ধারে ঝাপসা দেখাইতেছে।
প্রতুল একটা বিড়ি ধরাইল। সকাল হইতে এক বান্ডিল বিড়ি উঠিয়া গিয়াছে— বসিয়া বসিয়া বিড়ি খাওয়া ছাড়া সময় কাটাইবার উপায় কই? সিগারেট কিনিবার পয়সা নাই। এই সময়টা সিগারেট খাইয়া কাটাইতে হইলে দুই বাক্স ক্যাভেন্ডার নেভিকাট সিগারেট লাগিত।
প্রতুলের
-
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের প্রান্তে হরিচরণ রায়ের ছোটো একখানা কোঠাবাড়ি ছিল। সংসারে থাকিবার মধ্যে তাহার স্ত্রী আর এক ছেলে। হরিচরণ রায়ের বয়স বছর ত্রিশেক, স্ত্রীর বয়স একুশ-বাইশ। হরিচরণ রায়ের লেখাপড়া এমন বিশেষ কিছুই জানা ছিল না, তাহার উপর নিতান্তই পাড়াগেঁয়ে মানুষ; কাজেই কোথাও না যাইয়া তিনি বাড়ি বসিয়া পৈতৃক আমলের সামান্য একটু জমিজমার খাজনা সাধিতেন। কচু কুমড়া বেগুন—আবাদ করিতেন ঠিক বলা চলে না—পুঁতিতেন; ইহাতেই তিন প্রাণীর একপ্রকার কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলিয়া যাইত।
পৌঁষ মাস। খুব শীত। সন্ধ্যার সময় এক দূর প্রজাবাড়ি হইতে খাজনা আদায় করিয়া হরিচরণ বাড়ি ফিরিয়া আসিল। স্ত্রী বীণাপাণি উঠানের তুলসীতলায় সন্ধ্যা দিতেছিল, স্বামীকে আসিতে দেখিয়া তাড়াতাড়ি তুলসীতলায় প্রণাম সারিয়া, হাসিমুখে
-
ছেলেমানুষ তখন আমি। আট বছর বয়স।
দিদিমা বলতেন, তোর বিয়ে দেব ওই অতুলের সঙ্গে।
মামারবাড়িতে মানুষ, বাবা ছিলেন ঘরজামাই—এসব কথা অবিশ্যি আরও বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম।
অতুল আমার দিদিমার সইয়ের ছেলে, কোথায় পড়ে, বেশ লম্বামত আধফর্সা গোছের ছেলেটা। আমাদের রান্নাঘরে বসে দিদিমার সঙ্গে আড্ডা দিত। অতুলকে আমার পছন্দ হত না, কেমনধারা যেন কথাবার্তা। আমায় বলত—এই পাঁচী, যা—এখানে কী? ওইদিকে গিয়ে খেলা করগে যা—
কখনো বলত—অমন দুষ্টুমি করবি তো বাঁশবনে লম্বা শেয়ালটা আছে তার। মুখে ফেলে দিয়ে আসব বলে দিচ্চি
অতুলকে সবাই বলত ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় বছর বছর ভালো হয়ে ক্লাসে উঠত, আমার ছোটোমামার সঙ্গে কীসব ইংরিজি-মিংরিজি বলত—যদি তার কিছু বুঝি!
এইসবের
-
মধুমতী নদীর ওপরেই সেকালের প্রকাণ্ড কোঠাবাড়িটা।
রাধামোহন নদীর দিকের বারান্দাতে বসে একটা বই হাতে নিয়ে পড়বার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু বই-এ মন বসাতে পারলে না।
কেমন সুন্দর ছোট্ট গ্রাম্য নদীটি, ওপারে বাঁশবন, আমবন—বহুকালের। ফলের বাগান যেন প্রাচীন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। একা এতবড়ো বাড়িতে থাকতে বেশ লাগে। খুব নির্জন, পড়াশোনো করবার পক্ষে কিংবা লেখা-টেখার পক্ষে বেশ জায়গাটি। তাদের পৈতৃক বসতবাটী বটে, তবে কতকাল ধরে তারা কেউ এখানে আসেনি, কেউ বাস করেনি।
রাধামোহনের বাবা শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর বাল্যবয়সে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। মেদিনীপুরে তাঁর মামারবাড়ি। সেখানে থেকে লেখাপড়া শিখে মেদিনীপুরে ওকালতি করে বিস্তর অর্থ উপার্জন করেন এবং সেখানে বড়ো বাড়িঘর তৈরি
-
সিঁদুরচরণ আজ দশ-বারো বছর মালিপোতায় বাস করছে বটে কিন্তু ওর বাড়ি এখানে নয়। সেদিন রায়েদের চণ্ডীমণ্ডপে সিঁদুরচরণ কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে কথা হচ্ছিল। বৃদ্ধ ভট্টাচার্য মশায় তামাক টানতে টানতে বললেন—”কে, সিঁদুরচরণ? ওর বাড়ি ছিল কোথায় কেউ জানে না, তবে এখানে আসবার আগে ও খাবরাপোতায় প্রায় দশ বছর ছিল। তার আগে অন্য গাঁয়ে ছিল শুনিচি, গাঁয়ে গাঁয়ে বেড়িয়ে বেড়ানোই ওর পেশা।”
পেশা হয়তো হতে পারে, কারণ সিঁদুরচরণ গরিব লোক।
জীবনে সে ভালো জিনিসের মুখ দেখেনি কখনো। কেউ আপনার লোক ছিল, সম্প্রতি মালিপোতাতে এসে বিয়ের চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীলকে কেউ মেয়ে দেবার আগ্রহ দেখায়নি। মালিপোতার এক বুনো মালি আজকাল ওর সঙ্গে
-
মেয়ে দেখতে আসছেন পাত্রের জ্যাঠামশাই এবার।
এটা নিয়ে তিনবার হবে। প্রথমে দেখে গেছেন পাত্রের বাবা এবং মামা। বাবা মনে হল একটু সাদাসিধা ঢিলেঢালা মানুষ, নিতান্ত নাকি ছেলের বাপ তাই এসেছেন। মামা কিন্তু এক্সপার্ট মেয়ে-দেখিয়ে। সাধারণ প্রশ্ন এমনি যা সব তা তো হলই, তারপর অঙ্গাদি পরীক্ষাতেও বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। বাঁ হাতে ওর ডান হাতটি নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আঙুলগুলি পরীক্ষা করলেন, পরে বাঁ হাতের গুলিও। একটু ঘষে ঘষেই হাতের উলটো পিঠ, মণিবন্ধ পরীক্ষা করলেন, ত্বকের মসৃণতা দেখবার ছলেই অবশ্য, কিন্তু যারা বোঝবার তারা বুঝল, রঙ-পাউডার মাখানো হয়েছে কিনা তারই যাচাই। আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছিল, পা-দুটি জড়ো করিয়ে পা দেখলেন, আঙুল দেখলেন। খোঁপা বাঁধা
-
গৃহপ্রাঙ্গণে ভবনশিখী পাখা মেলে নেচে বেড়াচ্ছে অতিমুক্তলতার পাশে পাশে। কাল রাত্রে প্রমোদগৃহে যে জাতিপুষ্পের সুগন্ধি মাল্য ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটা বাতায়ন-বলভিতে প্রলম্বিত। বোধ হয় পরিত্যক্ত। আর সেটির কী দরকার!
অতিমুক্তলতার ফাঁকে ফাঁকে দূরের নীল শৈলশ্রেণির তুষার-মুকুট চোখে পড়ে। মাসটা চৈত্র, কিন্তু বেশ শীত।
সুন্দরী ভদ্রা প্রাঙ্গণ উত্তীর্ণ হয়ে বহির্ঘারের কাছে এসে তরুণ স্বামীর দিকে অপাঙ্গ দৃষ্টিতে চেয়ে বললে, রও, তুমি কখন ফিরবে বলে যাও।
নন্দকে অত্যন্ত অনিচ্ছায় যেতে হচ্ছে গৃহ ছেড়ে। তিনি যেতে আদৌ ইচ্ছুক নন। নবপরিণীতা সুন্দরী বধূ প্রাসাদ-অলিন্দে আলুলায়িত-কুন্তল অবস্থায় দণ্ডায়মানা, শাক্যবংশের প্রাসাদ একাই যেন আলো করেছে এই প্রভাতকালে, নবোদিত সূর্যের আলো ম্লান হয়েছে না ওর মুখের সপ্রেম চাহনির
-
আমার স্ত্রী আমাকে কেবলই খোঁচাইতেছিলেন।
পূর্ববঙ্গে বাড়ি। এই সময় জমি না-কিনিলে পশ্চিমবঙ্গে ইহার পরে আর জমি পাওয়া যাইবে কি? কলিকাতায় জমি ও বাড়ি করিবার পয়সা আমাদের হাতে নাই, কিন্তু পনেরোই আগস্টের পরে কলিকাতার কাছেই বা কোথায় জমি মিলিবে? যা করিবার এইবেলা করিতে হয়।
সুতরাং চারিদিকে জমি দেখিয়া বেড়াই। দমদম, ইছাপুর, কাশীপুর, খড়দহ, ঢাকুরিয়া ইত্যাদি স্থানে। রোজ কাগজে দেখিতেছিলাম জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। পূর্ববঙ্গ হইতে যেসব হিন্দুরা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া চলিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদের অসহায় ও উদভ্রান্ত অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিতে বাড়ি ও জমির মালিকেরা একটুও বিলম্ব করেন নাই। এক বৎসর আগে যে জমি পঞ্চাশ টাকা বিঘা দরেও বিক্রয় হইত না, সেইসব পাড়াগাঁয়ের জমির
-
সন্ধ্যার সময় কেশব গাঙ্গুলীর ভীষণ ঝগড়া হয়ে গেল দুই কন্যা ও স্ত্রীর সঙ্গে। কন্যা দুটিও মায়ের দিকে চিরকাল। এদের কাছ থেকে কখনো শ্রদ্ধা ভালোবাসা পাননি কেশব।
শুধু এনে দাও বাজার থেকে, এই আক্রা চাল মাথায় করে আনো দেড়কোশ দূরের বাজার থেকে। তেল আনো, নুন আনো, কাঠ আনো—এই শুধু ওদের মুখের বুলি। কখনো একটা ভালো কথা শুনেছেন ওদের মুখ থেকে?
ব্যাপারটা সেদিন দাঁড়াল এইরকম।
সন্ধ্যার আগে কেশব গাঙ্গুলী হাট করে আনলেন। তাঁর বয়েস বাহাত্তর বছর, চলতে আজকাল যেন পা কাঁপে—আগের মতো শক্তি নেই আর শরীরে। আড়াই টাকা করে চালের কাঠা। দু-কাঠা চাল কিনে, আর তা ছাড়া তরিতরকারি কিনে ভীষণ কর্দমময় পিছল
-
সকালবেলা পাঁচুদাসী বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।
সারাদিন নৌকো বেয়েছে মাঝি, সন্ধ্যায় বনগাঁ ইস্টিশানে এসে পৌঁছায়। কতদূরে যেতে হবে তা সে জানত না। কত জলকচুরির দামের ওপর পানকৌড়ি বসে থাকা, ঝিরঝিরে-হাওয়ায়-দোলা বাঁশবনের তলা দিয়ে দিয়ে নৌকো বেয়ে আসা; জলকচুরির নীল ফুলের শোভায় গলুসি-বদ্দিপুরের চর আলো করে রেখেছে; কত বন্যে-বুড়োর গাছে গাছে ঠাণ্ডা নদীজলের আমেজে বকের দল, পানকৌড়ির দল বসে ঠিক যেন ঝিমুচ্চে।
পাঁচুদাসীর স্বামী উদ্ধব দাস বেশ জোয়ান-মদ্দ লোক। বৈষ্ণব কবিতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ওর—শক্ত হাত-পা, এই লম্বা এই চওড়া বুক, এই হাতের গুলি, এই বাবরি চুল। জাতে কাপালী, বন-জঙ্গল উড়িয়ে তরিতরকারির আবাদ করে সোনা ফলায়। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ওরা এসে
-
হাবু— নাপিতের ছেলে, সুতরাং রীতিমতো তার বুদ্ধি।
পায়রাগাছির গুণিন রোজা (ওঝা) এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ, সে নাকি মন্ত্রবলে সাপ হতে পারে, বাঘ হতে পারে, কী না-হতে পারে! লোহার সিন্দুকে কিংবা বাড়িতে বড়ো বড়ো হবসের-চবসের কুলুপ লাগানো আছে— পায়রাগাছির রোজা এসে কী একটা মন্তর বিড়-বিড় করে বলে দু-বার তালা ঝম-ঝম করে নাড়লে, আর তালা সব গেল বেমালুম খুলে। এ কত লোকের স্বচক্ষে দেখা। রায়েদের কলম আমবাগানে বিকাল বেলা কেউ কেউ নাকি দেখেছে, রোজা কলমের আম পাড়ছে; হয়তো লোকে ধরতে গিয়ে দেখলে— একটা খরগোশ লাফাতে লাফাতে বাগানের উত্তর দিকের বেড়া ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল।
পায়রাগাছির রোজার মস্ত বড়ো নাম।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— এত বড়ো
-
ভৈরব চক্রবর্তীর মুখে এই গল্পটি শোনা। অনেকদিন আগেকার কথা। বোয়ালে-কদরপুর (খুলনা) হাই স্কুলে আমি তখন শিক্ষক। নতুন, কলেজ থেকে বার হয়ে সেখানে গিয়েছি।
ভৈরব চক্রবর্তী ওই গ্রামের একজন নিষ্ঠাবান সেকেলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। সকলেই শ্রদ্ধা করত, মানত। এক প্রহর ধরে জপ আহ্নিক করতেন, শূদ্রযাজক ব্রাহ্মণের জল স্পর্শ করতেন না, মাসে একবার বিরজা হোম করতেন, টিকিতে ফুল বাঁধা থাকত দুপুরের পরে। স্বপাক ছাড়া কারও বাড়িতে কখনো খেতেন না। শিষ্য করতে নারাজ ছিলেন, বলতেন শিষ্যদের কাছে পয়সা নিয়ে খাওয়া খাঁটি ব্রাহ্মণের পক্ষে মহাপাপ। আর একটি কথা, ভৈরব চক্রবর্তী ভালো সংস্কৃত জানতেন, কিন্তু কোনো ইস্কুলে পণ্ডিতি করেননি। টোল করাও পছন্দ করতেন না। ওতে নাকি
-
জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে সার্ভে হইতেছিল। কাছারি হইতে তিন ক্রোশ দূরে বোমাইবুরুর জঙ্গলে আমাদের এক আমিন রামচন্দ্র সিং এই উপলক্ষ্যে কিছুদিন ধরিয়া আছে। সকালে খবর পাওয়া গেল রামচন্দ্র সিং হঠাৎ আজ দিন দুই-তিন হইল পাগল হইয়া গিয়াছে।
শুনিয়া তখনই লোকজন লইয়া সেখানে গিয়া পৌঁছিলাম। বোমাইবুরুর জঙ্গল খুব নিবিড় নয়, খুব ফাঁকা উঁচু-নীচু প্রান্তরের মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো গাছ, ডাল হইতে সরু দড়ির মতো লতা ঝুলিতেছে, যেন জাহাজের উঁচু মাস্তুলের সঙ্গে দড়াদড়ি বাঁধা। বোমাইবুরুর জঙ্গল সম্পূর্ণরূপে লোকবসতিশূন্য।
গাছপালার নিবিড়তা হইতে দূরে ফাঁকা মাঠের মধ্যে কাশে-ছাওয়া ছোট্ট দু-খানা কুঁড়ে। একখানা একটু বড়ো, এ-খানাতে রামচন্দ্র আমিন থাকে, পাশের ছোটোখানায় তার পেয়াদা আসরফি টিন্ডেল থাকে।
-
গ্রামের মধ্যে বাবা ছিলেন মাতব্বর।
আমাদের মস্ত বড়ো চণ্ডীমণ্ডপে সকালবেলা কত লোক আসত—কেউ মামলা মেটাতে, কেউ কারো নামে নালিশ করতে, কেউ শুধু তামাক খেতে খোশগল্প করতে। হিন্দু-মুসলমান দুই-ই। উৎপীড়িত লোকে আসত আশ্রয় খুঁজতে।
আমরা বসে বসে পড়ি হীরুঠাকুরের কাছে। হীরুঠাকুর আমাদের বাড়ি থাকে খায়। পাগল-মতো বামুন, বড্ড বকে—আর কেবল বলবে—ও নেড়া, একটু কুলচুর নিয়ে এসো তো বাড়ির মধ্যে থেকে। আমার মাসতুতো ভাই বিধু বলত— কুলচুর কোথায় পাব পণ্ডিতমশাই, ঠাকমা বকে। হীরুঠাকুর বলে—যখন কেউ থাকবে না ঘরে, তখন নিয়ে আসবি।
আমাদের গোমস্তা বদ্যিনাথ রায় কানে খাকের কলম গুজে চণ্ডীমণ্ডপের রোয়াকের পশ্চিম কোণে প্রজাপত্তর নিয়ে বসে বাকি-বকেয়া খাজনার হিসেব করত। সবাই বলত
-
আমাদের বাসা ছিল হরিবাবুর খোলার বাড়ির একটা ঘরে। অনেকগুলো পরিবার একসঙ্গে বাড়িটাতে বাস করত। এক ঘরে একজন চুড়িওয়ালা ও তার স্ত্রী বাস করত। চুড়িওয়ালার নাম ছিল কেশব। আমি তাকে ‘কেশবকাকা’ বলে ডাকতাম।
সকালে যখন কলে জল আসত, তখন সবাই মিলে ঘড়া কলসি টিন বালতি নিয়ে গিয়ে হাজির হত কলতলায় এবং ভাড়াটেদের মধ্যে ঝগড়া বকুনি শুরু হত জল ভরতির ব্যাপার নিয়ে।
বাবা বলতেন মাকে, এ বাসায় আর থাকা চলে না। ইতর লোকের মতো কাণ্ড এদের! এখান থেকে উঠে যাব শিগগির।
কিন্তু যাওয়া হত না কেন, তা আমি বলতে পারব না। এখন মনে হয় আমরা গরিব বলে, বাবার হাতে পয়সা ছিল না
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.





















