১–১
ননী ভৌমিক
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
See more >>-
সে অনেককাল আগের কথা, ভয়ংকর এক নাগ হানা দিতে লাগল এক বসতিতে। সবাইকে সে খেয়ে উজাড় করল, রইল শুধু এক বুড়ো।
নাগ ঠিক করল, ‘তা এটাকে কাল খাওয়া যাবে।’
এইসময় কাঙাল এক ছোকরা যাচ্ছিল বসতি দিয়ে। গিয়ে তো উঠল সেই বুড়োর কাছে, রাত কাটাতে চাইল সেখানে।
বুড়ো শুধায়, ‘জীবনে তোর ঘেন্না ধরে গেল নাকি?
‘কেন?’ বলে সেই কাঙাল ছোকরা।
বুড়ো তখন তাকে বলতে লাগল যে নাগ সেখানকার সবাইকে খেয়ে উজাড় করেছে, কাল তাকে খাবার কথা ভাবছে।
ছোকরা বললে, ‘ও কিছু, না, নিজেই গলায় ঠেকে মরবে।’
সকালে তো উড়ে এল নাগ, ছোকরাকে দেখে ভারি তার আনন্দ : “মন্দ নয় তো! ছিল
-
থাকত এক বুড়ো আর বুড়ি। তাদের তিন ছেলে: দুুজন বুদ্ধিমান, একজন বোকা। বুদ্ধিমানদের ভালোবাসত বুড়োবুড়ি। হপ্তায় হপ্তায় বুড়ি কামিজ দেয় বুদ্ধিমানদের, আর বোকাটাকে নিয়ে হাসাহাসি করে সবাই, বকাবকি করে। চুল্লির ওপরকার মাচায় সে বসে থাকে খাদি কাপড়ের কামিজ গায়ে; বুড়ি খেতে দিলে খায়, না দিলে উপোসেই কাটায়।
একদিন গাঁয়ে খবর এল: রাজা তার মেয়ের বিয়ে দেবে, গোটা রাজ্যের লোককে ডাকবে নেমন্তন্নে। আর মেয়েকে রাজা সম্প্রদান করবে তাকে, যে উড়ন্ত জাহাজ বানিয়ে তাতে করে উড়ে আসবে।
বুদ্ধিমান ভাইয়েরা গেল বনে।
গাছ কেটে ভাবতে লাগল উড়ন্ত জাহাজ বানাতে পারলে হয়।
তাদের কাছে এল এক থুথুরে বুড়ো: ‘ভগবান মঙ্গল করুন তোমাদের! দাও বাছা
-
একবার বুখারার চোর ধরতে গিয়ে ধরা হল একজন নিরপরাধী লোককে।
‘ফাঁসি দাও এই চোরটাকে।’ বলল বাদশাহ।
‘হায়! এখন আর কেউ সে কাজ করতে পারবে না, যা আমি পারি!’ বলে উঠল লোকটা।
‘কিসের কথা বলছিস তুই। কি করতে পারিস তুই?’ জিজ্ঞাসা করা হল তাকে।
‘আমি সোনার চাষ করতে পারি।’ বলল লোকটা।
ফাঁসি স্থগিত রেখে ছুটল সবাই বাদশাহর কাছে।
‘হুজুর, যে লোকটাকে ফাঁসি দেওয়ার আদেশ হয়েছে, সে সোনার চাষ করতে জানে।’ বাদশাহ লোকটাকে নিয়ে আসতে আদেশ দিল।
‘যদি তুই সোনার চাষ করতে জানিস তো সোনাচাষ কর আমার জন্য, তার বদলে তোর জীবন ফিরিয়ে দেব আমি।’ বলল বাদশাহ।
রাজি হল লোকটি। জমিতে লাঙল
-
শির্দাক আর ইয়ার্তিগুলাক
যদি তুই হোস ওস্তাদ,
চুরি চামারিতে চালাক,
জানিস, ইয়ার্তিগুলাক
আসবেই খেতে দাওয়াদ।
ইয়ার্তিগুলাকের এই গানটা গাইছিল ইয়ার্তিগুলাক নিজেই। তার মেজাজ আজ শরিফ। তার মানে, কোনো একটা শয়তানকে শিক্ষা দিয়েছে।
ইয়ার্তিগুলাক যাচ্ছিল গেয়ো পথ ধরে আর তার গান শোনাচ্ছিল পাখির ডাকের মতো।
হঠাৎ সে চুপ করে গেল। রাস্তার ধারে ঢিপির ওপর দাঁড়িয়েছিল তার চেয়ে আধমাথা খাটো একটি মানুষ।
‘সেলাম!’ ছোটো মানুষটিকে দেখে অবাক হয়ে বললে ইয়ার্তিগুলাক।
‘সেলাম।’
‘শোনো দোস্ত! আমি হলাম ইয়ার্তিগুলাক, কিন্তু তুমি কে?’
‘আমার নাম শির্দাক,’ বললে ছোটো মানুষটি।
‘তার মানে তুমি সুতির চুড়ো টুপি?’
‘তাই বটি।’
‘তা যাচ্ছ কোথায়?’
‘ছাগল বেচতে।’
‘কিন্তু ছাগল কই?’
“একজন
-
‘দুই পপলার’ কুয়ো
আমরা যাচ্ছি কারাকুম মরুভূমিতে। আমাকে সঙ্গে নিয়েছেন কুলি চাচা। তিনি মেষপালক।
আগে রাখালেরা ভেড়ার পাল নিয়ে চলে যেত বহু মাসের জন্যে। কিন্তু এখন মোটর গাড়ি অনেক, রাখালদের বদলি আসে দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর। আমরাও বদলিতে চলেছি। লম্বা রাস্তা, যাব ‘দুই পপলার’ নামে একটা কুয়োর কাছে। লোকেদের মতো মরুভূমির সমস্ত কুয়োরই এক-একটা নাম আছে। এ কুয়োটার কাছে আছে দুটো পপলার গাছ। গোটা মরুভূমিটার মাঝখানে দুটো পপলার, সমস্ত রাখাল তাদের জানে। রাখালদের ডেরায় আমার অপেক্ষায় আছেন দাদু চারি-আগা। ভেড়ার পাল নিয়ে সারা জীবন তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন মরুভূমিতে। বসন্ত শুরু হতেই তিনি চলে যান ‘দুই পপলারে’, থাকেন বেশ শীত পড়া
-
কিজিল-আয়িয়াক
আকাশের তলে যত পাহাড়ে গাঁ আছে, আমার জন্মের জায়গাটা তার মধ্যে সবচেয়ে সেরা, সবচেয়ে সুন্দর। আমাদের গাঁ কথা বলে, সবচেয়ে মিষ্টি আমুদরিয়া নদীর গানে। জীবনে শুধু একবার, এক ঢোক তার জল খেলে, সে স্বাদ কখনো ভোলা যাবে না।
আজো পর্যন্ত রোজ সকালে গাঁয়ের চারপাশে দেখা যাবে খরগোশ, সজারু, শেয়াল, হিংস্র শৃগালের নখরের দাগ। সে কী বলব!
ছেলেবেলায় আমার ধারণা ছিল না কিজিল-আয়িয়াক জিনিসটা কী। হয়ত তার জন্যে দায়ী আমার আত্মীয়স্বজনেরা। আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসে তারা সবসময় আমায় খেপাত: ‘কই, দেখা তো তোর পা। তুই যখন কিজিল-আয়িয়াকের ছেলে, তখন তোর পা হওয়ার কথা সোনার।’
তুর্কমেন ভাষায় ‘কিজিল’ মানে লাল, তবে
-
বন্ধুরা ওকে বলত জরদ্গব। তার ঢিলে-ঢালা, জবুথুবু, ভ্যাবাচ্যাকা স্বভাবের জন্যে। ক্লাসে কোনো সাপ্তাহিক পরীক্ষার সময় কখনোই ওর সময়ে কুলাত না, প্রশ্নটা মাথায় ঢুকতে ঢুকতে ঘন্টা পড়ে যেত। চা খেতে বসলে তার টেবিল পিরিচের চারপাশে জমত চায়ের ডোবা। চলত এদিক-ওদিক হেলে দুলে, নির্ঘাৎ ধাক্কা খেত টেবিলের কানায়, নয়ত উল্টে পড়ত চেয়ার। নতুন জুতো হপ্তার মধ্যেই এমন তুবড়ে যেত যেন ওই পরে সে সেনাপতি সুভোরভের সঙ্গে আল্প্স্ পর্বত পেরিয়েছে। মুখের ভাব ঢুলুঢুলু, যেন এইমাত্র ঘুম ভাঙল, নয়ত এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। সবকিছুই ওর খসে পড়ত হাত থেকে, কিছুই উৎরাত না। এক কথায় জরদ্গব।
গায়ে আঁট হয়ে বসত কোট, প্যান্টে পা ঢুকত কোনোক্রমে। মুটকো
-
মানুষের স্বভাবই এই যে গ্রীষ্মে তার মন কেমন করে নীলাম তুষার-কণা আর শাসির্তে বরফের নক্সার জন্যে। আবার শীতে তার চাই তপ্ত সূর্য, পল্লবের সবুজ খস-খস, বিলবেরির গন্ধ।
যাচ্ছিলাম আমি গভীর মুড়মুড়ে তুষারের ওপর দিয়ে আর ভাবছিলাম গ্রীষ্মের কথা। অনাড়ম্বর রুশী গ্রীষ্ম নয়, দক্ষিণী গ্রীষ্ম—জ¦লজ¦লে ফুলের গন্ধে যা চনমনে, পাথর যেখানে আতপ্ত, গরমে-সমুদ্র যেখানে অলস, নিস্তেজ। ভাবতে ভাবতে আমার নিজেরই কেমন গরম ঠেকল, ওভারকোটের বোতাম খুলে ফেললাম, টুপিটা সরিয়ে দিলাম কপাল থেকে। তুষার-কণা হয়ে দাঁড়াল ঝুরঝুরে চকমকি বালি, ফর গাছ উঠে দাঁড়াল সাইপ্রাস গাছ হয়ে, পাইনের ডাল নড়ে উঠল পাম গাছের সবুজ পাখার মতো।
এই সময়েই শাদা তুষার স্তূপের ওপর দেখলাম
-
লকড়ি-গুদামটায় উঠে উর্সের কাছে ঘেঁষবে এমন কোনো ছেলের কথা আমি শুনিনি। কিন্তু একটি মেয়ের কথা জানি, কেট—সে এটা পারে। উর্সকে সে ভয় পায় না। কাঁটা-তারের তল দিয়ে সে ঢোকে, উর্স কিন্তু খেঁকিয়ে আসে না, ডাকে না ভাঙা-ভাঙা গলায়, কামড়ে ছেঁড়ে না তার ফ্রক। দু’জনের মধ্যে বেশ ভাব—রোগা সরু ঠেঙে কেট আর দক্ষিণ রাশিয়ার পাহারাদার কুকুর উর্স।
ছেলেপিলেরা বলে, কেট কী একটা মন্ত্র জানে। সেটা বাজে কথা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাতে নাক কুঁচকে ওঠে তার কেউ মিথ্যে কথা বললে সে বরাবরই নাক কোঁচকায়।
উর্স দেখতে প্রকাণ্ড। গায়ের লোম তার ঝুলে ঝুলে থাকে নোলকের মতো। কপালের নোলকগুলো পড়ে চোখর ওপর। চোখের
-
আফ্রিকাতেও কিরণ দেয় আমাদের এই একই সূর্য। কিন্তু সূর্য সেখানে মাটির অনেক কাছে, তাই রোদ হয় কাঠ-ফাটা। আর সিংহ ভাবে সূর্য বোধ হয় দুটো: একটা গরম, একটা ঠাণ্ডা।
সিংহ থাকে খাঁচায়। যেন লাইন-টানা কাগজের ওপর আঁকা। আঁকা হয়েছে হলুদ-বাদামী রঙে। সিংহের আধখানায় ঘন, লম্বা লম্বা চুল, অন্য আধখানা রোগা, লোম-ছাঁটা, মসৃণ। হয়ত আধখানায় তার সর্বদাই গরম লাগে, অন্য আধখানায় ঠাণ্ডা।
খাঁচায় থাকলে শুধু এক জায়গাতেই থাকতে হয়, কিছুই ভালো করে দেখা হয় না। যেমন, শুঁড়-ওয়ালা একটা মাথা দেখতে পায় সিংহ, কুলো-পানা তার কান। কিন্তু মাথার ওই মালিকটির পা কটা, তা সে জানে না। নাকি তিমি মাছের মতো লেজ নেড়ে সে
-
মার্চ মাসের রোদ-ঢালা দিনে শহরের কার্নিস-পাইপের ঝুলন্ত বরফ গলতে শুরু করে। রুগ্ণ্ শীতার্ত মাটিকে তারা ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ খাওয়ায়।
স্কেট্স্ নিয়ে একটি ছেলে হেঁটে যাচ্ছে।
ছেলেটা রোগা, ঢ্যাঙা। কিছুই ওর মাপসই নয়। সবই ছোটো। স্কী করার ট্রাউজার গোড়ালি অবধি। ওভারকোট কোনোক্রমে হাঁটু পর্যন্ত। হাত পকেটে ঢোকানো, কিন্তু কব্জিটা আঢাকা, হাওয়ায় লাল হয়ে উঠেছে: আস্তিনটা খাটো। গলাটাও তার লম্বা, রোগা। মাফলারে তা ঢাকা পড়েছে মাত্র আধখানা। ডোরাকাটা সবুজ রঙের মাফলার, আর তার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জায়গাটিতেই বেগুনী কালির দাগ।
মনে হবে যেন গতকাল তার পোষাক সবই মাপসই ছিল, কিন্তু রাতারাতি খুবই বেড়ে উঠেছে, নতুন পোষাক কেনার সময় পায় নি।
হাত
ক্যাটাগরি
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.




