আমার বোলতাটি

আমার গোলাঘরে বাসা নিয়েছে এক বোলতা। কাছ দিয়ে গেলেই কানে আসে গাঢ় ভন-ভন আর হালকা আওয়াজ। মনে হবে যেন বোলতাটা খুব আড্ডাবাজ, একদল ইয়ার-বোলতা নিয়ে ফুর্তি লুটছে। আসলে মোটেই কোনো ইয়ার-দল ইে। নেহাৎ গরম দিনটার পর বোলতা তার ছোট্ট ফ্যানটা খুলে দিয়ে বাড়িটায় হাওয়া খেলায়। আর তার ক্ষিপ্র-চলা পাখা থেকে উঠে অবিরাম এক জমজমে গুঞ্জন: জজজ-জজজ-জজজ!

দেখা গেল বোলতাটা খুবই মার্জিত রুচির বাসিন্দা: আমার পায়ের শব্দ শোনামাত্র সে তার ফ্যান বন্ধ করে দেয়, যাতে ওর শব্দে আমার অসুবিধা না হয়। ঘরে হাওয়া খেলাতে মুরু করে কেবল আমি চলে যাবার পরে। সাধারণতই সে আমার চোখে না পড়ার চেষ্টা করে। তাই বোলতাটা দেখতে কেমন সেটা কল্পনা করার জন্যে আমায় স্মৃতি ঘাঁটতে হয়।

ছেলেবেলায় আমার এক বন্ধু ছিল—ফেলিয়া। নানা ধরণের গুবরে, ফড়িং ভোমরা সংগ্রহ করা ছিল তার শখ। বোলতাও ছিল তার সংগ্রহে। বড়ো একটা বিচির মতো দেখতে, বাঘের মতো ডোরাকাটা, ঢিপ-ঢিপ চোখ-ওয়ালা কালচে মাথা। বোতলের ছিপিতে ওটা গাঁথা ছিল পিন দিয়ে; তলে লেখা: ‘বোলতা—মাটিবাসী মৌমাছি’।

ওর বইয়ের ব্যাগটা খসিয়ে নিই। ফেলিয়া আমায় চিমটি কাটে। আমি তাকে তখন ধাক্কা দিই। ফেলিয়ে গিয়ে ঠোকর খায় দেয়ালে আর আমার দাঁড়াতে হয় মাস্টারদের ঘরে।

‘তুই মেরেছিস ওকে?’ জিজ্ঞেস করলেন ইতিহাসের শিক্ষিকা রিমা ইলনিচনা, দেখতে ছোটোখাটো, তড়বড়ে।

আমি চুপ করে রইলাম।

‘তুই মেরেছিস ওকে?’ ফের জিজ্ঞেস করলেন, জোর দিলেন ‘মেরেছিস কথাটায়।

‘ধাক্কা দিয়েছি, ’ অস্ফুটে বললাম আমি।

‘আর তুই জানিস যে ও রুগ্ণ?’

সেটা জানতাম না।

‘খেয়াল করিস নি কখনো যে ওর চোখের কোলে কালশিটে?’

আমি ভাবতাম নিশ্চয় কালি লেগে গেছে কেমন করে।

চেয়ার ক্যাঁচকেচিয়ে উঠল। রিমা ইলনিচনা উঠে দাঁড়ালেন।

‘এর ফল কী হতে পারে তা জানিস?’ আমার কাছে এসে চোখ বড়ো বড়ো করলেন তিনি, ‘যে-কোনো মুহূর্তে ও মারা যেতে পারে। তুই ধাক্কা দিলে, ও ওদিকে মরে গেল।’

দিশেহারা হয়ে উঠলাম আমি।

‘আমি শুধু একবার ... ধাক্কা দিয়েছি।’

‘একবারেই যথেষ্ট।’

আমার একেবারে হয়ে এল। ভয় লাগল আমার। মনশ্চক্ষে ফেলিয়াকে দেখলাম... মরা। কফিনে। পরনে ইশকুলের উর্দি। পায়ে নোংরা তোবড়ানো জুতো। পেটের ওপর বইয়ের ব্যাগ...

করিডরে ফিরে প্রথমেই ছুটলাম ফেলিয়ার সন্ধানে। বেঁচে আছে! জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সসেজের স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। ফাঁড়া কাটল।

ফেলিয়ার মুখখানা রোগা, লম্বাটে, লাল-লাল কান। এমন কান যেন তৈরিই হয় কেবল চশার আংটা ধারণের জন্যে। আর চশমায় তার মোটা-মোটা কাঁচ, তার ভেতর দিয়ে চোখ ঠাহরই হয় না। টলমল করে চোখ। পরিণত হয় দুটো ধূসর রঙের মাছে, ভেসে বেড়ায় যেন গোল-গোল অ্যাকুয়ারিয়মে। সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেই চক্ষু-রূপী মাছ কোথায় পালিয়ে যায়... এই ধরণের চোখে জিনিগুলো বড়ো দেখায় না, ছোট হয়ে যায়। সবকিছু বড়োই দেখায় ছোটো-ছোটো।

শিক্ষিকার সঙ্গে ওই আলাপটার পর থেকে আমি ফেলিয়াকে ভয় পেতাম। ভয় পেতাম যেন একটা চীনেমাটির ফুলদানি, এই বুঝি হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে চুর-চুর হয়ে যাবে। ওভারকোট রাখার ঘরে যখন হুড়োহুড়ি বাধত, আমি তখন ওকে আড়াল করার চেষ্টা করতাম, বাঁচাতাম মৃত্যুর বিপদ থেকে।

ক্রমশ ক্লাসে ওর অবস্থা দাঁড়াল আলাদা রকমের, বৈঠক দিতাম, মইয়ে চাপতাম, ও তখন ওভারকোট রাখার ঘরে বসে মোটা-মোটা বই পড়ত।

ওর ছিল সাতখুন মাপ। ইশকুর কামাই করলে কেউ জিজ্ঞেসও করত না, কেন। সাংঘাতিক অসুখটাই যে তার কারণ সেটা সবাই জানত।

হয়ত ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়াবার ডাক পড়েছে ওর, অথচ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না।

‘জানিস না?’ চুপি-চুপি জিজ্ঞেস করেন শিক্ষায়িত্রী।

ও চুপ করে থাকে।

‘পড়া করিস নি?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice