শোক
সারা গালচিনো জেলায় কুন্দকার মিস্ত্রি গ্রিগরি পেত্রভের নাম ওস্তাদ কারিগর হিসেবে যেমন, পাঁড় মাতাল ও পয়লা নম্বরের হতচ্ছাড়া বলেও তেমনি। সেই পেত্রভ তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে জেমস্তভো হাসপাতালে। ত্রিশ ভেস্ট রাস্তা তাকে ঘোড়ার গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর রাস্তা ভয়াবহ, এমনকি ডাক হরকরাও এই রাস্তার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যায়, কাঁড়ের রাজা কুন্দকার গ্রিগরির কথা ছেড়েই দিচ্ছি। হাড়-কাঁপানো হিমেল বাতাসের ঝাপটা তার মুখে এসে পড়ছে। তুষার পাপড়ির ঘূর্ণীতে চারদিক ছেয়ে গেছে, তুষার আকাশ থেকে পড়ছে না মাটি থেকে উঠে আসছে বোঝা ভার। মাঠ বন টেলিগ্রাফের থাম কিছুই ঠাওর করা যাচ্ছে না। ঝাপটাটা যখন জোর হচ্ছে গ্রিগরি গাড়ির বোমটাও দেখতে পাচ্ছে না। বুড়ী দুর্বল ঘোটকীটা ধুঁকতে ধুঁকতে ঢিকিয়ে চলেছে। গভীর বরফের মধ্যে বসে যাওয়া পা-খানাকে টেনে তুলে একই সঙ্গে মাথাটাকে সামনের দিকে ঠেলে এগিয়ে দিতে তার যেন সব শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। কুন্দকারের ভীষণ তাড়া। সে তার আসনে স্থির থাকতে পারছে না, থেকে থেকে লাফিয়ে উঠছে আর ঘোড়াটার পিঠে প্রায়ই চাবকাচ্ছে।
‘মাত্রিয়োনা, কে'দ না...’ সে বিড়বিড় করে বলছে। 'একটুখানি সহ্য কর। ভগবানের দয়ায় হাসপাতাল এই এসে গেল। এক্ষুনি ওরা তোমায় দেখবে পাভেল ইভানিচ কয়েক ফোঁটা ওষুধ দিয়ে দেবে কিংবা ওদের বলবে কিছু বদরক্ত কেটে বার করে দিতে। হয়ত বা বলবে তোমার গা-টা আচ্ছা করে স্পিরিট দিয়ে মালিস করে দিতে। জানো তো, তাতে পাঁজরার ব্যথাটা কমে। পাভেল ইভানিচের সাধ্যে যা কুলোবে সবই করবে, ভেব না। চিৎকার করে লোকটা বড়ো ভালো, দরাজ পৌঁছবো অমনি হন্তদন্ত হয়ে পা ঠুকবে, তারপর কিছুই বাদ রাখবে না দিল, ভগবান তার ভালো করুন... আমরা যেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেই খোঁকিয়ে উঠবে, "কী চাই, এ্যাঁ?” তারপর চে'চাতে থাকবে। "আরেকটু আগে আসতে কী হয়েছিল? আমাকে কী মনে করিস? একটা কুত্তা? সারাদিন ধরে তোদের মত ভূতদের বেগার খাটব! সকালে আসিসনি কেন? যা, বেরো! কাল আসিস।” আমি তখন বলব, “ডাক্তারবাবু, পাভেল ইভানিচ! হুজুর!” এই ব্যাটা, জলদি চল, জলদি!’
সে ঘোড়টার পিঠে আবার চাবুক কষাল। স্ত্রীর দিকে না তাকিয়ে বিড়বিড় করে সমানে সে বকে চলল। "দেবতার দিব্যি, পবিত্র ক্রুশের দিব্যি, ডাক্তারবাবু, সেই ভোরে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, দেবতা যদি গোঁসা করে এমনি বরফ-ঝড় চালান, কী করে আমি ঠিক সময়ে পৌঁছোই, বলুন? আপনিই ভেবে দেখুন, ডাক্তারবাবু...তাগড়াই ঘোড়াও এই ঝড় ঠেলে আসতে কাহিল হয়ে পড়ত, আর চেয়ে দেখুন আমার ঘোড়ার কী হাল, এটাকে ঘোড়া বলতেও লজ্জা।” পাভেল ইভানিচ তখন ভুরু কুচকিয়ে আমায় ধমক লাগাবে, "তোদের চিনতে আমার বাকি নেই! তোদের যে ওজরের অভাব হয় না, জানি! বিশেষ করে তো তুই, তোকে তো হাড়ে হাড়ে জানি! আসতে আসতে তো বার পাঁচেক ভেটেরাখানায় ঢুকেছিলি।” আমি তখন বলব, "কী যে বলেন, ডাক্তারবাবু, মায়া মমতা জ্ঞানগম্যি কিছুই কি আমার নেই? আমার বুড়ীটা মরতে বসেছে, ধুকছে, আর আমি কিনা ভেটেরাখানায় দৌড়োব? ছি, ছি, ছি, একথা আপনি বললেন কী করে, ডাক্তারবাবু? চুলোয় যাক এখন ভেটেরাখানা!" তারপর পাভেল ইভানিচ তার লোকজনকে হুকুম করবে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আমি তখন তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলব: "ডাক্তারবাবু, হুজুর, আপনি আমাদের কী যে উপকার করলেন! আমাদের, বোকাহাবাদের ক্ষমা করুন। আমাদের ব্যাভারে দোষ নিবেন না। আমরা শুধু মুঝিক। আমাদের এখান থেকে তাড়ানো উচিত, তবু আপনার কত দয়া, এই বরফ-ঝড়ের মধ্যে নিজে আমাদের দেখতে বেরিয়ে এসেছেন।” পাভেল ইভানিচ আমার কথা শুনে এমন কটমট করে তাকাবে, মনে হবে এই বুঝি দু’ঘা বসিয়ে দিল। পরে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments