ভূমিকা

বর্ত্তমান গ্রন্থের ভিত্তি লিওন্টিয়েভের অর্থনীতি ও কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’। অতএব বলা নিষ্প্রয়োজন, এই গ্রন্থ বুর্জোয়া অর্থনীতির পন্থানুসরণে লিখিত হয় নাই। প্রশ্ন হইতে পারে, অর্থনীতি যদি বিজ্ঞানই হয় তবে উহার শ্রেণীবিভাগ কিরূপে সম্ভব?

বুর্জোয়া অর্থনীতি ও মার্ক্সের অর্থনীতির প্রভেদ মূলগত। মার্ক্সের অর্থনীতি বস্তুতন্ত্রবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। বুর্জোয়া পণ্ডিতগণ বলেন, অভাববোধই অর্থনৈতিক জীবনের গোড়ার কথা। মার্ক্স বলেন, অভাববোধ কখনো বস্তুনিরপেক্ষ হইতে পারে না। মোটর গাড়ী আছে বলিয়াই তাহা ব্যবহার করার ইচ্ছা হয়। মার্ক্সের মতে উৎপাদন ও উৎপাদন-ব্যবস্থার বিশ্লেষণই অর্থনীতির প্রাথমিক কর্ত্তব্য।

বুর্জোয়া পণ্ডিতগণের মতে অর্থনীতি সর্বকালের উপযোগী একটিমাত্র শাস্ত্র। ইহারা অর্থনীতির আপেক্ষিকতা ও ঐতিহাসিক দিকটী অস্বীকার করিয়াছেন। বুর্জোয়া পণ্ডিতগণ পুঁজি-সমাজকে স্বাভাবিক, শাশ্বত প্রতিপন্ন করিতে ব্যস্ত। মার্ক্সের বিশ্লেষণ এই ধারণা গঠন করে—পুঁজি-সমাজের সমাজতন্ত্রে রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী। বুর্জোয়া পণ্ডিতগণের যুক্তি ও সিদ্ধান্তের আড়ালে রহিয়াছে তাহাদের শ্রেণীগত স্বার্থ।

প্রশ্ন উঠিতে পারে, বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত; কাজেই বিজ্ঞানে শ্রেণীগত দৃষ্টভঙ্গীর কথা বলা নিছক প্রোপাগ্যাণ্ডা। তথ্য সংগ্রহ, তথ্য নির্বাচন ও তথ্যবিন্যাসে বৈজ্ঞানিক তাঁহার ব্যক্তিগত ও শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা প্রভাবান্বিত হইতে পারেন। অর্থনীতি শুধু থিওরীই নয়, ইহার একটা কার্য্যগত দিকও আছে। বুর্জোয়া অর্থনীতি—পুঁজি-সমাজের সমস্যা, অর্থাৎ মুনাফা কিরূপে বৃদ্ধি করা যায়, মজুরী কিরূপে কমানো যায়—সে-দিকে লক্ষ্য রাখিয়াই তথ্যনির্বাচন ও থিওরী নির্ম্মাণ করিবে। ইংলণ্ডের কথাই ধরা যাক। শ্রেণীসংঘর্ষ যতদিন প্রকট হয় নাই, ততদিন অর্থনীতির পণ্ডিতগণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী কতকটা রক্ষা করিতে পারিয়াছেন। রিকার্ডো শ্রেণীসংঘাত এবং মজুরী ও মুনাফার বিরোধকে তাহার বিচারের মূল উপাদানরূপে গ্রহণ করেন। কিন্তু রিকার্ডোর জীবনকালেই সিসমণ্ডি তাঁহার সিদ্ধান্তগুলিকে আক্রমণ করিলেন। সে সময়ে ইংলণ্ডে আধুনিক শিল্প সবেমাত্র শৈশব অতিক্রম করিয়াছে। হইতে ইংলণ্ডে শ্রেণীসংঘর্য ভয়াবহরূপ ধারণ করে; সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া অর্থনীতির বৈজ্ঞানিক দিকটা খসিয়া পড়িতে থাকে।

ফ্যাক্টরী আইন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে যুক্তি দর্শানোর জন্য কারখানার মালিকেরা সিনিয়রকে নিয়োগ করেন। তাঁহার আবিষ্কৃত ‘Last hour theory’ একান্তই উদ্ভট—মালিকেরা বেশী কিছু নেয় না; শ্রমিকের কাজের শেষ ঘণ্টাটুকুর উৎপাদনই মালিকের প্রাপ্য। এক কথায়, বিজ্ঞানের স্থান দখল করিল বিবেকহীনতা।

১৮৪৮-৪৯-এ ইউরোপময় যে বিপ্লব সংঘটিত হয়, ইংলণ্ডে সহজেই ইহার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়! শ্রমিকের দাবী আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সে-সময়ে শাসকশ্রেণীর মধ্য হইতে আবির্ভাব হয় উদারপন্থী জন ষ্টুয়ার্ট মিলের। তিনি অর্থনীতিকে মালিক শ্রেণীর চাটুকারিতা হইতে উদ্ধার করিতে চেষ্টা করেন। পরস্পরবিরোধী বিষয়ের সমন্বয় ও মিশ খাওয়ানোর চেষ্টাই তাঁহার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য।

বিকৃত অর্থনীতির মূলে সর্ব্বপ্রথম আঘাত করিলেন সর্ব্বহারা শ্রেণীর প্রতিনিধি কার্ল মার্ক্স। তিনি একটী বিশেষ বিচাররীতির প্রয়োগ দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন, সমাজপ্রগতির বিভিন্ন স্তর বিভিন্ন সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইয়া থাকে। অর্থনৈতিক সূত্র সকল যুগের সকল দেশের ও সকল সময়ের জন্য একই প্রকার নয়। প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক যুগই স্বতন্ত্র নিয়মের অধীন! কার্ল মার্ক্স পুঁজিতন্ত্রের পূর্ব্ববর্ত্তী সমাজব্যবস্থা হইতে উহার উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে যেমন আলোচনা করিয়াছেন, তেমনি পুঁজিতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব হইতে যে সমাজতন্ত্রের জন্ম ও বিকাশ হইবে তাহাও দেখাইয়াছেন। কার্ল মার্ক্সের প্রদর্শিত পথ বাস্তবের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ, এই কারণেই ইহা নির্ভুল।

বর্তমান গ্রন্থ মার্ক্সবাদের মূল গ্রন্থগুলি পাঠে সহায়ক ও সোপান স্বরূপ বিবেচিত হইলে শ্রম সার্থক মনে করিব।

রেবতী বর্মণ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice