সাম্রাজ্যবাদ
পুঁজিতন্ত্রের চরম বিকাশ হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। ইহা এক দেশ হইতে অন্য দেশে ছড়াইয়া পড়ে। এই বিকাশ ও বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়িয়া যায়। শিল্পপুঁজিরই (Industrial Capital) সে সময়ে প্রধান স্থান। এক কথায়, এই যুগটিকে বলা যাইতে পারে শিল্প-পুঁজির যুগ। পুঁজিতন্ত্রের এই স্তরটীতেই উদ্ভব হইয়াছে সাম্রাজ্যবাদের। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিতন্ত্রের বিকাশেরই একটী অবস্থা। এই স্তরে পুঁজিতন্ত্রের বিরোধ সুতীব্র হইয়া উঠে। সাম্রাজ্যবাদকে বলা যায় পুঁজিতন্ত্রের বিকাশের সর্বশেষ স্তর। সাম্রাজ্যবাদের যুগেই পুঁজিতান্ত্রিক বিধান সমাজের বিকাশের পথে অন্তরায় হইয়া দাড়ায়।
পুঁজিতন্ত্রে পুঁজি বহু হাতে ছড়ানো থাকে; কিন্তু উহার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শিল্প-পুঁজির সংকেন্দ্রন হয়। প্রতিযোগিতায় ছোট কারখানা বড় কারখানার নিকট পরাভূত হয়। বড় কারখানাগুলির উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য কম; ছোটগুলির উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য বেশী। অতএব বাজারে উহাদের মালের কাট্তি হয় না। অবশেষে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরাজয় স্বীকার করিয়া ছোট বড়’র সঙ্গে মিলিয়া যাইতে বাধ্য হয়। এই ভাবে পুঁজি বিভিন্ন হাত হইতে আসিয়া জড়ো হয় কতিপয়ের হাতে। বিভিন্ন পুঁজির প্রতিযোগিতা বিনষ্ট হইয়া যায় এবং প্রতিযোগিতাবিহীন একচেটিয়া উৎপাদনের (monopoly production) বিকাশ হয়। একচেটিয়া উৎপাদনই সাম্রাজ্যবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাম্রাজ্যবাদের যুগে ব্যাঙ্ক-পুঁজি ও শিল্প-পুঁজি এক হইয়া যায়, তখন আর বিদেশে দ্রব্য রফতানী না করিয়া পাঠানো হয় পুঁজি। শুধু স্বদেশেরই নয়, বিভিন্ন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান একত্র হইয়া আন্তর্জাতিক একচেটিয়া শিল্পের প্রতিষ্ঠা করে। শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি নিজেদের মধ্যে সারা পৃথিবী ভাগ করিয়া লয়।
সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ নির্ণয় করিয়াছেন লেনিন। “সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিতন্ত্রের বিকাশের সেই স্তরটী যে-সময়ে একচেটিয়া উৎপাদন ও ফিনান্স পুঁজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে; যে-সময়ে পুঁজির রফতানী বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করিয়াছে; যে-সময়ে আন্তর্জাতিক ট্রাষ্টগুলির মধ্যে পৃথিবীর বণ্টন শুরু হইয়াছে; যে-সময়ে শ্রেষ্ঠ পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত দেশের বিভাগ সম্পূর্ণ হইয়াছে।”
অন্য এক জায়গায় লেনিন সাম্রাজ্যবাদের পুরা সংজ্ঞা দিয়াছেন। “সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিতন্ত্রের একটি বিশিষ্ট ঐতিহাসিক স্তর। অবাধ প্রতিযোগিতার স্থলে একচেটিয়া উৎপাদনের আবির্ভাব সাম্রাজ্যবাদের মূল অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য অথবা সার বস্তু। একচেটিয়া উৎপাদন পাঁচটি প্রধান রূপ গ্রহণ করে—১। কার্টেল, সিন্ডিকেট ও ট্রাষ্ট; উৎপাদনের সংকেন্দ্রন এমন একটা অবস্থায় আসে যে পুঁজিপতিদের এই সকল সমবায়ের উৎপত্তি হয়; ২। বড় বড় ব্যাঙ্কগুলির একচেটিয়া সংগঠন, তিনটী হইতে পাঁচটী বিরাট ব্যাঙ্ক আমেরিকা, ফ্রান্স ও জার্মানীর অর্থনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করে; ৩। ট্রাষ্ট এবং ব্যাঙ্কারদের দ্বারা কাঁচা মালের দেশগুলি দখল (একচেটিয়া শিল্পপুঁজি ও ব্যাঙ্ক-পুঁজির সংমিশ্রণই ফিনান্স পুঁজি); ৪। আন্তর্জাতিক কার্টেলগুলির মধ্যে পৃথিবীর অর্থনৈতিক বণ্টনের শুরু; ৫। পৃথিবীর উপনিবেশগুলির “পুরাপুরি দখল।”
লেনিন বলেন: সাম্রাজ্যবাদ (১) একচেটিয়া উৎপাদন বিশিষ্ট পুঁজিতন্ত্র; (২) পরগাছা অথবা ক্ষীয়মান পুঁজিতন্ত্র, (৩) মুমূর্ষ পুঁজিতন্ত্র।
আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি, পুঁজিতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ছোট উৎপাদনগুলি ক্রমশ অন্তর্হিত হয়। প্রতিযোগিতার আকারের উৎপাদন-প্রতিষ্ঠানগুলি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলির নিকট হার মানিতে বাধ্য হয়। বৃহদাকার উৎপাদনের জয় হইতেই হয় পুঁজির সংকেন্দ্রন ও একচেটিয়া উৎপাদন। লৌহশিল্পে এখন আর অনেকগুলি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান নাই; এ-সকলের পুঁজি এখন কয়েকজন পুঁজি-পতির হাতে জড়ো হয়। সমগ্র উৎপাদনের উপর ইহাদের একচেটিয়া স্বত্ব; সুতরাং লোহার দাম বাড়াইয়া ইহারা যথেষ্ট মুনাফা অর্জন করিতে সমর্থ হয়। অবশ্য ছোট আকারের উৎপাদন-প্রতিষ্ঠান যে একেবারে অন্তর্হিত হয় তাহা নয়; তবে অর্থনৈতিক কেন্দ্রে ইহাদের কোন প্রভাব থাকে না। একচেটিয়া উৎপাদন-প্রতিষ্ঠানগুলির বিভিন্ন নাম—কার্টেল, সিণ্ডিকেট, ট্রাষ্ট।
অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি পৃথক পৃথক ভাবেই উৎপাদন করে; তবে দ্রব্যের মূল্য সম্পর্কে ইহারা নিজেদের মধ্যে একটা চুক্তি করিয়া লয়। কোন প্রতিষ্ঠানই চুক্তিতে নির্দ্দিষ্ট মূল্যের নীচে দাম কমাইতে পারিবে না। এইরূপ সংগঠনকে বলা হয় কার্টেল। সিণ্ডিকেটরূপ সংগঠনে পৃথক পৃথক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা একটু কম। কাঁচা মাল ক্রয় এবং পাকা মাল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments