এক ঝুড়ি ফার ফল
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
সেই শরতে সুরকার এদভার্দ গ্রিগ বের্গেন-এর কাছের অরণ্যময় অঞ্চলে ছিলেন।
পাতার মর্মর আর ব্যাঙের ছাতার তীব্র গন্ধময় সমস্ত অরণ্যগুলি ভারি চমৎকার; কিন্তু যে অরণ্যগুলি সমুদ্রের পাশের পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে সেগুলির সৌন্দর্য এক বিশেষ ধরনের। ঢেউয়ের মর্মর ধ্বনি সেখানে হয় প্রতিধ্বনিত, সমুদ্র-কুয়াশা জড়িয়ে থাকে তাদের গাছগুলিকে আর ভিজে বাতাসে বেঁচে থাকা সবুজ শ্যাওলা গাছের ডাল থেকে মাটি পর্যন্ত দাড়ির মতো থাকে ঝুলে।
এই সব অরণ্যে আছে এক ধরনের আনন্দিত প্ৰতিধ্বনি, শব্দানুকারী গায়ক পাখীর মত, যে কোনো শব্দকে ধরতে আর সেগুলোকে পাহাড়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পাঠাতে সর্বদাই উৎসুক।
এই ধরনের এক অরণ্যে গ্রিগ-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ছোট্ট এক মেয়ের। তার পিঠের উপর দুলছে দুটি বিনুনি আর হাতে রয়েছে একটা ঝুড়ি। সে ফার-ফল কুড়োচ্ছিল।
শরৎ এসে গেছে। যদি কেউ পৃথিবীর সমস্ত সোনা আর তাঁবাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট পাতায় রূপান্তরিত করে, তবু সেগুলো পাহাড়ের শারদীয় পোষাকের কাছে হবে নগণ্য এক অংশ মাত্র। আর যতই কেন না সেগুলো সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত হোক, প্রকৃতির শিল্প-কাজের পাশে সেগুলোকে দেখাবে অমার্জিত, বিশেষ করে এ্যাসপেন পাতাগুলো—যেগুলো পাখীর ডাকে কেঁপে ওঠে।
গ্রিগ প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নাম কী, ছোট্ট মেয়েটি?’
‘দ্যাগনি পেদারসেন,’ উত্তর এলো এমন এক স্বরে যেটি ভয়ের চেয়ে লজ্জার দরুণই মৃদু, তার ভয় পাবার কথা নয়, কারণ গ্রিগ-এর চোখগুলি খুসিতে ঝলমল করছিল।
গ্রিগ বললেন, ‘কী লজ্জার কথা, আমার কাছে তোমার জন্যে ছোট্ট কোনো উপহারও নেই—না একটা ফিতে, না একটা পুতুল, এমন কি একটা মখমলের খরগোশও নেই আমার কাছে।’
মেয়েটি তাঁকে বললো, ‘বাড়ীতে আমার একটা পুরোনো পুতুল আছে। সেটা ছিল মার। এই রকম করে সেটা চোখ বুজতো।’
মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। যখন সে চোখ দুটি খুললো গ্রিগ লক্ষ্য করলেন যে সেগুলির রঙ সবুজ ধরনের আর সেগুলি ঝকঝক করছে অরণ্যের পাতার সোনালি রঙে।
ব্যথিত কণ্ঠে মেয়েটি বলে চললো, ‘এখন সে ঘুমোয় চোখ খুলে। বুড়োরা ভালো করে ঘুমোতে পারে না। আমার দাদুর কথাটাই ধরুন না কেন—সমস্ত রাত ধরে তিনি উঃ আঃ করেন।’
গ্রিগ বললেন, ‘জানো দ্যাগনি আমার একটা কথা মনে হয়েছে। তোমাকে আমি একটা খুব ভালো উপহার দেবো এখন নয়, কিন্তু দশ বছরের মধ্যে।’
হতাশ হয়ে নিজের হাত দুটো চেপে ধরে দ্যাগনি বললো, ‘ওঃ, সে তো অনেক অনেক দিন পরের কথা।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো আমায় বানাতে হবে।’
‘আর সে জিনিসটা কী?’
‘সময় এলেই জানতে পারবে।’
‘দশ বছরই লাগবে কি? সমস্ত জীবন ধরে আপনি পাঁচ-ছ’টার বেশী খেলনা বানাতে পারেন না?’ মেয়েটির স্বরে ভর্ৎসনার সুর।
উত্তরে অনিশ্চিতভাবে তিনি বললেন, ‘এটা সে ব্যাপার নয়। এটা তৈরী করতে হয়তো মাত্র কয়েকটি দিন লাগবে। কিন্তু এটা ছোট ছেলেমেয়েদের দেবার মতো জিনিস নয়। আমার উপহারগুলো শুধু বড়দের জন্যে।’
তাঁর জামার হাতা ধরে অনুনয়ের সুরে দ্যাগনি বললো, ‘সত্যি বলছি আমি ভেঙে ফেলবো না। দাদুর একটা কাঁচের ছোট নৌকো আছে। সেটার ধূলো আমি ঝাড়ি আর কখনো সেটা থেকে ছোট্ট একটা কণাও ভাঙিনি।’
‘এই দ্যাগনি মেয়েটা সত্যিই আমাকে মুশকিলে ফেলেছে,’ মনে মনে ভাবলেন গ্রিগ। আর সাধারণত বড়রা এ ধরনের অবস্থায় যে কথাগুলো বলেন তিনিও তাই বললেন, ‘এখনো তুমি ছোট্ট মেয়ে আর এমন অনেক জিনিস আছে যেগুলো তুমি বুঝতে পারো না। ধৈর্য ধরতে শেখো। তোমার ঝুড়িটা বরং আমাকে দাও, তোমার পক্ষে ওটা খুব ভারি। তোমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমি তোমাদের বাড়ী যাবো আর আমরা অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করবো।'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments