বদন চৌধুরীর শোকসভা
বদনচন্দ্র চৌধুরী একজন নবাগত নারকী, সম্প্রতি রৌরবে ভরতি হয়েছেন। যমরাজ আজ নরক পরিদর্শন করে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে দেখে বদন হাত জোড় করে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন।
যম বললেন, কি চাই তোমার?
—আজ্ঞে, দু ঘণ্টার জন্যে ছুটি।
—কবে এসেছ এখানে?
—আজ এক মাস হল।
—এর মধ্যেই ছুটি কেন? ছুটি নিয়ে কি করবে?
—আজ্ঞে, একবার মর্ত্যলোকে যেতে চাই। আজ বিকেলে পাঁচটার সময় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আমার জন্যে শোকসভা হবে, বড্ড ইচ্ছে করছে একবার দেখে আসি।
যমালয়ের নিবন্ধক অর্থাৎ রেজিস্ট্রার চিত্রগুপ্ত কাছেই ছিলেন। যম তাঁকে প্রশ্ন করলেন, এই প্রেতটার প্রাক্তন কর্ম কি?
চিত্রগুপ্ত বললেন, এর পূর্বনাম বদনচন্দ্র চৌধুরী, পেশা ছিল ওকালতি তেজারতি আর নানা রকম ব্যাবসা। প্রায় দশ বছর করপোরেশনের কাউন্সিলার আর পাঁচ বছর বিধান সভার সদস্য ছিল। এক মাস হল এখানে এসেছে, হরেক রকম বজ্জাতির জন্য হাজার বছর নরকবাসের দণ্ড পেয়েছে। এখন রৌরব নরকে গ-বিভাগে আছে। বর্তমান আচরণ ভালই। ঘণ্টা দুইএর জন্য ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে। শোকসভায় ওর বন্ধু আর স্তাবকরা কে কি বলে তা শোনবার জন্য আগ্রহ হওয়া ওর পক্ষে স্বাভাবিক।
—ও খবর পেলে কি করে যে আজ শোকসভা হবে?
—খবরের অভাব কি ধর্মরাজ, রোজ কত লোক মরছে আর সোজা নরকে চলে আসছে। তাদের কাছ থেকেই খবর পেয়েছে।
যম আজ্ঞা দিলেন, বেশ, দু ঘণ্টার জন্য ওকে ছেড়ে দাও, সঙ্গে একজন প্রহরী থাকে যেন।
চিত্রগুপ্ত হাঁক দিয়ে বললেন, ওহে কাকজঙ্ঘ, তুমি এই পাপীর সঙ্গে মর্তলোকে যাও। দেখো যেন নতুন পাপ কিছু না করে। ঠিক দশ ঘণ্টা পরেই ফেরত আনবে।
যে আজ্ঞে বলে যমদূত কাকজঙ্ঘ বদন চৌধুরীর হাত ধরে যমালয় থেকে বেরিয়ে গেল।
অনন্তর যমরাজ অন্য এক মহলে এলেন। তাঁকে দেখে ঘনশ্যাম ঘোষাল কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডবৎ হলেন।
যম বললেন, তোমার আবার কি চাই?
—আজ্ঞে, দু ঘণ্টার জন্যে ছুটি। একবার মর্ত্যলোকে যেতে চাচ্ছি।
—তোমারও শোকসভা হবে নাকি? এখানে এসেছ কবে?
—দু বছর হল এখানে এসেছি, রৌরবে থ-বিভাগে আছি। আমার জন্যে কেউ শোকসভা করে নি প্রভু। বন্ধুরা বড়ই নিমকহারাম, আমার মৃত্যুর পর আমারই ‘কালকেতু’ কাগজে মোটে আধ কলম ছেপেছিল, একটা ভাল ছবি পর্যন্ত দেয় নি। বদন চৌধুরী আমার বন্ধু ছিলেন, তাঁরই শোকসভায় যাবার জন্য ছুটি চাচ্ছি।
চিত্রগুপ্ত তাঁর খাতা দেখে বললেন, তুমি অতি পাজী প্রেত, যমালয়ে এসেও মিছে কথা বলছ। তোমার কাগজে তো চিরকাল বদন চৌধুরীকে গালাগাল দিয়েছ।
—আজ্ঞে, সম্পাদকের কঠোর কর্তব্য হিসেবে তা করতে হয়েছে। কিন্তু আগে বদনের সঙ্গে আমার খুব হৃদ্যতা ছিল, পরে মনান্তর হয়। এখন মরণের পর শত্রুতার অবসান হয়েছে, মরণান্তানি বৈরাণি, আমরা আবার বন্ধু হয়ে গেছি।
যম চিত্রগুপ্তকে বললেন, যাক গে, দু ঘণ্টার জন্য একেও ছেড়ে দিতে পার। সঙ্গে যেন একটা প্রহরী থাকে।
চিত্রগুপ্তের আদেশে যমদূত ভৃঙ্গরোল ঘনশ্যামের সঙ্গে গেল।
পরলোকগত বদন চৌধুরীর শোকসভায় খুব লোকসমাগম হয়েছে। বেদীর উপরে আছেন সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ রায়বাহাদুর গোবর্ধন মিত্র, তাঁর ডান পাশে আছেন প্রধান বক্তা প্রবীণ অধ্যাপক আঙ্গিরস গাঙ্গুলী, বাঁ পাশে আছেন বদনের বন্ধু ও সভার আয়োজক ব্যারিস্টার কোকিল সেন। আরও কয়েক জন গণ্যমান্য লোক কাছেই বসেছেন। বক্তাদের জন্য দুটো মাইক্রোফোন খাড়া হয়ে আছে এবং সভার বিভিন্ন স্থানে গোটা কতক লাউড স্পীকার বসানো হয়েছে।
বদন চৌধুরী তাঁর রক্ষী যমদূতের সঙ্গে বেদীর উপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঘনশ্যাম ঘোষালকে দেখে বললেন, তুমি কি মতলবে এখানে এসেছ? সভা পণ্ড করতে চাও নাকি?
ঘনশ্যাম বললেন, আবে না না, পণ্ড করব কেন, তুমি হলে আমার পুরনো বন্ধু। তোমার গুণকীর্তন শুনে প্রাণটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments