হাম্মুরাব্বির আইনসংহিতা
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসে সে নামটি সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে সেটি হচ্ছে হাম্বুরাব্বি। ব্যাবিলনের এই বিখ্যাত নৃপতির নাম তাঁর একটি বিশেষ কীর্তির জন্য মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। এই অনুপম কীর্তিটি হচ্ছে হাম্মুরাব্বি প্রণীত আইনসংহিতা। সভ্যতার ইতিহাসে হাম্মুরাব্বির আইনসংহিতা প্রথম সুসংবদ্ধ বিধানমালা। হাম্মুরাব্বির রাজত্বকাল হচ্ছে খ্রিষ্টপুর্ব ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ সাল। এই দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর হাম্মুরাব্বি অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে এক বিশাল ভূখণ্ড শাসন করেন। তাঁর এই নির্বিঘ্ন শাসন তাকে পৃথিবীর ইতিহাসে একজন অন্যতম সার্থক নৃপতি হিসেবে স্থান দিয়েছে। তার সিংহাসনারোহণের সময় প্রাচীন মেসোপটেমিয়া খণ্ড খণ্ড রাজত্বে বিভক্ত ছিল। হাম্মুরাব্বি তাঁর প্রতিবেশী রাজ্যগুলো যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে তাঁর কর্তৃত্বাধীনে আনেন এবং সমগ্র মেসোপটেমিয়ার এক ঐক্যবদ্ধ রূপ দেন। ব্যাবিলন থেকে সমগ্র প্রাচীন মেসোপটেমিয়া শাসিত হতে থাকে।
রাজত্বের শেষের দিকে হাম্বুরাব্বি তাঁর আদেশিত বিধানমালা প্রস্তরস্তম্ভে খোদাই করার নির্দেশ দেন। এই খোদাই করা প্রস্তর স্তম্ভগুলো বিভিন্ন মন্দিরে স্থাপন করা হয়। এ রকম একটা প্রস্তর স্তম্ভ চমৎকার অবস্থায় পাওয়া গেছে যেটা নাকি একটা অপূর্ব শিল্প নিদর্শন। এই স্তম্ভটি সিপ্পার শহরের শামাশ দেবতার মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে পশ্চিম ইরানের দুর্ধর্ষ এলামীয়রা এটাকে যুদ্ধে লুণ্ঠিত দ্রব্য হিসাবে তাদের রাজধানী সুসা’য় নিয়ে যায়। ফরাসী পুরাতত্ত্ববিদেরা ১৯০১ সালে এটাকে সুসার ধ্বংসাবশেষ থেকে খুুঁড়ে বের করেন এবং তখন থেকেই প্যারিসের লুভর সংগ্রহশালায় এই স্তম্ভটি আছে। স্তম্ভটি একটা আট ফুট উঁচু মসৃণ ব্যাসান্ট পাথর, যার ওপর দিকটা স্থুলভাবে বৃত্তাকার। স্তম্ভের দিকে হাম্মুরাব্বি প্রার্থনার ভঙ্গীতে সিংহাসনে উপবিষ্ট শামাশ দেবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ন্যায় বিচারের দেবতা সূর্যদেব শামাশ তাঁকে এই আইনসংহিতা দিচ্ছেন, এরকম একটা দৃশ্য খোদাই করা আছে। স্তম্ভের বাকী অংশ, সামনে এবং পেছনে দুদিকেই সংবাদপত্রের মতন কলামে দুইশত বিরাশিটি আইন অত্যন্ত বিশুদ্ধ ব্যাবিলনীয় ভাষায় খোদাই করা আছে। সুদূর অতীতে পাঁচ থেকে সাতটা কলাম মুছে যাওয়ার ফলে প্রায় পঁয়ত্রিশটা আইন স্তম্ভে নেই, তবে মূল আইনগুলোর প্রচুর মৃৎফলক সংস্করণ করা হয়েছিল, বোধকরি সাধারণ ব্যবহারের জন্য এরকম কিছু প্রাপ্ত মৃৎফলক থেকে মুছে যাওয়া অংশটি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। এই দু’শ বিরাশিটা আইন মূলতঃ নানারকম আইনভঙ্গ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ, পরিবার, সম্পত্তি, বৃত্তিধারী লোকদের পারিশ্রমিক এবং দায়িত্ব, কৃষি সংক্রান্ত আইনগত সমস্যা, ভাড়ার হার এবং পরিমাণ, দাস বিক্রয় এবং ক্রয়, ইত্যাদি সংক্রান্ত। অবশেষে একখানা লম্বা উপসংহারে যে ‘সুযোগ্য রাজা হাম্মুরাব্বি প্রতিষ্ঠিত এই ন্যায় আইন-সংহিতা’ উৎকীর্ণ স্তম্ভের ক্ষতিসাধন অথবা পরিবর্তন করবে তার ওপরে দৈব অভিশাপ বা শাস্তি নেমে আসবে বলা হয়েছে।
হাম্মুরাব্বির আইনসংহিতা এবং অন্যান্য প্রাপ্ত প্রমাণপত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সমাজ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। ব্যাবিলনীয় ভাষায় এই তিন শ্রেণীর নাম হচ্ছে যথাক্রমে আওএলুম, মুশকেনুম এবং ওয়ারদুম। আওএলুম শব্দের অর্থ যদিও মুক্ত মানুষ, আইনসংহিতা থেকে এটা পরিষ্কার যে আওএলুম আসলে অভিজাত শ্রেণী, মুশকেনুমকে আমরা ‘নাগরিক’ অথবা ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে ধরতে পারি, আরবি ‘মিসকিন’ শব্দটির উদ্ভব মুশকেলুম থেকে এবং সবশেষে ওয়ারদুম হচ্ছে দাস। সাধারণতঃ যুদ্ধবন্দীদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হতো, এছাড়া দরিদ্র পিতামাতা তাদের সন্তান বিক্রি করত যারা নাকি দাস হতো। দাসেরা হতো মুণ্ডিত মস্তক এবং তাদের নিজ নিজ প্রভুর আলাদা আলাদা বিশেষ চিহ্ন তাদের শরীরে থাকত। পলাতক দাসদের আশ্রয় দিলে মারাত্মক শাস্তির ব্যবস্থা আইনসংহিতায় আছে। দাস-প্রভু সাধারণতঃ একজন দাসীকে তার দাসকে স্ত্রী হিসেবে দিত এবং এই দাস দম্পতির পুত্রকন্যাও দাস হতো। দাস প্রভু কখনো কখনো তার দাসকে ব্যবসায় লাগিয়ে দিতেন এবং একটা বাৎসরিক ভাড়া নিতেন। আবার কোনো কোনো দাস একজন মুক্ত ‘নাগরিক’কে বিয়ে করতে পারত। এদের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments