বৃষ্টি আর নক্ষত্র
বৃষ্টি চলছিল অনেকক্ষণ।
কালো পিচের ওপর আলোর হলদে ছোপগুলো যেন কড়াইয়ের ওপর ডিমের কুসুম। গাছপালা, ঘরবাড়ি, রেলিঙ, খবরের কাগজের কিওস্ক আর ছোট্ট স্কোয়ারটার গেটের সামনে প্লাস্টার অব প্যারিসের হর্ণ বাজিয়ে মূর্তিগুলো এমন আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগেই ভিজে একেবারে জবজবে হয়ে গেছে তারা, এখন আর কিছুতেই এসে যায় না। তাই সবাই নিজের নিজের কাজ করে চলল, ‘শাখা দুলিয়ে চলল গাছেরা, মস্কো থেকে আসা সার্কাসের ভেজা পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল রেলিঙ, বাড়িগুলো তাদের সদর দরজা খোলে আর বন্ধ করে, নানা রঙের আলোয় ঝকমল করে চলল জানলাগুলো, আর হর্ণ বাজিয়েরা শিঙায় মুখ দিয়ে তৈরি হয়েই থাকল, দরকার পড়লে ভোঁ দেবে।
শুধু পত্রিকার কিওস্কগুলো কিছুই করল না। আগেই সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এখন শুধু ক্ষুণ্নভাবে আবছা ঝলক দিচ্ছে তাদের কাচগুলো।
ট্রামগাড়িগুলো কিন্তু খুশিই হল বৃষ্টিতে। ভেজা ভেজা ওয়াগনের লাল গাগুলো এমন ঝকঝক করছিল যেন সদ্য তৈরি হয়ে এসেছে কারখানা থেকে। শহরে তারা ছুটছিল যেন বেশি সবেগে, সোল্লাস ঘণ্টি দিচ্ছি আর তারের প্রতিটি জোড়ের কাছেই ছিটোচ্ছিল সবজে সবজে ভেজা ফুলকি। ঠিক ফুলকি নয়, সবুজ আগুনের ফালি; ছিটিয়ে পড়ছিল তা ট্রামের ভেজা ছাদে, চিড়বিড় করছিল চকচকে পিচের ওপর।
হর্ন বাজিয়ে প্রহরীওয়ালা ছোট স্কোয়ারটিতে এল তিন ওয়াগনের এক ট্রামগাড়ি। অল্প যাত্রী, শেষ ওয়াগনের কন্ডাক্টর মেয়েটি থুতনি ঠেকিয়ে ঝিমুচ্ছিল। ভারী পাকা কন্ডাক্টর সে, ঝিমুলেও মুখখানার চেহারা কড়া। দূর থেকে মনে হয় যেন নিতান্ত বুকের ওপর ঝুলন্ত নীল টিকিটের বান্ডিল আর ঝকঝকে বোল্টওয়ালা ব্যাগটার দিকে চেয়ে আছে।
গাড়িতে একটা ছেলে ঢুকতেই সজাগ হয়ে উঠল সে।
‘টিকিট নিয়ে যা, জলদি...’
ছেলেটা তার কুর্তার পকেটে হাত ঢুকাল। তারপর প্যান্টের পকেট খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু তিনটে কোপেক না পেয়ে চুপচাপ নেমে পড়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল।
‘দাঁড়া, বলছি।’
এখন একেবারেই ঘুম কেটে গেছে কন্ডাক্টরের। ছেলেটার দিকে চেয়ে সে বেশ বুঝল যে ছেলেটা নিশ্চয় বৃষ্টিতে অনেক হেঁটেছে। সপসপ করছে মাথার চুল, ঘাড়ে সেঁটে গেছে পাট হয়ে। বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে আসছে তা থেকে, জলে ফেঁপে ওঠা কোর্তাটার কলার বেয়ে নেমে যাচ্ছে। জুতোজোড়াও ছপছপ করছে নিশ্চয়।
‘দাঁড়া বলছি,’ চেঁচিয়ে ডাকল কন্ডাক্টর, ‘বড়ো যে রাগ দেখছি...এমন রাতে যাবি কোথায়?’
‘সার্কাস পর্যন্ত,’ বলে ফিরল ছেলেটি। কিছুতেই তার আর এসে যায় না। গাড়ির সার্কাস পর্যন্ত যায় কিনা তাও সে জানে না সঠিক।
কন্ডাক্টর মেয়েটি টিকিট ছিঁড়ে দিল একটা।
‘নে, টিকিট চেকার আসতে পারে...’
ভেজা আঙুলে টিকিট নিল ছেলেটা। ধন্যবাদটুকুও দিল না। বোধহয় মনে হচ্ছিল না। হয়তো-বা ইচ্ছে করেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ কুঁচকে সে তাকিয়ে রইল জানলার ওপারে বৃষ্টি দিকে। বৃষ্টিতে তার ভয় নেই, ট্রামে উঠেছে কেবল বাড়ি থেকে বহু দূরে চলে যাবার জন্যে।
কিন্তু কোথায়? যেখানেই হোক। অভিমান হয়েছে তার।
নড়ে উঠে চলতে লাগল গাড়িটা।
ফের মনে হতে লাগল যেন কন্ডাক্টর মেয়েটি তার নীল টিকিটের বান্ডিল ভরা ব্যাগটার দিকে চেয়ে আছে।
কাঁপা কাঁপা আলোয় জ্বলছে ট্রামের বাতিগুলো। বৃষ্টির সময় সর্বদাই একটু ক্ষীণ লাগে বাতিগুলোকে। জানলার ভেজা শার্সিতে দোকানগুলোর বিজ্ঞাপনের লাল সবুজ হরফের ঝাপসা ছোপ। বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল। কিন্তু রঙচঙে ছোপের দিকে ছেলেটার মন ছিল না। আগের মতোই চোখ কুঁচকে ঠোঁটের পাশদুটো চেপে সে তাকিয়ে রইল। ভাবছিল অন্য কিছু।
তারপর খিদে পেল তার। টের পেল যে ভারী ক্লান্ত হয়ে গেছে। মনের মধ্যে অভিমান থাকলে লোকে চট করেই হাঁপিয়ে যায়। ভিজে জবজবে কুর্তাটার ছেয়ে শতগুণ জোরে সে ক্ষোভ তার কাঁধ চেপে ধরেছে। কুর্তা তো ইচ্ছে করলেই খুলে মুচড়ে জল বার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments