বই আলোচনা: অত্যাচারিতের শিক্ষা

লেখক: মাসুদুর রহমান

পাওলো ফ্রেইরী লিখিত 'অত্যাচারিতের শিক্ষা' বইটি ১৯৬৭ সালে ব্রাজিলে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই বইটি ব্যাপক গুরুত্ব লাভ করে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বইটির গুরুত্ব অদ্যাবধি এতটুকুও মলিন হয়নি।

পাওলো ফ্রেইরী একজন অধ্যাপক, শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক। ধর্মীয় শিক্ষাকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষা বিষয়ে ধার্মিকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ জীবনের শিক্ষা ও শহর জীবনের শিক্ষার বৈষম্যমূলক পরিবেশ দূরীকরণের ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য সমাজকর্মী। ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা' বইটি পৃথিবীর কমবেশি অত্যাচারিত যে কোনো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক করার লক্ষ্যে ও ক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান রেখে চলেছে।

বইটি মূলত চারটি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে মানবতা, মানবিকতা, মানবিকীকরণ ইত্যাদি বিষয় সমূহের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্র ও প্রয়োজনীয়তা। প্রয়োগের প্রচেষ্টার বাধা বিপত্তি এবং তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা গ্রহণ ও অবস্থা সৃষ্টির এক অনবদ্য অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যদিয়ে কি হয়ে থাকে এবং কি হওয়া উচিৎ তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে পাওলো ফ্রেইরী শিক্ষকের শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গঠনে শিক্ষকের কি করা উচিৎ তার উদাহরণসহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায়ে অত্যাচারিতের শিক্ষার ক্ষেত্রে শব্দ চয়ন, সংলাপ, সংলাপের গুরুত্ব, তার পূর্বশর্ত কি হওয়া প্রয়োজন তার উপর উদাহরণসহ বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় "ভালোবাসা ছাড়া সংলাপের অস্তিত্ব নেই।” সুতরাং যাদের সাথে সংলাপ যাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব বা প্রয়াস তাদের প্রতি কতটুকু ভালোবাসা তার উপরই নির্ভর করছে শিক্ষকের সার্থকতার প্রায় সবটুকুই।

৪র্থ অধ্যায়টি ৮টি উপ-অধ্যায়ের মাধ্যমে বিজয়, বিভক্তি ও শাসন, প্রভাব বিস্তার, সাংস্কৃতিক আক্রমণ, সহযোগিতা, মুক্তির ঐক্য, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়ে রচিত হয়েছে। উপ- অধ্যায়গুলো বিষয়ভিত্তিক সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত হয়েছে। সার্বিকভাবে ৪র্থ অধ্যায়ে সরাসরি অত্যাচারিতের শিক্ষার জন্য বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করা হয়েছে। বিপ্লবী নেতার হঠকারীতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বিপ্লবী নেতার করণীয়সমূহের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে অত্যাচারিতের শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে বিপ্লবী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট কর্মসূচীর অবতারণা করা হয়েছে। শুধুমাত্র ৪র্থ অধ্যায়টিকে কেন্দ্র করেই একটি বই রচিত হতে পারতো বলে আমার বিশ্বাস।

যারা 'অত্যাচারিতের শিক্ষা' বইটি দরদ দিয়ে পড়েছেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই আমার সাথে একমত হবেন যে পাওলো ফ্রেইরী অত্যাচারিতের শিক্ষার জন্য একটি বিজ্ঞ, শিক্ষিত, পণ্ডিত সমাজকর্মী শ্রেণী গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁর জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এই বইটিতে। যার তুলনা বা উদাহরণ পাওলো ফ্রেইরী ছাড়া খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। আমি মনেকরি বাংলাদেশে যে যেখানে সমাজকর্মী, সমাজসেবক হিসেবে নিয়োজিত আছেন- যেমন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাথে, গ্রামীণ কৃষক জীবনের সাথে, শহরে শিল্প কারখানার জীবনের সাথে, বস্তি জীবনের সাথে সকলের ক্ষেত্রে, তাদের কর্ম-এলাকার মানুষের সাথে সময় উপযোগী জ্ঞান লাভ করে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের লক্ষ্যে পাওলো ফ্রেইরীর অত্যাচারিতের শিক্ষা বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। নিজের সচেতনতার স্বার্থে প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষ মাত্রই বইটি গুরুত্ব সহকারে পড়ে নেয়া দায়িত্ব বলে মনে করি। বইটির আরও একটি সবল দিক হচ্ছে পাওলো ফ্রেইরীর মূল্যবোধের দিকে দৃষ্টি রেখে বাংলা শব্দের সঠিক ব্যবহার। সাধারণ ভাবে যে কাজটি খুব সহজ নয় সেই কাজটিই এই বইটি অনুবাদের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে হওয়ার ফলে মূল লেখার গভীরতা বা মূল্যবোধ এতটুকুও খর্ব হয়নি বলা চলে। তাই এই অনুবাদিত বইটি পড়তে গেলে একদিকে পাওলো ফ্রেইরীর প্রতি অনুবাদকের গভীর শ্রদ্ধা যেমন বুঝা যায়, তেমনি অন্যদিকে অনুবাদকের দায়িত্ব উপলব্ধি করা যায়।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice