ভারতে শিক্ষা : সংক্ষিপ্ত পরিচয়
স্বাধীনতা-লাভের পর ভারতের সামনে বহু কাজ দেখা দিল—তার মধ্যে একটি প্রধান হচ্ছে শিক্ষা-পদ্ধতির সংস্কার ও বিস্তার। তখন লক্ষ্য হল শিক্ষার বয়স হলেই যাতে সব ছেলেমেয়ে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায় তার ব্যবস্থা করা। কিশোর-শিক্ষাব এই ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে নিরক্ষর বয়স্কদের শিক্ষার পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাও করা হল। তাছাড়া, মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা-ব্যবস্থাকেও নতুন করে গড়ে তোলার আয়োজন করা হতে লাগল। শিল্প ও কৃষির উন্নতির জন্য বিজ্ঞান ও কারিগরী শিক্ষার দ্রুত প্রসারের ব্যবস্থাও বাদ পড়ল না। জাতিব সাংস্কৃতিক জীবনের সমৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি রাখা হল। তাই শিল্পকলার বিচিত্র রূপের উজ্জীবন ও পুষ্টির জন্যে দরকার হল সরকারী পোষকতার। বিদেশী শাসনের আমলে বহু প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের সম্বন্ধ গিয়েছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে, মুক্তির পর আবার সে-সম্বন্ধ পাতিয়ে নেয়া দরকার বিবেচিত হল। যে-সব দেশের সঙ্গে আগে কোন সম্পর্ক ছিল না সেখানেও সম্পর্ক পাতানো হল। ব্রিটিশ শাসনের প্রায় দুশো বছর ধরে ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক প্রায় একান্তভাবে সীমাবদ্ধ ছিল গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে। কিন্তু স্বতন্ত্র ভারত তো বৃহত্তর জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একধারে কুঁকড়ে পড়ে থাকতে পারে না।
স্বরাজ লাভ করার পর ভারত তার সংবিধান রচনা করে নিলে। সে-সংবিধান হল গণতান্ত্রিক। তাতে এই বিধান বিধিবদ্ধ হল যে, চোদ্দ বছর বয়সের সব ছেলেমেয়ের শিক্ষা হবে বিনা বেতনে, আর, ভা হবে বাধ্যতামূলক। নির্দেশ হল যে, এই নীতি স্বীকৃত হওয়ার দশ বছরের ভেতর একে কাজে পরিণত করতে হবে। পরাধীন যুগে ভারতবাসীদের শতকরা ২৫ জনেরও শিক্ষার এমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না; এই কথা মনে করলেই বুঝতে পারা যাবে স্বাধীন ভারতের সর্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা কতট। যুগান্তকারী। এ-কাজ তো এমনিতেই কঠিন; তার ওপর আবার কতকগুলো বিপর্যয় এসে একে কঠিনতর করে তুলেছিল। স্বরাজ-লাভের জন্য দেশকে চরম মূল্য দিতে হল দেশ ভাগ করে। এই দেশ-ভাগের ফলে জীবন-যাত্রার ধারা হয়ে গেল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; লক্ষ-লক্ষ লোক হল ছিন্নমূল, উদ্বাস্তু হল শরণার্থী। পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের ভেতর ১ কোটি লোকের বিনিময় হল। এই অসংখ্য বাস্তুহারা মানুষের পুনর্বাসনের জন্যে ভারতকে তার রসদ-সম্পদ ব্যয় করতে হল। এই সমস্যার সমাধান হতে না হতেই পৃথিবীর আর্থিক অবস্থার গতিকে ভারতীয় মুদ্রা-মানের দাম গেল কমে। তার ফলে দেখা দিল মুদ্রাস্ফীতি ও সামগ্রীক অভাব। স্বরাজ-লাভের প্রথম পাঁচ বছর হয় অবৃষ্টি নয়। অতি বৃষ্টি হওয়াতেও ভয়ানক অনটন আর টানাটানিতে কাটল। বিদেশ থেকে এত খাদ্য আমদানি করতে হল যা কোন কালে করতে হয় নি। এই-সব অনিবার্য কারণেই শিক্ষার উন্নতি আশানুরূপ হতে পেল না।
ভারতের স্বরাজ-লাভের পর দেশ ভাগের জন্যে রাজনীতিক, অর্থনীতিক, এবং আরও নানা অসুবিধা সাময়িকভাবে দেখা দিলেও একটা বিষয়ে খুব উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে। সেটা হচ্ছে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতের সঙ্গে ঐক্যবিধান। ইংরেজ আমলে এগুলিকে ভারত থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তার জন্যে তখন ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যের ভারতের জীবন-যাত্রায় ঐক্য ছিল না। তখন দেশীয় রাজ্যগুলি খুব পিছিয়ে ছিল, শুধু রাজনীতিক ব্যাপারে নয়, অর্থনীতিক ব্যাপারেও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে ছিল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এবং শিক্ষাবিষয়ে। আর শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে ছিল বলেই সামাজিক ক্ষেত্রেও ছিল পশ্চাদ্বর্তী। অবশ্য দু-একটা বাজ্যে যে এর ব্যতিক্রম ছিল তা মানি। তবে, মোটের মাথায়, বেশির ভাগ রাজ্যে অনগ্রসরতার জন্যে সারা ভারতের অগ্রগতি তাতে ব্যাহত হয়েছিল বিলক্ষণ। স্বতন্ত্র ভারতে এই বাজাগুলোকে আবার যুক্ত-মিলিত করে সমগ্র ভারতের অচ্ছেদ্য অংশ করে নেয়া হল। অনেকগুলো কড়া মিলিয়ে যেমন একটা শিকল হয় তেমনি অনেক প্রদেশ ও রাজ্য মিলিয়ে আমাদের এই বিশাল, বিচিত্র ভারতবর্ষ। শিকলের একটা কড়া মরচে-পড়া, অপোক্ত হলে গোটা শেকলটাই অশক্ত হয়ে যায়।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments