রমণীয় রমনা

রমনার কথা বলতে গিয়ে পুরানা পল্টন এবং সেই সঙ্গে মতিঝিল ও দিলকুশার কাহিনি শোনালাম এতক্ষণ। রমনার কথা আর বলা হয়নি।

এবার সেই রমনার কথা।

কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে খুবই মুষড়ে পড়েছিলাম। বড় শহরের কোনো উপকরণই ছিল না ঢাকায়। যেদিন মনটা কোনো কারণে বিষণ্ণ থাকত, সেদিন যে হারিয়ে যাব কোথাও-আয়তনে তেমন বড় ছিল না ঢাকা। লোকের ভিড়ে, গাড়ি-ঘোড়ার জটিল আবর্তে কিংবা পার্কের সবুজে একটু লুকোবো, না, সে সুযোগও ছিল না। ঢাকুরিয়ার মতো লেক নেই, আলিপুরের মতো চিড়িয়াখানা, মিনার্ভা, শ্রীরঙ্গম, স্টার কি ন্যাট্যভারতীর মতো থিয়েটার হল নেই, নেই কোনো এলাকার অলৌকিক কোনো ভালো লাগা, নেই মেট্রো, লাইটহাউস, গ্লোব, নিউ এম্পায়ার, এলিট প্রেক্ষাগৃহের মতো সর্বাধুনিক সুখধাম। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের স্বর্গের কথা না-ই বা বললাম, আর গড়ের মাঠ-আহ্! ঢাকায় থাকবে কি, এই বসুমতীর কোথাও নেই!

তাহলে ঢাকার রইল কী?

রমনা!

রমণীয় রমনা-গাছে-গাছে, ফুলে-ফুলে, ঘাসে-ঘাসে রোমান্টিক রমনা। প্রথমে এলাকার নামকরণের মধ্যে ওই রমণীয় বা রমণের একটা যোগ কল্পনা করতাম। কিন্তু শব্দটি যে ফারসি, জানা গেল কিংবদন্তীর ঢাকার রচয়িতা নাজির হোসেনের কাছে। রমনা মানে লন (lawn) অর্থাৎ সবুজ ঘাসে ঢাকা উন্মুক্ত জমি বা বনানী। মোগল আমলেও এই সবুজে মোড়া জায়গার একটা অসাধারণ সৌন্দর্য ছিল, যে-কারণে এর নামকরণ হয়েছিল রমনা। গোড়ায় এই এলাকার নাম ছিল মহল্লা চিশতিয়ান ও শুজাতপুর। ১৮২৪ সালে ঢাকার কালেক্টর ডাউজ সাহেব এলাকাটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বাগানের নগর করার লক্ষ্যে রমনা গ্রিনের পত্তন করেন এবং নগরবাসীর বিনোদনের জন্য স্থাপন করেন রমনা রেসকোর্স (আজকে যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। ফলে বাগ-বাগিচাশোভিত এই এলাকা ঢাকার সম্ভ্রান্ত লোকের আবাসস্থলে পরিণত হয়। এর আগে বলা হয়েছে দিলকুশা, তোপখানা রোড, পুরানা পল্টন, মতিঝিল এলাকাব্যাপী যে পুরোনো ক্যান্টনমেন্ট ছিল, তা উঠে এসেছিল এই উন্মুক্ত রমনা এবং মিরপুরসংলগ্ন বেগুনবাড়ি এলাকায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করলে ক্যান্টনমেন্ট তৃতীয়বারের মতো উঠে যায় বর্তমান কুর্মিটোলা এলাকায়। বিস্তীর্ণ রমনা এলাকা নির্বাচিত হয় প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে। আস্তে আস্তে রমনাকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে 'নিউ টাউন' তথা নতুন রাজধানী। আর এই রাজধানীর সাজনদারের ভার পড়ে প্রাতঃস্মরণীয় রবার্ট লুইস প্রাউডলকের ওপর।

হ্যাঁ, উদ্ভিদপ্রেমী, উদ্যান-স্থপতি প্রাউডলক। প্রথম রূপকার যদি ডাউজ, দ্বিতীয় রূপকার প্রাউডলক। এই প্রজন্মের কথা না-ই বা বললাম, এই ঢাকা নগরের প্রাচীনদেরই বা কজনের জানা আছে এই দুটি উজ্জ্বল নাম?

ঢাকাকে উদ্যান নগর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ডে প্রাউডলক ছিলেন বৃক্ষশোভিত সরণি-উদ্যান নির্মাণের দায়িত্বে।

পঞ্চাশের দশকের আগেকার রমনা ও সংলগ্ন এলাকায় তরুসজ্জার সবটুকুই প্রাউডলকের সৃষ্টি। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেলে ঢাকার রাজধানী নির্মাণের পরিকল্পনাও বাতিল হয়ে যায়। ফলে প্রাউডলকের স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অসম্পূর্ণ স্বপ্নকে ঘিরেই বুদ্ধদেব বসুর কী উচ্ছ্বাস: "স্থাপত্যে কোনো একঘেয়েমি নেই, সরণি ও উদ্যান রচনায় নয়াদিল্লির জ্যামিতিক দুঃস্বপ্ন স্থান পায়নি।... সর্বত্র প্রচুর স্থান, ঘেঁষাঘেঁষি ঠেলাঠেলির কোনো কথাই ওঠে না।" গাছের ফাঁকে ফাঁকে পরিত্যক্ত রাজধানীর সচিবালয়, মন্ত্রীদের জন্য নির্মিত বাগানঘেরা বিলিতি ছাঁদের দোতলা শ্রীমণ্ডিত বাড়িগুলো পড়ে পড়ে ঝিমোয়।

দেড় দশক পরে ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলো, তখন নবনির্মিত ও অব্যবহৃত ওই প্রাণকাড়া বাংলো বাড়িগুলো যেন প্রাণ পেল। সচিবালয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন। বাংলো বাড়িগুলো বরাদ্দ হলো অধ্যাপকদের জন্য। মেয়েদের হস্টেলের জন্য যে বাড়িটি নির্বাচিত হয়েছিল, সে তো নয়নমনোহর বাগানঘেরা 'চামেরি হাউস'। আমরা যখন ঢাকায় আসি, তখন ওটা 'চামেলি হাউস' নামেই খ্যাত ছিল। বুদ্ধদেব বসুর কালে দেখছি চামাদিয়া হাউস। এটা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হস্টেল। ছাত্রীরা দলবেঁধে পড়তে যেত, দলবেঁধে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice