ঢাকায় বিবেকানন্দ

৯ই চৈত্র অপরাহ্নে সর্বজন পরিচিত স্বামী বিবেকানন্দ ঢাকায় পদার্পণ করেন। ঢাকার পক্ষে পূর্ববঙ্গের পক্ষে সেই দিন বড়ই শুভ দিন গিয়াছে। কিন্তু ঢাকার শিক্ষিত সমাজের দূরদৃষ্ট-পুং বঙ্গীয় সমাজের দূরদৃষ্ট ঢাকাবাসীরা স্বামীজির আগমন সম্বন্ধে পূর্বে কোন আভাস পান নাই যাহা হউক স্বামীজি অনাহূত অবস্থায় ঢাকা আসেন নাই ইহাই সুখের বিষয়। রামকৃষ্ণ মিশন নামক কোন এক সমিতি তাহার আদর অভ্যর্থনার জন্য বিশেষ আয়োজন করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদেরই উৎসাহ উদ্যোগে সশিষ্য স্বামীজি পরোলোকগত মোহিনীবাবুর গৃহ পবিত্র করিলেন অভ্যর্থনাপর্বের যবনিকা এখানেই পতন হইল।

বিবেকানন্দ ঢাকায় আসিলেন— ঢাকায় হুলস্থূল পড়িল না আশ্চর্যের বিষয় নয় কি? যিনি মার্কিন বিজয় করিয়া আসিলেন ইয়ুরোপীয় পণ্ডিতমণ্ডলীকে স্তম্ভিত করিয়া আসিলেন, বিদেশে স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়া বিশেষ সামদৃত এবং পূজিত হইলেন সেই বিবেকানন্দ আমাদের পূর্ব পরিচিত সেই নরেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্বাঙ্গে পূজা অর্চনা তাদের অভ্যর্থনা পাইলেন না ক্ষোভের বিষয় নয় কি? স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় বেদস্তা, শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বেদ শিক্ষা দিতে শাস্ত্র প্রচার করিবে, এত পরিশ্রম করিয়া সাত সমুদ্র তের নদী পার হইয়া আসিলেন কিন্তু পূর্ববঙ্গের কি দূরদৃষ্ট সমাজের কি অধঃপতন জনসাধারণ স্বামীজির নিকট বেদ শিক্ষা করিতে, শাস্ত্রজ্ঞান লাভ করিতে যাতায়াত করিলেন না।

ঢাকাবাসীর এই অস্বাভাবিক ব্যবহারে অনেকেই আশ্চর্য হইয়াছিলেন, কিন্তু স্বামীজির ঢাকা অবস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের অস্বাভাবিক ব্যবহারের রহস্য উদ্ঘটিত হইল। আমরাও দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া আস্বস্ত হইলাম। পূজ্যপাদ পরমহংস দেবের প্রিয় শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দকে দেখিবার জন্য অনেকেই হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মোহিনীবাবুর বাড়ি যাতায়াত করিতে লাগিলেন। কিন্তু অনেকেই স্বামীজির দর্শন লাভে বঞ্চিত হইতে লাগিলেন। স্বামীজিকে দরবার কক্ষে প্রায়ই পাওয়া যাইত না। কাজেই স্বামীজির দর্শনলাভে ঐকান্তিক আগ্রহ থাকিলে শিষ্য সেবকদিগকে (প্রতিহারিদিগকে) অনুনয় বিনয় করিয়া স্বামীজির দর্শন লাভ ঘটিত। এ দর্শনই কি আবার স্বাভাবিক দর্শন। তিনি হয়ত দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় অর্দ্ধশায়িত, কোন ভদ্রলোক শ্রীচরণ দর্শনেচ্ছু অগত্যা হয় তিনি শয়নকক্ষে নীত হইলেন, নয় স্বামীজি স্বয়ং দরবার কক্ষে শুভাগমন করিলেন। অনেক সময়ই তাঁহার শান্ত সৌম্য মূর্তি দৃষ্ট হইত। তাঁহার আচার ব্যবহার বড়ই মধুর শিষ্টাচার বিনয় বড়ই চমৎকার। অনেকেই মনে করেন এই শিষ্টাচার সদাচার মর্তের নয়—স্বর্গের। যিনি স্বামীজির দর্শন একবার পাইলেন তিনি কৃতার্থ জ্ঞান করিলেন। পুনরায় দর্শন বাসনার ইতি দিলেন। সুতরাং যাতায়াত করিবেন কি করিয়া।

ঢাকাবাসীর মত প্রথম আমরা বিশ্বাসযোগ্য মনে করি নাই। যিনি হিন্দুধর্মের জন্য এত আত্মত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন, স্বীয় ভোগবিলাসিতায় জলাঞ্জলি দিয়া আত্মীয় পরিজনহীন দেশে স্বধর্ম প্রচারে এত কষ্ট করিয়াছেন, তিনি সদাচারী নন, সদালাপী নন, বিনয়ী নন—এই কথাগুলি বিশ্বাস করিতে প্রথম কেমন কেমন ঠেকিত। কিন্তু হিন্দু সমাজের অদৃষ্ট মন্দ, অধঃপতিত হিন্দুরা তাঁহার আলাপের মর্ম, সদাচারের উদ্দেশ্য বুঝিল না। তাঁহারা তাঁহার পরনিন্দায় সায় দিতে পারিলেন না। জনৈক ভদ্রলোক তাঁহার নিকট ধর্মোপদেশ পাইতে গিয়াছিলেন, তাঁহার ধর্মোপদেশ শুনিয়া ত অবাক। স্বামীজির নিকট কোন এক সাধু পুরুষ সম্বন্ধে মত জানিতে চাহিলে স্বামীজি তাঁহার নিন্দাবাদ আরম্ভ করিলেন। ভদ্রলোকটি বলিলেন, আমি ত আপনার নিকট পরনিন্দা শুনিতে আসি নাই, ধর্মোপদেশ পাইতে আসিয়াছি। নিন্দাধর্ম ধার্মিকের লক্ষণ নহে। ইহার পরে ভদ্রলোকটি চলিয়া আসিলেন।

আমরা একটা সাধারণ প্রবাদ বাক্য শুনিতে পাই "গুরু মিলে লাখে লাখে শিষ্য নাহি মিলে এক।” অনেকেই মনে করিলেন স্বামীজির শিষ্যগণ বুঝি নানা গুণালঙ্কৃত। কিন্তু তাহারাও গুরুর শিষ্য। কাজেই এক কাটি সরস। তাঁহাদের ভূষণ দাম্ভিকতা, অলঙ্কার পরনিন্দা। সংসারে (অন্ততঃ তাঁহাদের আলাপ ব্যবহারে যাহা বুঝা যায়) তাঁহাদের ন্যায় পণ্ডিত লোক অতি বিরল। ব্রাহ্মণ ম্লেচ্ছে পরিণত হইয়াছে, ব্রাহ্মণ বেদ জানে না, বেদ দূরের কথা, বেদ পুস্তকখানা কি তাহাও দেখে নাই ইত্যাদি প্রকারের আলাপ ব্যবহার শুনিয়া তাহাদিগকে শফরীবৎ অল্প বৃদ্ধি

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice