দেবীপ্রসাদ এবং বিজ্ঞান-চেতনা
প্রবেশক
এক সময় ভারতীয় বিজ্ঞানকে ‘হিন্দু বিজ্ঞান’ বলে চিহ্নিত করার চল ছিল। প্রফুল্লচন্দ্রের ‘দ্য হিস্টরি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ নামটিতে ভারতীয় অর্থেই হিন্দু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতীয়দের ‘হিন্দু’ নামকরণ করেছিল বাইরের লোকেরা। ভারতীয়রা নিজেদের হিন্দু বলত না। আলবেরুনি-র (৯৭৩-১০৪৮) ভারত সম্বন্ধে বিশ্বকোষ উপম গ্রন্থটির আরবি নাম ‘তারিখ আল-হিন্দ’। এর বাংলা তর্জমা করা হয়েছে ‘ভারত-তত্ত্ব’। আলবেরুনি সে বইয়ে ‘ভারতীয়’ বোঝাতে সর্বত্রই ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ভারতে মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর (তের শতক) থেকে হিন্দু শব্দটি ‘ভারতীয়’ অর্থটির পাশাপাশি একটি ধর্মগোষ্ঠীকেও বোঝাতে থাকে। ব্রিটিশ আমলে ধর্মসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দৌরাত্ম্যে, ক্রমে হিন্দু শব্দটির অর্থ সংকুচিত হয়ে তা একটি ধর্মগোষ্ঠীরই দ্যোতক হয়ে ওঠে। তাই বর্তমানে হিন্দু মানে ভারতীয় নয়, ভারতের একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বী মাত্র। বিজেপি এখন শব্দটি নিয়ে উল্টে প্যাচ কষছে। তাদের ভাষ্যে, ভারতীয় মানেই হিন্দু, তাই যে হিন্দু নয় সে ভারতীয়ও নয়; হয় তাকে হিন্দু হতে হবে, নয় ভারত ছাড়তে হবে। তাই, পাঠের সময়, হিন্দু শব্দটি কখন কী অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মধ্য-এশিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগে, আট শতক থেকে চৌদ্দ শতক পর্যন্ত কালপর্বে, বিজ্ঞানের যে গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হয়েছে, তাকে কী নামে চিহ্নিত করা যায়? কেউ কেউ এটিকে ‘ইসলামি বিজ্ঞান’ নামে চিহ্নিত করেন। কারণ, এ অঞ্চলে সে সময়ের শাসকরা ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং তাঁরা বিজ্ঞান চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এতে দু’টি সমস্যা। বিজ্ঞান ইহজাগতিক সর্বজনীন বিষয়, এটিকে ধর্মের অভিধায় ভাগ করা যায় না। এ সময়ে যারা বিজ্ঞান চর্চা করেছেন, তাদের অনেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন না। কেউ ছিলেন খ্রিস্টান, কেউ ইহুদি, কেউ বা অন্যকোনো ধর্মাবলম্বী। অনেকে এটিকে ‘আরব্য বিজ্ঞান’ বলে অভিহিত করতে চান। এতেও সমস্যা রয়েছে। যে অর্থে ভারতীয় বা চৈনিক বিজ্ঞান বলা যায়, সে অর্থে আরব্য বিজ্ঞান বলা যায় না। কারণ সে বিজ্ঞান শুধুমাত্র আরব ভূখণ্ডে চর্চিত হয়নি। আর কেবলমাত্র আরব জাতি-ই এর চর্চা করেনি। যদি বলা হয়, আরবি ভাষায় চর্চিত হতো বলে তা ‘আরব্য বিজ্ঞান’; তবে বর্ণনাটা সত্যের কাছাকাছি যায়। তবু মনে রাখতে হবে, সে সময় আরবি ছাড়া হিব্রু, সুরিয়ানি (সিরিয়ার ভাষা), ও ফার্সি ভাষাতেও বিজ্ঞান চর্চা হয়েছে। সব দিক বিবেচনায় মনে হয়, সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক শব্দ হিসেবে, ‘আরব্য বিজ্ঞান’ অভিধাটিই বেশি গ্রহণযোগ্য।
ভূমিকা
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৯৩) একজন ব্যতিক্রমী ভারত-তত্ত্ববিদ। ভারত হলো আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যবাদের লালনভূমি; বস্তুবাদী চিন্তা কিংবা অভিজ্ঞতা-নির্ভর প্রয়োগমুখী বিজ্ঞান চর্চা ভারতীয় ঐতিহ্য বিরোধী-ঔপনিবেশবাদী ভাবাদর্শের সমর্থনপুষ্ট প্রাধান্যশীল এ চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ জানান তিনি; প্রতিষ্ঠিত করেন ভারতীয় ঐতিহ্যের ভিন্ন পাঠ। তিনি ভারতীয় দর্শনের বস্তুবাদী ধারা এবং ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এসব করতে গিয়ে তিনি ভারতীয় দর্শন ও বিজ্ঞানের ইতিহাস চর্চার একটি নতুন মডেল নির্মাণ করেন। ভারতীয় বিদ্যাচর্চার আন্তর্জাতিক পরিসরে এই তাঁর পরিচয়। কিন্তু বাঙালি পাঠক মহলে এবং অনুবাদের মারফত ভারতের অন্য ভাষাভাষীদের মাঝে, তাঁর অন্য একটি পরিচিতি রয়েছে। তা হলো, তিনি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান-চেতনার পরিচয়বাহী অনেক জনপ্রিয় বইয়ের রচয়িতা। কৈশোর বা যৌবনে যারাই তার যে গল্পের শেষ নেই, আবিষ্কারের অভিযানে, বিজ্ঞান কি এবং কেন, সত্যের সন্ধানে মানুষ, এ-সব বই পড়েছেন, তাঁরাই এগুলোর ভাষার সাবলীলতা, যুক্তির তীক্ষ্ণতা, বোধের গভীরতা দ্বারা উদ্দীপিত না হয়ে পারেননি। সাধারণের মাঝে বিজ্ঞান-চেতনা প্রসারে এমন সুপরিকল্পিত ব্যাপক উদ্যোগ আর কোনো বাঙালি নিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা দেবীপ্রসাদের বিজ্ঞান-চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করব।
শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান/অতিকথা (মিথ) প্রচারের বিরুদ্ধে সঠিক বিজ্ঞান-চেতনার প্রসারই একমাত্র প্রতিষেধক।
প্রস্তুতিপর্ব
দেবীপ্রসাদ দর্শনের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments