প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরা
লেখক: তুষারকান্তি মহাপাত্র
অপরূপা ত্রিপুরা। অনুচ্চ পাহাড় ও শ্যামল বনানীর কোলে সেখানে নানা সংস্কৃতির মেলা। কোন স্মরণাতীত কালে ত্রিপুরায় এসে ঘর বেঁধেছিল কিরাত বা ইন্দো-মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী। তারপর এসেছে নানা জাতি ও ধর্মের মানুষ। নিজ নিজ সংস্কৃতি বজায় রেখেই সকলে মিলেছে, মিশেছে। ত্রিপুরা তাই নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারণভূমি। বাংলা-ত্রিপুরার দীর্ঘদিনের নিবিড় যোগ। আজ ত্রিপুরীর চেয়েও বাঙালির সংখ্যা সেখানে বেশি। বাঙালির প্রভাবে ত্রিপুরার উপজাতীয় মানুষ হিন্দুধর্ম ও বাংলাভাষা গ্রহণ করেছে এবং সেইসূত্রে বাঙালি সংস্কৃতি সেখানে পরমাদরে গৃহীত হয়েছে।
ভারতের পূর্বপ্রান্তীয় রাজ্য ত্রিপুরা। তার উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ তিন দিক ঘিরে বাংলাদেশ। শুধু পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে যথাক্রমে মিজোরাম ও আসাম। আয়তনে ত্রিপুরা অতিক্ষুদ্র (১০,৪৭৭ বর্গ কিমি); ভারতের মাত্র ০.৩ শতাংশ সে অধিকার করে আছে। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সর্বাধিক ১৮৪কিমি ও ১১৩ কিমি রাজ্যটির ৯৩০ কিমি জুড়ে আন্তর্জাতিক সীমান্ত। বাকি অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হলেও প্রায় পুরোপুরি পর্বতসঙ্কুল।
পাহাড় ও বন ত্রিপুরার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অসংখ্য টিলা ছাড়াও ছ'টি পর্বতশ্রেণী:প্রায় উনিশ কিমি ব্যবধানে সমান্তরালভাবে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়ে অবশেষে বাংলাদেশে এসে সমতলে মিশেছে। ফলে জম্পুই, সাখান্-ত্লাং, লংতরাই, আঠারমুড়া, বড়মুড়া পর্বতমালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে এ-রাজ্যকে যেন খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করেছে। মাটি ও বেলেপাথরে তৈরি পাহাড় ও টিলাগুলি অবশ্য খুব বেশি উঁচু নয়। পাহাড়ের গড় উচ্চতা ২০০ ফুট আর সর্ব্বোচ্চ শৃঙ্গ বেতলিং শিব-এর উচ্চতা ৩২০০ ফুট। এছাড়া ত্রিপুরার অধিকাংশ জুড়ে আছে চিরহরিৎ ও মিশ্র জাতীয় অরণ্য। বাঁশই সেখানে প্রধান হলেও শাল, গর্জন, গাম্ভার, জারুল, তুন, বেত ইত্যাদি গাছও প্রচুর। সংরক্ষিত বনভূমিতে রবার, মেহগিনি, সেগুন, শিশু, তুঁত ইত্যাদি গাছও আছে। সমতলের শ্যামলিমার সঙ্গে অরণ্যের শ্যামল মহিমা মিশে ত্রিপুরাকে সৌন্দর্যগর্বে গরীয়সী করে তুলেছে।
ত্রিপুরার চল্লিশ শতাংশ সমতলভূমি। নদীবাহিত পলিমাটি এই ভূমিকে উর্বরা করে তুলেছে। পূর্বদিক থেকে ধরলে উত্তর-দক্ষিণে আড়াআড়িভাবে বয়ে গেছে যথাক্রমে লঙ্গাই, দেও, মনু, ধলাই, খোয়াই এবং পূর্ব-পশ্চিমে হাওড়া, বুড়িমা, গোমতী, মুথুরি, ফেনী ইত্যাদি নদী। ১৪০ কিমি দীর্ঘ গোমতী ত্রিপুরার দীর্ঘতম নদী এবং ত্রিপুরাবাসীর কাছে গঙ্গার মতোই পবিত্র। কয়েকটি দক্ষিণবাহিনী ছোট নদী তার সঙ্গে এসে মিশেছে গোমতীর উৎসস্থান তীর্থমুখে আছে ‘ডম্বুর' নামে জলপ্রপাত। সৌন্দর্যপিপাসুর কাছে তীর্থমুখ রমণীয় আর পুণ্যার্থীর কাছে তীর্থস্থান। কেজো লোকের কাছেও তার মূল্য কম নয়। ডম্বুর থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে।
নদীগুলি পাহাড়ী হওয়ায় বর্ষাকালে প্লাবন ঘটিয়ে জমিতে পলিমাটি জমিয়ে তোলে। ত্রিপুরার ভূমি তাই খুব উর্বরা। কৃষির যোগ্য প্রায় চার লক্ষ হেক্টর জমি থাকলেও তার মাত্র তিন-চতুর্থাংশে চাষ-আবাদ হয় এবং কৃষিজ সম্পদই ত্রিপুরাবাসীর প্রধান ভরসা। ৭৫ শতাংশ মানুষ আজও কৃষিজীবী। এত পাহাড় ও বন কিন্তু তেমন অর্থকরী হয়ে উঠতে পারেনি। পাহাড় দিয়েছে কিছু নিম্নমানের কয়লা, চিনেমাটি ও চূণাপাথর এবং অল্প কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস। খনিজ তেল পাওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে অবশ্য ত্রিপুরাবাসীর দৈন্য ঘুচবে অথবা অন্তত তার লাঘব হবে। এ রাজ্যের ৮০ শতাংশ মানুষ আজও দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে।
বনজ সম্পদও ত্রিপুরার সমৃদ্ধির উপায় হয়ে উঠতে পারে নি। তার প্রধান কারণ দুর্গমতা, দূরত্ব ও পরিবহণ ব্যবস্থার অভাব। ভারতের এই অঙ্গরাজ্যটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগ সড়কপথে কাছাড় জেলার মধ্য দিয়ে একটি মাত্র পথ। ত্রিপুরায় রেলপথ নেই, গুয়াহাটি হয়ে ট্রেন এসে থেমে যায় প্রান্তিক শহর ধর্মনগরে। কলকাতা থেকে ১৪৫৩ কিমি পথ পার হয়ে এখানে আসতে লাগে আড়াই দিন। কলকাতা ও গুয়াহাটি থেকে আগরতলার সড়কপথের দূরত্বও যথাক্রমে ১৮০৮ ও ৫৯৭ কিমি। তাই বিমানপথই আজও ত্রিপুরার সঙ্গে যোগরক্ষার প্রধান ভরসা। এককালের ব্যস্ত ও সীমান্তবর্তী রেলস্টেশন আখাউড়া এখন বাংলাদেশে।
অখণ্ড বঙ্গের যে অঞ্চলটির
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments