বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বনাম বিশ্বযুদ্ধ

যদি বলি ১৯৭১ সালে একটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, তাহলে সম্ভবত কেউই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তবে একাত্তর সালটিকে যারা 'গণ্ডগোলের বছর আখ্যা দেয়, কিংবা যারা বলে যে ওই বছরে ভারতের উস্কানিতে একটা গৃহযুদ্ধ হয়ে তাদের সাধের পাকিস্তানটি ভেঙে গিয়েছিল—এমন কিছু অর্বাচীন মূৰ্খ বা ধুরন্ধর জ্ঞানপাপী বা কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী ছাড়া আর সবাই-যে ওই বছরটিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর বলে গৌরবে উদ্দীপ্ত হবেন—এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবু এরপরও আমি বলব: আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি শুধু আমাদেরই যুদ্ধ ছিল না, ছিল বিশ্বযুদ্ধেরই অংশ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রচলিত অর্থে যে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয় নি,—একথা অবশ্যই সত্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই যে বিশ্বব্যাপী বিরামহীন যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল, এবং কখনো সে-যুদ্ধের গতিবেগ মৃদু ও কখনো উগ্র হয়ে এখনো যে সে-যুদ্ধ চলছেই—একথাটি উপলব্ধি করতে না-পারলে কোনোমতেই প্রকৃত সত্যকে স্পর্শ করা যাবে না। স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ আখ্যা দেয়া হয়েছিল যাকে সেটি তো বিশ্বযুদ্ধেরই অন্যতর রূপ। কারণ সেই যুদ্ধের একপক্ষে ছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এবং বিপক্ষে ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী পুঁজিবাদী বিশ্ব। বিশ্বের এই দুই শিবিরের বাইরের দেশগুলোকেও দু'পক্ষের কোনো-না-কোনো দিকে ঝুঁকতেই হতো। এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের আমলে ও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায় পৃথিবীর অনেক এলাকাই-যে বোমার আওয়াজে প্রকম্পিত ও বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠত, এবং এভাবে যে গরম যুদ্ধগুলো সংঘটিত হতো সেগুলোকে ‘স্থানীয় যুদ্ধ' বলা হলেও প্রকৃতিগত দিক দিয়ে ছিল বিশ্বব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধেরই অংশীভূত। এ-সময়ে পৃথিবী থেকে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানও ঘটছিল ওই বিশ্বযুদ্ধের কল্যাণেই। সে-সময়কার বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক শিবির চেয়েছে যে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে সকল দেশ মুক্ত হোক, আর পুঁজিবাদী শিবির করেছে তার সক্রিয় বিরোধিতা। দুই যুযুধান শক্তির সমর্থন ও বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশে জাতীয় স্বাধীনতা-লাভের জন্য যে- যুদ্ধগুলো চলেছে, সে-গুলোর ভেতর বিশ্বযুদ্ধকে শনাক্ত করতে না-পারা দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই দৃষ্টি-বিভ্রম থেকে মুক্ত না-হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও বিশ্বযুদ্ধেরই অন্তর্গত একটি সংঘটন বলে চিনে নেয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না।

দুই

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশটির বিভক্তির মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেই যারা গদিনসীন হয়, শ্রেণীচরিত্রের বিচারে তাদের মধ্যে যে খুব একটা তফাৎ ছিল তেমনটি বলা যায় না। তবে অবস্থানগত ও চেতনাগত উভয় দিক দিয়েই পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্তৃত্বশীল গোষ্ঠীটি ভারতের শাসক বুর্জোয়াদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। ওরা ঠিক ঠিক বুর্জোয়াই হয়ে উঠতে পারে নি, ওদের শেকড় ছিল সামন্ততন্ত্রের ভেতরে প্রোথিত। ভারতীয় বুর্জোয়াদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে ওরা কিছুটা হীনম্মন্যতায়ও ভুগত। ওদের কথায় ও আচরণে সেই হীনম্মন্যতা নানাভাবেই ফুটে উঠত। পাকিস্তানের এই কর্তৃত্বশীল গোষ্ঠীর দুর্বলতার সুযোগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদ এই রাষ্ট্রটির ঘাড়ে খুব শক্তভাবেই চেপে বসে। পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি থেকে শুরু করে 'সিয়াটো' 'সেন্টো' পর্যন্ত বিভিন্ন চুক্তির নামে ইয়াংকিরা সাম্রাজ্যবাদের ফাঁসে পাকিস্তানকে এমনভাবেই আটকে ফেলল যে অতঃপর পাকিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলাটা একটা করুণ পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের শাসক বুর্জোয়াদের অবস্থান ছিল অনেক বেশি শক্ত। দীর্ঘদিনে ওরা জাতীয় বুর্জোয়া রূপে গড়ে উঠেছিল, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতাও ওরা অর্জন করেছিল। পাকিস্তানকে সাম্রাজ্যবাদীরা যেভাবে কবজা করে নিয়েছিল, ভারতের বেলায় তাদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয় নি। পাকিস্তান যখন সাম্রাজ্যবাদের বলয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ল, তখন ভারত হয়ে গেল 'জোট নিরপেক্ষ শিবির'-এর নেতা। কিন্তু, মনে রাখা উচিত, সে-সময়ে প্রকৃত জোট নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িত না-হয়ে পারা যেতো না। আর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী হতে হলে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সঙ্গে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice