তিরোলের বালা
মার্টিন কোম্পানির ছোটো লাইন।
গাড়ি ছাড়বার সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে, এখনও ছাড়বার ঘণ্টা পড়েনি। এ নিয়ে গাড়ির লোকজনের মধ্যে নানারকম মতামত চলেছে।
—মশাই বড়গেছে নেমে যাবো, প্রায় পাঁচমাইল; চারটে বাজে— এখনও গাড়ি ছাড়বার নামটি নেই— কখন বাড়ি পৌঁছব ভাবুন তো?
—এদের কাণ্ডই এইরকম, আসুন না সবাই মিলে একটু কাগজে লেখালেখি করি। সেদিন বড়গেছে ইস্টিশনে দুটো ট্রেনের লোক এক ট্রেনে পুরলে, দাঁড়াবার পর্যন্ত জায়গা নেই; তাও কদমতলায় এল এক ঘণ্টা লেট।
—ওই আপিসের সময়টা একটু টাইম মতো যায়, তার পর সব গাড়িরই সমান দশা—
—আঃ, কী ভুল যে করেছি মশাই এই লাইনে বাড়ি করে! রিটায়ার করলাম, কোথায় বাড়ি করি, কোথায় বাড়ি করি, আমার শ্বশুর বললেন, তাঁর গ্রামে বাড়ি করতে—
—সে কোথায় মশাই।
—এই প্রসাদপুর, যেখানে প্রসাদপুরের ঠাকুর আছেন, মেয়েদের ছেলেপুলে না হলে মাদুলি নিয়ে আসে, হাওড়া ময়দান থেকে পঁচিশ মাইল, বেশি না। ভাবলাম কলকাতার কাছে, সস্তাগণ্ডা হবে, পাড়াগাঁ জায়গা শ্বশুরবাড়ি সবাই রয়েছেন; তখন কি মশাই জানি? তিন-চার হাজার টাকা খরচ করে বাড়ি করলুম, দেখছি যেমনি ম্যালেরিয়া তেমনি যাতায়াতের কষ্ট, পঁচিশ মাইল আসতে পঁচিশ খেলা খেলছে। এই স্টুপিড গাড়িগুলো—
—পঁচিশ কী স্যার, তিন পঁচিশং পঁচাত্তর খেলা বলুন। আমারও পৈতৃক বাড়ি ওই প্রসাদপুরের কাছে নরোত্তমপুর। ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি, কান্না পায় এক-এক সময়—
আমি যাচ্ছিলাম চাঁপাডাঙা। লাইনের শেষ স্টেশন। এদের কথাবার্তা শুনে ভয় হল। স্টেশন থেকে চার মাইল দূরে দামোদর নদীর এপারেই আমার এক মাসিমা থাকেন। মেসোমশাই নাকি মৃত্যুশয্যায়, তাই চিঠি পেয়ে মাসিমার সনির্বন্ধ অনুরোধে সেখানে চলেছি। যে-রকম এরা বলছে, তাতে কখন সেখানে পৌঁছব কে জানে?
কামরার এক কোণের বেঞ্চিতে একটি যুবক ও তার সঙ্গে একটি সতেরো-আঠারো বছরের সুন্দরী মেয়ে বসেছিল। মেয়েটির পরনে সিল্কের ছাপা-শাড়ি, পায়ে মাদ্রাজি চটি, মাথার চুলগুলো যেন একটু হেলাগাছা ভাবে বাঁধা। সে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে ছিল। যুবকটি মাঝে মাঝে সকলের কথাবার্তা শুনছে, মাঝে মাঝে বাইরের দিকে চেয়ে ধূমপান করছে।
গাড়ি ছেড়ে তিন-চারটে স্টেশন এল। পান, পটল-আলু, মাছের পুঁটলি হাতে ডেলি প্যালেঞ্জারের দল ক্রমে নেমে যাচ্ছে। বাকি দল এখনও সামনাসামনি বেঞ্চিতে মুখোমুখি বসে কোঁচার কাপড় মেলে তাস খেলছে। মাঝে মাঝে ওদের হুংকার শোনা যাচ্ছে, ইঞ্জিনের ঝকঝক শব্দ ভেদ করে— টু হার্টস! নো ট্রাম্প! থ্রি স্পেডস!
যখন জাঙ্গিপাড়া গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, তখন বেলা যায় যায়। জাঙ্গিপাড়া স্টেশনের সামনে বড়ো দিঘিটার ধারের তালগাছগুলোর গায়ে রাঙা রোদ।
শেষ ডেলি প্যাসেঞ্জারটি জাঙ্গিপাড়ায় নেমে যাওয়াতে গাড়ি খালি হয়ে গেল। একেবারে খালি নয়, কারণ রইলাম কেবল আমি। কোণের বেঞ্চির দিকে চেয়ে দেখি সেই যুবক ও তার সঙ্গিনী মেয়েটিও রয়েছে।
এতক্ষণ ডেলি প্যাসেঞ্জারদের গল্পগুজব শুনতে শুনতে আসছিলাম বেশ, এখন তারা সবাই নেমে গিয়েছে, আমি প্রায়ই একাই। এখন স্বভাবতই যুবক ও মেয়েটির প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট হল। মেয়েটি বিবাহিতা নয়। সে তো বেশ দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছে! তবে ওদের সম্বন্ধ কি ভাই-বোন? কিংবা মামা-ভাগনি? মেয়েটি বেশ সুন্দরী। ছোকরা মেয়েটিকে ভুলিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে না তো? আশ্চর্য নয়। আজকালকার ছেলে-ছোকরাদের কাণ্ড তো?
যাকগে, আমার সে-সব ভাবনার দরকার কী? নিজের কী হবে তার নেই ঠিক! সন্ধ্যা তো হয়ে এল। মাসিমাদের গ্রাম স্টেশন থেকে দুই-তিন মাইল, পথও সুগম নয়। ট্রেন আঁটপুর এসে দাঁড়াল, জাঙ্গিপাড়ার পরের স্টেশন। তারপর ছাড়ল। বড়ো বড়ো ফাঁকা রাঢ়দেশের মাঠে সন্ধ্যা নেমে আসছে, লাইনের ধারে ক্বচিৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাষা-গাঁ; লাউলতা চালে উঠেছে। একটা ছোট্ট গ্রাম্য হাট ভেঙে লোকজন ধামা, চেঙারি মাথায় ফিরছে; আবার মাঠ, জামগাছের মাথায় কালো বাদুড় উড়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments