বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান
লেখক: দুলাল ভৌমিক
দেশ ও জাতির স্বার্থে, এমনকি আমাদের জীবন ও জীবিকার স্বার্থেও ১৯৭১ সনে আমরা পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করেছিলাম। সে লড়াইয়ে জিতেছিলাম বলেই আজ বাংলাদেশ স্বাধীন, বাঙালি জাতি স্বাধীন; আজ আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই তালগাছের মতো বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু হেরে গেলে বাঙালি জাতি যে বিশ্বমানচিত্র থেকে মুছে যেত, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। জেতার পরেও বারংবার ভুলের কারণে আমাদের অস্তিত্ব আজ সঙ্কটের সম্মুখীন। তবে আশা-এ সঙ্কট একদিন কেটে যাবে।
আমরা যুদ্ধ করেছিলাম আমাদের স্বার্থে। আমাদের রাজনৈতিক মুক্তির স্বার্থে, অথনৈতিক মুক্তির স্বার্থে, বাঙালির সভ্যতা-সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে। কিন্তু অবাঙালি ও অবাংলাদেশী অনেক ব্যক্তি এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন কেবলই মানবতার স্বার্থে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ হ্যারিসন, ভারতের পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং আরও অনেকের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। শুধু ব্যক্তিই নন, অনেক প্রতিষ্ঠানও প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে আন্তরিকভাবে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। তার সব খবর হয়তো আমরা পাইনি, কিংবা পেলেও অনেক খবর ভুলে গেছি। তেমনি একটি অজানা কিংবা ভুলে যাওয়া খবর জানানোর উদ্দেশ্যেই এ প্রবন্ধের অবতারণা।
১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু। এর মাত্র সাতদিন পরেই ৩ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হয় 'কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি' নামে একটি সাহায্য সংস্থা। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, তদনুমোদিত কলেজসমূহের শিক্ষকবৃন্দ এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দের এক যৌথ সভায় এ সমিতি গঠিত হয়। সমিতির সভাপতি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ সেন স্বয়ং। অন্যান্য পদে ছিলেন কার্যনির্বাহী সভাপতি উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক পি কে বোস, কোষাধ্যক্ষ উপউপাচার্য (অর্থ) শ্রী হীরেন্দ্রমোহন মজুমদার, সম্পাদক অধ্যাপক ডি কে চক্রবর্তী এবং যুগ্ম-সম্পাদকবৃন্দ অধ্যাপক ইলা মিত্র, অধ্যাপক এসএন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক এস কে মিত্র ও অধ্যাপক এস দাশগুপ্ত। দীর্ঘ নয় মাস দায়িত্ব পালনের পর ১৪ ডিসেম্বর সমিতি ইংরেজি ভাষায় ৪৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি 'ভারত ফটোটাইপ স্টুডিও' (৭২-১, কলেজ স্ট্রিট, কলিকাতা-১২)-তে মুদ্রিত এবং দ্বারভাঙা বিল্ডিং, কলিকাতা-১২ থেকে প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রবন্ধটি রচিত।
সমিতি গঠনের উদ্দেশ্য
১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট' (ইয়াহিয়া সরকার ২৫ মার্চ রাতের বাঙালি নিধনের এই নাম দিয়েছিল) শুরুর আগেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে অনেক রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। অপারেশন শুরুর পরে সঙ্গত কারণেই এর মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং জ্ঞাত তথ্যমতে এক কোটির ওপর বাংলাদেশী শরণার্থী ভারতের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে নানা শ্রেণী ও পেশার লোক ছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল থেকে অনেক শিক্ষকও ছিলেন তাদের মধ্যে। প্রধানত এসব প্রবাসী শিক্ষকের সাহায্যার্থেই এই সহায়ক সমিতি গঠিত হয়েছিল। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ শরণার্থীদেরও যথাসাধ্য সাহায্য করা হয়েছে এর মাধ্যমে।
বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য তখন ভারতে আরও কয়েকটি সংগঠন/সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেমন-বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতি (পুনা), বাংলাদেশ এইড কমিটি (বোম্বে), ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি ফর বাংলাদেশ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতি (বোম্বে শাখা), বোম্বে ইউনিভার্সিটি কমিটি, বাংলাদেশ সংগ্রাম সহায়ক সমিতি (লেক গার্ডেন, কোলকাতা), Bangladesh Fact Finding Committee, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতি নিজস্ব কর্মসূচির বাইরে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে। এসব সংগঠন মূলত এই সমিতির মাধ্যমেই তাদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করত। ভারতের বাইরের কিছু সংগঠনও এর মাধ্যমেই সাহায্য করেছে, যেমন-Friends of the Bangladesh Movement (শিকাগো), Friends of Dacca University (লন্ডন), Bangladesh Students' Action Council (লন্ডন), Out to the People (শ্রীলঙ্কা), Bangladesh Green Cross (লন্ডন)।
সহায়ক সমিতির কর্মকাণ্ড মূলত সাতভাগে বিভক্ত ছিল, যথা- (১) সমর্থন, প্রচার ও সাহায্যের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments