স্তাঁদাল
সুখ চাইলেই কি সুখ পাওয়া যায়? সুখের পিছনে ছুটলেই কি সুখকে ধরা যায়? না, যায় না। একথা আমরা সকলেই বুঝি। তবু অনেকেই আমরা সারা জীবন সুখের পিছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত ও করুণ, ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত। এভাবে যে সুখ পাওয়া যায় না তা আমরা বুঝেও বুঝি না। আমাদের অনেকের মতই উনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসী কথা-সাহিত্যিক স্তাঁদাল-ও বোধহয় বোঝেন নি। ম্যাথ্যু জোসেফ্সন স্তাঁদাল-এর যে জীবনী লিখেছেন তার নাম দিয়েছেন ‘স্তাঁদাল অথবা সুখের অন্বেষণ।’ এবং আমাদের মনে হয় তাঁর জীবন-কথার এই নামকরণ সঙ্গতই হয়েছে।
স্তাঁদাল-এর লেখার সঙ্গে আমাদের দেশের যথেষ্ট শিক্ষিত ও সাহিত্য সম্বন্ধে বিশেষ আগ্রহী ব্যক্তি ছাড়া সাধারণের পরিচয় অল্পই আছে। তাঁর প্রধান প্রধান পুস্তক আমাদের দেশে অনূদিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অথচ ইওরোপে রসিক সমাজে তাঁর লেখা বিশেষভাবে সমাদৃত। তাঁর নিজ দেশে তিনি অন্যতম সাহিত্যগুরু বলে বিবেচিত। জোলা বলেছেন, উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রকৃতিবাদী ধারা-সৃষ্টির তিনিই হচ্ছেন জনক। বুর্জে (Bourget) ও আঁদ্রে জিদ্-এর মতে তিনিই প্রথম সত্যিকার মনস্তত্বমূলক উপন্যাস রচনা করেন।
স্তাঁদাল কিন্তু জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না। তাঁর জীবিতকালে তিনি লেখক হিসাবে সাফল্যলাভ করতে পারেন নি। প্রায় চল্লিশ বছর বয়সের সময় প্রকাশিত তাঁর প্রথম পুস্তক ‘দ্য লামুর’ (De l’ Amour) সমালোচক এবং জনসাধারণ—কারো দৃষ্টিই আকর্ষণ করতে সমর্থ হয় নি। দীর্ঘ এগারো বছরে মাত্র সতেরো কপি এই বই বিক্রি হয়েছিল। তাঁর প্রায় শেষ বয়সের লেখা ‘ল্য রুজ এ ল্য নোয়ার’ (Le Rouge et le Noir) ও ‘লা শার্ৎর্যজ দ্য পারম্’ (La chartreuse de Parme)—যা পরবর্তীকালে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছে, তাঁর জীবদ্দশায় দেশে তেমন কোনোই সাড়া জাগাতে পারে নি। অবশ্য বালজাক স্তাঁদাল-এর জীবিতকালেই তাঁর ‘লা শাৎর্যজ দ্য পারম্’-এর প্রশংসা করে একটি সুন্দর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তবে অনেকে মনে করেন স্তাঁদাল বালজাককে যে তিন হাজার ফ্রাঁ ধার দিয়েছিলেন সেই ঘটনাই এই প্রবন্ধ-রচনার মূল প্রেরণা। সে যাই হোক, বালজাক-এর এই প্রবন্ধও কিন্তু স্তাঁদাল-কে তাঁর সমকালে খ্যাতি দান করতে পারে নি। ১৮৪২ সালে স্তাঁদাল-এর যখন মৃত্যু হয় তখন পারী-র দুটি কাগজে মাত্র এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বন্ধু মেরিমেয়-কে নিয়ে মাত্র তিনজন লোক বোধহয় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্তাঁদাল-এর খ্যাতি হয় তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে। জীবিতকালেই যাঁর নাম বড় একটা কেউ জানতো না, মৃত্যুর পর তিনি প্রায় সম্পূর্ণই বিস্মৃত হয়েছিলেন। অনেককাল পরে ইপলিৎ ত্যেন (Hippolyte Taine) তাঁর সম্বন্ধে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধে তিনি বিশেষ করে স্তাঁদাল-এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টির পর্যালোচনা ও প্রশংসা করেন। ত্যেন-এর এই প্রবন্ধের পর স্তাঁদাল সম্বন্ধে প্রচুর গবেষণা হয়। এবং অতঃপর তিনি উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ তিনজন ঔপন্যাসিকের অন্যতম বিবেচিত হন।
ঔপন্যাসিক হিসাবে তাঁর সমকালে স্তাঁদাল-এর ব্যর্থতার কারণ বোধহয় তাঁর গল্পবলার শক্তির অভাব। স্তাঁদাল একেবারেই গল্প বানাতে পারতেন না। তাঁর উপন্যাসের প্লট বা গল্প তিনি সাধারণত অপরের বই থেকে অথবা সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে সংগ্রহ করতেন। তাছাড়া সেটা ছিল রোমান্টিসিজমের যুগ। স্তাঁদাল যদিও রোমান্টিক ভাবাদর্শের প্রভাব এড়াতে পারেন নি, তা হলেও স্বভাবত তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। তাঁর তীক্ষ্ণ তির্যক বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গী ও বিশ্লেষণ তখনকার দিনে সম্যক সমাদৃত না-হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তাঁর ভাষাও ছিল অত্যন্ত সংযত ও সাদামাটা। ভাষায় অলঙ্করণ তিনি একেবারে পছন্দ করতেন না। বলা বাহুল্য, এটা সাধারণের শ্রদ্ধা ও দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত নয়। এর উপর সাধারণ পাঠককে ঔপন্যাসিকের যে-গুণ সর্বাধিক আকৃষ্ট করে সেই গল্প-রচনার দুর্বলতা তো তাঁর ছিলই।
কিন্তু গল্প-রচনায় তাঁর যত দুর্বলতাই থাক, মানব-মনের গলিঘুঁজি সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান ছিল অপরিসীম; বিস্ময়কর বললেও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments