-
বেলা ব’য়ে যায়,
গোধূলির মেঘ-সীমানায়
ধূম্রমৌন সাঁঝে
নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে,
শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে;
পান্থ ম্লান চিতার কবলে
একে-একে ডুবে যায় দেশ জাতি সংসার সমাজ;
কার লাগি, হে সমাধি, তুমি একা ব’সে আছো আজ—
কি এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!
অতীতের শোভাযাত্রা কোথায় কখন
চকিতে মিলায়ে গেছে পাও নাই টের;
কোন্ দিবা অবসানে গৌরবের লক্ষ মুসাফের
দেউটি নিভায়ে গেছে—চ’লে গেছে দেউল ত্যজিয়া,
চ’লে গেছে প্রিয়তম—চ’লে গেছে প্রিয়া
যুগান্তের মণিময় গেহবাস ছাড়ি
চকিতে চলিয়া গেছে বাসনা-পসারী
কবে কোন বেলাশেষে হায়
দূর অস্তশেখরের গায়।
তোমারে যায়নি তা’রা শেষ অভিনন্দনের অর্ঘ্য সমর্পিয়া;
সাঁঝের নীহারনীল সমুদ্র মথিয়া
মরমে পশেনি তব তাহাদের বিদায়ের
-
সেদিন এ-ধরণীর
সবুজ দ্বীপের ছায়া—উতরোল তরঙ্গের ভিড়
মোর চোখে জেগে-জেগে ধীরে-ধীরে হ’লো অপহত
কুয়াশায় ঝ’রে পড়া আতসের মতো।
দিকে-দিকে ডুবে গেল কোলাহল,
সহসা উজানজলে ভাটা গেল ভাসি,
অতিদূর আকাশের মুখখানা আসি
বুকে মোর তুলে গেল যেন হাহাকার।
সেইদিন মোর অভিসার
মৃত্তিকার শূন্য পেয়ালার ব্যথা একাকারে ভেঙে
বকের পাখার মতো শাদা লঘু মেঘে
ভেসেছিলো আতুর উদাসী;
বনের ছায়ার নিচে ভাসে কার ভিজে চোখ
কাঁদে কার বাঁরোয়ার বাঁশি
সেদিন শুনিনি তাহা;
ক্ষুধাতুর দুটি আঁখি তুলে
অতিদূর তারকার কামনায় আঁখি মোর দিয়েছিনু খুলে।
আমার এ শিরা-উপশিরা
চকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন,
শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন—
মোর তরে পিছু ডাক মাটি-মা—তোমার;
-
জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজআমি তাে জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজমাটিতে লালিত, ভীরু শুধু আজ আকাশের ডাকেমেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।যদিও নগণ্য আমি তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজেতবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গােপনে মর্মরধ্বনি বাজে।বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলাের আনাগােনাশিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনাআজ শুধু অঙ্কুরিত; জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতাউদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা।তারপর দৃপ্ত শাখা মেলে দেবাে সবার সম্মুখেফোটাবাে বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে।সংহত কঠিন ঝড়ে, দৃঢ় প্রাণ প্রত্যেক শিকড়শাখায় শাখায় বাধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়,অঙ্কুরিত বন্ধু যতাে মাথা তুলে আমারই আহ্বানেজানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।আগামী বসন্তে জেনাে মিশে যাবাে
-
কালাে মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায়ভীত মন খোজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখতাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্ত্যলােককেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায়।অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণেতীব্র ভ্রুকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে;অভিশাপময় যে সব আত্মা আজো অধীরতাদেয় সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবিরনিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে।চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে সব দিনেতাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,হীন স্পধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে—ছিনিয়ে আমায় নিতে পারাে আজো সুযােগ পেলেতাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখিনি ঋণে।অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রােদনেনরম সােফায় বিপ্লবী মন উদ্বোধনে;আজকে কিন্তু জনতা জোয়ারে দোলে প্লাবননিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনুধাবনকরেছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশােধনে।অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু
-
সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্য প্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।
বলতে পারা যায় কি এই সম্যক কল্পনা-আভা কোথা থেকে আসে? কেউ কেউ বলেন, আসে পরমেশ্বরের কাছ থেকে। সে কথা যদি স্বীকার করি তাহলে একটি সুন্দর জটিল পাককে যেন
-
নিরবচ্ছিন্ন বিরতিতে ভোর হয় সকাল,
সকাল গড়িয়ে বিকেল।
এরপর বিক্ষিপ্ত সন্ধ্যা।
আবারো কালো রাতের আঁধার ফুঁড়ে
আসে নতুন ভোর।
ভোর মানেই শান্তি-স্বস্তি,
শান্ত-নিথর নিষ্কলুষ গাম্ভীর্য,
—তোমার স্বপ্নমাখা ঘুম।
-
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহস্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহবিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই নেই ভয়পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়—আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্যবাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্যসঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্করতাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখরএ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বারপথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভারক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসেঅবিশ্রান্ত; একে একে হয়
-
মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।
পাহাড়, সাগর, নদী প্রান্তর জুড়ে—
আমরা জেগেছি, নবচেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে জ্বলি,
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।
কায়েমি স্বার্থবাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,
জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।
গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথে কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা—
আমরা ভেঙেছি, জয় বাংলার যত বিজয়ের বাধা।
কায়েমি স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো—
সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে—
চিরবিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।
আনো দেখি সাত কোটি এই দাবির মৃত্যু তুমি,
চিরবিজয়ের
-
তোমার অশরীরি উপস্থিতি কি ভয়ঙ্কর!
না, ভয়ের কিছু নেই, আমি ভূত-প্রেতের কথা বলছি না।
বলছি, তোমার শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে
অশরীরী উপস্থিতি আমাকে নিয়ত উদ্বিগ্ন করে।
যখন ছিলে, ভাবনা বলতে ছিল শুধু—তুমি আছো।
আর আজ যখন নেই, অষ্টপ্রহর ভাবনা—তুমি নেই, অথচ ছিলে।
-
নতজানু আকাশ যখন মেশে আবছা দূর সমুদ্রে
তখন ঢেউভাঙা সফেদ ফেনারা আছড়ে পড়ে আমার পা'য়।
আমি অবাক হয়ে খুঁজে ফিরি তমশার মতো এক অনুজ্জ্বল আলোক।
পাই না তারে, বেহুদা সময় হারিয়ে যায় না-ফেরা অন্ধকারে।
অপ্রকাশিত যত কথা অচেনা আগন্তুকের মতো কড়া নেড়ে যায়,
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রই।
আমাদের মিথোজীবি জীবনের ক্লান্ত-নিশ্চল অবসরগুলো
বইয়ে চলেছে অনিবার্য ভুল, যার নেই কোনো ক্ষমা।
-
বহুদিন পর কবিতার কোলে ঘুমিয়েছি।
ছোট্ট অবোধ শিশুটির মতো
আধশোয়া হয়ে স্বপ্নঘুমে কাটিয়েছি রাত্র।
রাত যখন জেগে রয় সারারাত ধরে
আমি তখন স্বপ্নঘুমে কবিতার কোলে।
তুমি যখন ছিলে বেদনার মতো আষ্টেপৃষ্টে
তখন সুখের অসুখে নির্ঘুম রাত্রির সাথে
কথায় কথায় ভোর হতো পুবের অদেখা স্নিগ্ধ আলোয়।
ক্লান্ত রাত ফুরুতো আঁধারের রঙে আলোর মিশেলে
তবুও অক্লান্ত প্রেম তোমার চোখজুড়ে
নতুন আলোয় নিষ্পলক চেয়ে রয় সদাই।
আমি সারাটিদিন ধরে আবার ফিরে যাই জীবনের কোলাহলে
এভাবে কত কত নির্ঘুম রাতের পর আজ স্বপ্নঘুমে
কবিতার মতো তোমার কোলে অবোধ শিশুটির মতো
জড়োসড়ো হয়ে আশ্রয় নিয়েছি নিয়তির নিরুদ্দেশে।
-
ভীষণ জ্যোৎস্নায় মাতোয়ারা উদাসী জীবনানন্দ মন।
অনাহারী সুকান্ত হৃদয়ে তা আজো সাদা রুটিই রয়ে গেছে।
আর আমি মেঘমুক্ত জোছনার বাঁধভাঙা আলোয়
রঙচটা কাপড়গুলি শুকিয়ে নিচ্ছি অনায়াসে।
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- কাইফি আজমি (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (৫)
- জীবনানন্দ দাস (১০)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১)
- বিষ্ণু দে (১)
- মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- মলয় রায়চৌধুরী (১)
- মেহেরুন নেসা (১)
- যতীন সরকার (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- শামসুর রাহমান (১)
- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সুকান্ত ভট্টাচার্য (৯)
- হরবোলা (১০)
- হাফেজ শিরাজি (১)
- হাসান মুরশিদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.