-
—’এই সেই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির বাড়ি।’
আমি সবিস্ময়ে সেই ভগ্নস্তূপের পানে চাহিয়া দেখিলাম। এই সেই প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির বাড়ি? সহজে বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারিলাম না। দিনান্তের অস্পষ্ট আলোক যাই যাই করিয়াও আকাশের পশ্চিমপ্রান্তে তখনও অপেক্ষা করিতেছিল। পরিশ্রান্ত বিহগকুলের অবিশ্রাম কূজনধ্বনি রহিয়া রহিয়া তখনও আকাশ-বাতাস মথিত করিয়া দিতেছিল। গঙ্গার অপূর্ব তরঙ্গভঙ্গ চিত্তলোকে এক অজ্ঞাতচেতনার সঞ্চার করিতেছিল। সেই প্রদোষের ম্লান দ্যুতিবিকাশের অন্তরালে আমি প্রাতঃস্মরণীয় সুবিখ্যাত প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির প্রাসাদের পানে চাহিয়া দেখিলাম। গঙ্গার ঠিক তীরভূমিতে অগণিত লতাপল্লবে মণ্ডিত হতশ্রী প্রতাপনারায়ণ চৌধুরির প্রসাদ নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া আছে। নদীস্রোতের অবিরাম আঘাতে সে প্রাসাদের অনেকখানিই ভাঙিয়া চুরিয়া কোন অনির্দেশের পথে বহিয়া গিয়াছে। অতীতের সাক্ষ্যস্বরূপ যাহা এখনও বর্তমান আছে, তাহা
-
মৌচাকের জন্যে গল্প চেয়েছেন, একটা ভূতের গল্প হলে ভালো হয় লিখেছেন। গল্প একটা দেবো, তবে ভূতের নয়, এবং গল্প নয়— সত্য ঘটনা।
লাহোর মিউজিয়ামে যখন চাকুরি করতাম, সে সময় লাহোরের বিখ্যাত ‘দেশবন্ধু’ কাগজের সম্পাদক বিনায়ক দত্ত সিং মহাশয়ের সঙ্গে আমার যথেষ্ট আলাপ হয়। মি. সিং প্রাচীন সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান, তাঁদের আদি বাসভূমি পাঞ্জাবে নয়, রাজপুতনার কোটা রাজ্যে। তিন পুরুষ পূর্বে তাঁর পিতামহ রাজকার্য উপলক্ষ্যে এসে পাঞ্জাবে বাস করেন। সেই থেকেই তাঁর দেশ ছাড়া। সন্ধ্যার পর তাঁর বৈঠকখানায় গিয়ে বসতাম এবং দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো আমলের বর্ম, কুঠার, পতাকা, বল্লম প্রভৃতি রাজপুতের যুদ্ধাস্ত্র সম্বন্ধে নানা ইতিহাস ও আলোচনা শুনতে বড়ো ভালো লাগত।
-
আমার বন্ধুর মুখে শোনা এ গল্প। বন্ধুটি বর্তমানে কলকাতার কোনো কলেজের প্রফেসার। বেশ বুদ্ধিমান, বিশেষ কোনোরকম অনুভূতির ধার ধারেন না, উগ্র বৈষয়িকতা না থাকলেও জীবনকে উপভোগ করার আগ্রহ আছে, সে কৌশলও জানা আছে।
সেদিন রাত্রে ঝম-ঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল। নানারকম গল্প হচ্ছিল গরম চা ও আনুষঙ্গিক খাদ্যের সঙ্গে মজিয়ে। অবিশ্যি ভূতের গল্পই হচ্ছিল। আমার বন্ধু একটা গল্প বললেন, আশ্চর্য লাগল গল্পটা। একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক যখন এই গল্পটা করলেন তখন এর একটা মূল্য আছে ভেবেই এই গল্পটা বলছি। তাঁর নিজের কথাতেই বলি —
সেবার আমি বিএ পরীক্ষা দিচ্ছি, অনার্স পরীক্ষা হয়ে যাবার পর দিন চার-পাঁচ ছুটি পাওয়া গেল। কীসের ছুটি তা
-
অনেকদিন পর সতীশের সঙ্গে দেখা। বেচারা হন্তদন্ত হয়ে ভিড় ঠেলে বিকাল বেলা বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের বাঁ-দিকের ফুটপাথ দিয়ে উত্তর মুখে চলেছিল। সমস্ত আপিসের সবেমাত্র ছুটি হয়েছে। শীতকাল। আধো-অন্ধকার আধো-আলোয় পথ ছেয়ে ছিল। ক্লান্ত দেহে ছ্যাকরা গাড়ির মতো ধীরে ধীরে পথ ভেদ করে চলেছিলাম। সহসা সতীশকে দেখে ওর জামাটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম— আরে সতীশ যে!
সতীশ সবিস্ময়ে আমার পানে চেয়ে বলে উঠল— খগেন! মাই গড! আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম!
বললাম— তার প্রমাণ আমাকে ধাক্কা দিয়েই তুমি চলে গেছিলে আর একটু হলে! ভাগ্যিস ডাকলাম!
—সরি! আমি একটু বিশেষ ব্যস্ত।
—তা সে বুঝতেই পারছি। তা, কোথায় চলেছ শুনি?
—তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।
-
এক জোলা ছিল, সে পিঠে খেতে বড় ভালবাসত।
একদিন সে তার মাকে বলল, 'মা আমার বড্ড পিঠে খেতে ইচ্ছে করছে, আমাকে পিঠে করে দাও।'
সেইদিন তার মা তাকে লাল-লাল, গোল, চ্যাপটা সাতখানি চমৎকার পিঠে করে দিল। জোলা সেই পিঠে পেয়ে ভারি খুসি হয়ে নাচতে লাগল আর বলতে লাগল, 'একটা খাব, দুটো খাব, সাত বেটাকে চিবিয়ে খাব!' জোলার মা বলল, 'খালি নাচবিই যদি, তবে খাবি কখন?' জোলা বলল, 'খাব কি এখানে? সবাই যেখানে দেখতে পাবে, সেখানে গিয়ে খাব।' ব'লে জোলা পিঠেগুলি নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আর বলতে লাগল, 'একটা খাব, দুটো খাব, সাত বেটাকেই চিবিয়ে খাব!'
নাচতে নাচতে
-
কেদার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন-'আজকাল তোমরা সামান্য একটু বিদ্যে শিখে নাস্তিক হয়েছ, কিছুই মানতে চাও না। যখন আর একটু শিখবে তখন বুঝবে যে আত্মা আছেন। ভূত, পেতনি-এঁরাও আছেন। বেম্মদত্যি, স্কন্ধকাটা-এঁনারাও আছেন।'
বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় গল্প চলিতেছিল। তাঁহার শালা নগেন বলিল-'আচ্ছা বিনোদ-দা, আপনি ভূত বিশ্বাস করেন?'
বিনোদ বলিলেন-'যখন প্রত্যক্ষ দেখব তখন বিশ্বাস করব। তার আগে হাঁ-না কিছুই বলতে পারি না।'
চাটুজ্যে বলিলেন-'এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ওকালতি কর! বলি, তোমার প্রপিতামহকে প্রত্যক্ষ করেছ? ম্যাকডোনাল্ড, চার্চিল আর বান্ডুইনকে দেখেছ? তবে তাদের কথা নিয়ে অত মাতামাতি কর কেন?'
'আচ্ছা আচ্ছা, হার মানছি চাটুজ্যে মশায়।'
'আপ্তবাক্য মানতে হয়। আরে, প্রত্যক্ষ করা কি যার তার কম্ম? শ্রীভগবান কখনও
-
একজন গরীব কাঠুরে ছিল। সে রোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঠ কাটত। কাঠ কেটে যখন তার কিছু টাকা জমল, তখন সে সেই টাকা দিয়ে তার ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিল শহরে লেখাপড়া শিখতে।
ছেলে খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করে, তার বেশ নামও হচ্ছে, এর মধ্যে তার বাবার টাকা গেল ফুরিয়ে। কাজেই তার লেখাপড়া শেখা হল না, সে বাড়ি ফিরে এল। কাঠুরেরও তাতে বড় দুঃখ হল। ছেলেটি তাকে এই বলে সান্ত্বনা দিল, 'তার জন্য ভাবছ কেন বাবা? যদি কপালে থাকে, ঢের লেখাপড়া হবে। এখন চল 'কাঠ কাটতে যাই।' কাঠুরে বলে, 'তোমার গিয়ে কাজ নেই। কখনো কাঠ কাটোনি, এত পরিশ্রম করতে তুমি কি পারবে?
-
আর সকলের বিবৃতি শেষ হইলে শৈলেনের উপর তাগাদা হইল, 'এবার এ-বিষয়ে তোমার কি অভিজ্ঞতা আছে বল।'
শৈলেন বলিল, 'আমায় বরং ছেড়ে দাও।'
সুধেন প্রশ্ন করিল, 'তার কারণ?'
শৈলেন বলিল, 'আমি যদি কিছু বলতে যাই, তোমরা তার মধ্যে নিশ্চয় কোন গল্পের প্লট আছে মনে করে বসো। ফলে এমন সন্দেহের সঙ্গে প্রত্যেক কথাটি শোন তোমরা যে, আমি বলে কোনও আরামই পাই না। কোথায় ভরা বিশ্বাসে মন দিয়ে শুনবে, না কেবলই আমার প্লটের ফাঁকি ধরে ফেলবার চেষ্টা! যখন সত্যিই কোনও গল্প হাঁকড়াই, তখন এটা সহ্য করা যায়, কিন্তু যখন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি, তখনও যদি--'
তারাপদ বলিল, 'এতে অভিমানের কিছু নেই, এ
-
খগেন্দ্রনাথ মিত্র
কর্তাবাবুর অনেক সম্পত্তি, বয়সও অনেক, পাড়ার লোকে খাতিরও করে খুব। বাড়িতে চাকর-বাকর, ঝি-রাঁধুনিও কম নয়। তারা থাকে মস্ত তেতলা বাড়িখানার নিচুতলার অন্ধকার দিকটাতে। আর, তিনি তাঁর পরিবারবর্গসহ থাকেন, মানে ছেলে-মেয়ে, পুত্র-পুত্রবধূ, নাতি-নাতনী প্রভৃতিদের নিয়ে দোতলা-তেতলা জুড়ে।
সব কালেরই পয়সাওলাদের নাতি-নাতনীরা হয় এক একটা ক্ষুদে নবাবজাদা ও নবাবজাদী। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ শখ করে গরিবী চালও চালে। যেমন কর্তবাবুর নাতি তরু, নাতনী অরু। ওরা দু'জনে খুড়তুতো ভাই-বোন। ওদের অনেক বন্ধু-বান্ধবী। তারা কেউ পয়সাওলা, কেউ আধা-পয়সাওলা, কেউ আধা-গরীব, কেউ পুরো গরীব। তরু-অরুদের বাড়িতে তিনখানা মোটর, চারখানা স্কুটার ও তিনখানা বাইসাইকেল। তবু ওরা তাতে চড়ে না, চড়ে ট্রামে-বাসে, ট্যাকসিতে, রিশয়।
-
শিবু-মোক্তার আর বেণী-মোক্তারকে মহকুমার সকলেই চিনত, তাদের মতো ধূর্ত ধড়িবাজ লোক ও তল্লাটে আর ছিল না। লোকে যেমন তাদের চিনত তেমনি ভয়ও করত। একবার তাদের পাল্লায় পড়লে আর কারুর রক্ষে ছিল না—জোঁক যেমন গা থেকে রক্ত শুষে নেয় অথচ জানতে পারা যায় না, তারাও তেমনি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে টাকা শুষে মক্কেলকে সর্বস্বান্ত করে দিত।
আদালতে দু'জনের মধ্যে রেষারেষি চলত, আবার বাইরে ভাবও ছিল। কিন্তু শিবু মক্কেলকে বলত, ‘বেণীটা জানে কি? ওকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেব।' আবার বেণীও নিজের মক্কেলকে বলত, 'শিবুটা একটা আস্ত গাধা— আইনের প্যাঁচে ফেলে ওর দফা রফা করব।' —কিন্তু সন্ধেবেলা একজন আর একজনের দাওয়ায় বসে তামাক না
-
বিশ্বনাথ পাড়াগাঁয়ের ছেলে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুপুররাত্রে বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সে তিন ক্রোশ অনায়াসে বেড়িয়ে আসতে পারে। অমাবস্যায় গ্রামের সীমানার শ্মশান থেকে মড়া পোড়ানো কাঠ সে কতবার বাজি ধরে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ভয় তার শুধু কলকাতা শহরকে।
যেখানে দু'পা এগুতে হলে মানুষের গায়ে ধাক্কা লাগে, ইলেক্ট্রক আর গ্যাস লাইটের কল্যাণে যেখানে দিন কি রাত চেনবার জো নেই বল্লেই হয়, সেইখানেই একরাতে সে যা বিপদে পড়েছিল।
বিশ্বনাথ বলে, 'না, কলকাতা শহরে সন্ধ্যার পর বেরুনো নিরাপদ না।' আমরা হেসে উঠলে বলে, 'না হে না, চৌরঙ্গি, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ- এর কথা বলছি না। কলকাতাটা আগাগোড়া চৌরঙ্গি নয়। শোন তাহলে— ‘সেবার গাঁয়ের লাইব্রেরির জন্যে বই কিনতে
-
বুড়ো মাঝিটাকে তাড়া লাগানো বৃথা জেনেই অনিমেষ বহুক্ষণ আগে চুপ করেছিল। তার ফলে মাঝি আর আরোহী দুজনেই হাল ছেড়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছে। মাঝির বকাটাই রোগ—এমন কি ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল এইটেই পেশা। ওর বৌ কতদিন মরেছে, ছেলের বিয়ে দিয়ে কী ভুল করেছে, জামাই কেন মেয়েকে নেয় না—ছোট জামাইটা জুয়াড়ী, ছেলেটা নেশা করতে পেলে আর কিছু চায় না—খুব ছেলেবয়েসে একবার ও কলকাতা গিয়েছিল কিন্তু অত হট্টগোলে মাথা ঠিক থাকে না বলে পালিয়ে আসতে পথ পায় নি —আবার একবার যাবে মা কালীকে দর্শন করতে, ইত্যাদি তথ্য পরিবেশন করবার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র দম নেবার প্রয়োজনে যখন থামে তখনই শুধু দাঁড় বাইবার কথা মনে
ক্যাটাগরি
লেখক
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (১)
- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- প্রক্রিয়াধীন (১)
- প্রফুল্ল রায় (১)
- প্রেমেন্দ্র মিত্র (১)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (২)
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (৮)
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- রাজশেখর বসু (১)
- লীলা মজুমদার (১)
- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সমরেশ বসু (১)
- সুখলতা রাও (১)
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- হেমেন্দ্রকুমার রায় (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.